মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২১৩
ভীষ্ম বর্ণিত চ্যবন ও নহুষের কাহিনি
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম বর্ণিত চ্যবন ও নহুষের কাহিনি
যুধিষ্ঠির ভীষ্মকে বললেন, পিতামহ, যাদের সঙ্গে একত্রে বাস করা হয় তাদের উপর কি ধরণের স্নেহ হয়? ভীষ্ম বললেন, আমি এক ইতিহাস বলছি শোনো — প্রাচীন কালে ভূগুবংশজাত মহর্ষি চ্যবন ব্রতধারী হয়ে বারো বছর গঙ্গা ও যমুনার জলের মধ্যে বাস করেছিলেন। তিনি সর্বভূতের বিশ্বাসভাজন ছিলেন, মাছ ও অন্যান্য জলচর প্রাণী নির্ভয়ে তার কাছে আসত। একদিন জেলেরা জাল ফেলে বহু মাছ ধরলো, মাছের সঙ্গে চ্যবনকেও তারা জালবদ্ধ কোরে তীরে তুললো। তার পিঙ্গলবর্ণ দাড়ি, মাথার জটা এবং শ্যাওলা-শঙ্খ-শামুকে ঢাকা শরীর দেখে জেলেরা তাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলো। মাছদের মরণাপন্ন দেখে চ্যবন কৃপাল হয়ে বার বার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। জেলেরা বললো, মহামুনি, আমাদের অজ্ঞানকৃত পাপ ক্ষমা করুন, আদেশ করুন আমরা আপনার জন্য কি প্রিয় কাজ করবো। চ্যবন বললেন, আমি এই মাছদের সঙ্গে একত্রে বাস করেছি, এদের ত্যাগ করতে পারি না। আমি এই মাছদের সঙ্গেই প্রাণত্যাগ করবো বা বিক্রীত হবো।
জেলেরা অত্যন্ত ভীত হয়ে রাজা নহুষের কাছে গিয়ে সকল বৃত্তান্ত জানালে, অমাত্য ও পুরোহিতের সঙ্গে নহুষ সত্বর এসে চ্যবনকে বললেন, দ্বিজোত্তম, আপনার কি প্রিয় কাজ করবো বলুন! চ্যবন বললেন, এই জেলেরা অত্যন্ত শ্রান্ত হয়েছে, তুমি এদের মাছের মূল্য এবং আমারও মূল্য দাও। নহুষ এক হাজার মুদ্রা দিতে চাইলে চ্যবন বললেন, আমার মূল্য এক হাজার মুদ্রা নয়, তুমি বিবেচনা কোরে উপযুক্ত মূল্য দাও। নহুষ ক্রমে ক্রমে লক্ষ মুদ্রা, কোটি মুদ্রা, অর্ধেক রাজ্য ও সমগ্র রাজ্য দিতে চাইলেন, কিন্তু চ্যবন তাতেও সম্মত হলেন না। নহুষ দুঃখিত ও চিন্তাকুল হলেন। এমন সময়ে এক গাইয়ের গর্ভজাত ফলমূল আহারী তপস্বী এসে নহুষকে বললেন, মহারাজ, ব্রাহ্মণ আর গরু অমূল্য, আপনি এই ব্রাহ্মণের মূল্যস্বরূপ একটি গাভী দিন। নহুষ তখন খুশি হয়ে চ্যবনকে বললেন, ব্রহ্মর্ষি, আপনাকে আমি গাভী দ্বারা কিনলাম। চ্যবন তুষ্ট হয়ে বললেন, এখন তুমি যথার্থই আমাকে ক্রয় করেছ। গোধন তুল্য কোনও ধন নেই। গোমাহাত্ম কীর্তন ও শ্রবণ, গোদান এবং গোদর্শন করলে সর্বপাপ নাশ ও কল্যাণ হয়। গাভী লক্ষ্মীর মূল এবং স্বর্গের সোপান স্বরূপ। গাভী থেকেই যজ্ঞীয় হবি উৎপন্ন হয়। সমগ্র গোমাহাত্ম্য বলা আমার সাধ্য নয়।
জেলেরা চ্যবনকে বললো, ভগবান, আপনি প্রসন্ন হয়ে এই গাভী গ্রহণ করুন। চ্যবন জেলেদের বললেন, আমি এই গাভী নিলাম, তোমরা পাপমুক্ত হয়ে এই মাছদের সঙ্গে স্বর্গে যাও। তার পর চ্যবন নহুষকে আশীর্বাদ কোরে নিজের আশ্রমে চলে গেলেন।
______________
(ক্রমশ)