মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২১২
ভীষ্ম বর্ণিত বিবাহভেদ, কন্যার অধিকার, বর্ণসংকর ও পুত্রভেদ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম বর্ণিত বিবাহভেদ, কন্যার অধিকার, বর্ণসংকর ও পুত্রভেদ
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, কেমন পাত্রে কন্যাদান করা কর্তব্য? ভীষ্ম বললেন, স্বভাব চরিত্র বিদ্যা কুল ও কাজ দেখে গুণবান পাত্রে কন্যাদান করা উচিত। এমন বিবাহের নাম ব্রাহ্মবিবাহ, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পক্ষে এই বিবাহই প্রশস্ত। বর ও কন্যার পরস্পরের ইচ্ছায় বিবাহকে গান্ধর্ব বিবাহ বলা হয়। ধন দিয়ে কন্যা ক্রয় কোরে যে বিবাহ হয় তার নাম আসুর বিবাহ। আত্মীয়বর্গকে হত্যা কোরে ক্রন্দনরতা কন্যার সাথে বিবাহের নাম রাক্ষস বিবাহ। শেষোক্ত দুই বিবাহ নিন্দনীয়। ব্রাহ্মণাদি প্রত্যেক বর্ণের পুরুষ তার সবর্ণের বা নিম্নবর্তী অন্যান্য বর্ণের কন্যাকে বিবাহ করতে পারে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সবর্ণা স্ত্রীই শ্রেষ্ঠ। ত্রিশ বৎসরের পাত্র দশ বৎসরের কন্যাকে এবং একুশ বৎসরের পাত্র সাত বৎসরের কন্যাকে বিবাহ করবে। ঋতুমতী হলে কন্যা তিন বৎসর বিবাহের জন্য অপেক্ষা করবে, তার পর সে স্বয়ং পতি বরণ কোরে নেবে। মন্ত্রপাঠ ও হোম কোরে কন্যা সম্প্রদান করলে বিবাহ সম্পন্ন হয়, কেবল বাগদান করলে বা পণ নিলে হয় না। সপ্তপদী গমনের পর পাণিগ্রহণ মন্ত্র সম্পূর্ণ হয়।
যুধিষ্ঠির বললেন, যদি কন্যা থাকে তবে অপুত্রক ব্যক্তির ধন আর কেউ পেতে পারে কি? ভীষ্ম বললেন, কন্যা পুত্রের সমান, তার পৈতৃক ধন আর কেউ নিতে পারে না। পুত্র থাক বা না থাক, মায়ের যৌতুক ধনে কেবল কন্যার অধিকার। অপুত্রক ব্যক্তির দৌহিত্রও পুত্রের সমান অধিকারী।
যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি বর্ণসংকরের উৎপত্তি ও কর্মের বিষয়ে বলুন। ভীষ্ম বললেন, পিতা যদি ব্রাহ্মণ হয়, তবে ব্রাহ্মণীর পুত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ার পুত্র মূর্ধাভিষিক্ত, বৈশ্যার পুত্র অম্বষ্ঠ, এবং শূদ্রার পুত্র পারশব নামে পরিচিত হয়। পিতা যদি ক্ষত্রিয় হয় তবে ক্ষত্রিয়ার পুত্র ক্ষত্রিয়, বৈশ্যার পুত্র মাহিষ্য এবং শূদ্রার পুত্র উগ্র নামে পরিচিত হয়। পিতা বৈশ্য হলে বৈশ্যার পুত্রকে বৈশ্য এবং শূদ্রার পুত্রকে করণ বলা হয়। শূদ্র ও শূদ্রার পুত্র শূদ্রই হয়। নিম্নবর্ণের পিতা ও উচ্চবর্ণের মাতার সন্তান নিন্দনীয় হয়। ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণীর পুত্র সূত, তাদের কর্ম রাজাদের স্তুতিপাঠ। বৈশ্য ও ব্রাহ্মণীর পুত্র বৈদেহক বা মৌল্য, তাদের কর্ম অন্তঃপুর রক্ষা করা, তাদের উপনয়নাদি সংস্কার নেই। শূদ্র ও ব্রাহ্মণীর পুত্র চণ্ডাল, তারা কুলের কলঙ্ক, গ্রামের বাইরে বাস করে এবং ঘাতক এর কাজ করে। বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়ার পুত্র বাক্যজীবী বন্দী বা মাগধ। শূদ্র ও ক্ষত্রিয়ার পুত্র মৎসজীবী নিষাদ। শূদ্র ও বৈশ্যার পুত্র সূত্রধর। শাস্ত্রে কেবল চতুর্বর্ণের ধর্ম নির্দিষ্ট আছে, বর্ণসংকর জাতির ধর্মের বিধান নেই, তাদের সংখ্যারও কোনো শেষ নেই।
তারপর ভীষ্ম বললেন, ঔরসজাত পুত্র আত্মস্বরূপ। পতির অনুমতিতে অন্যের দ্বারা উৎপন্ন সন্তানের নাম নিরুক্তজ, বিনা অনুমতিতে সন্তান হলে তার নাম প্রসূতিজ। বিনামূল্যে প্রাপ্ত অপরের পুত্র দত্তকপুত্র, মূল্য দ্বারা প্রাপ্ত পুত্র কৃতকপুত্র। গর্ভবতী স্ত্রীর বিবাহের পর যে পুত্র হয় তার নাম অধ্যোঢ়। কুমারীর পুত্র কানীন।
______________
(ক্রমশ)