মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২১৫
ভীষ্ম কর্তৃক দানধর্ম, অপালক রাজা, কপিলা, লক্ষ্মী ও গোময়ের বিষয়ে বর্ণনা
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম কর্তৃক দানধর্ম, অপালক রাজা, কপিলা, লক্ষ্মী ও গোময়ের বিষয়ে বর্ণনা
যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম তপস্যা ও বিবিধ ব্ৰত পালনের ফল এবং গাভী ভূমি জল সোনা অন্ন হরিণ্র মাংস ঘী দুধ তিল বস্ত্র শয্যা পাদুকা প্রভৃতি দানের ফল সবিস্তারে বিবৃত কোরে বললেন, যাচক অপেক্ষা অযাচক ব্রাহ্মণকে দান করা শ্রেয়, যাচকরা দস্যুর ন্যায় দাতাকে উদ্বিগ্ন করে। যুধিষ্ঠির, তোমার রাজ্যে যদি অযাচক দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকেন তবে তুমি তাদের ভস্মে ঢাকা আগুনের মতো জ্ঞান করবে। তাদের সেবা অবশ্য কর্তব্য।
তারপর ভীষ্ম বললেন, রাজাদের যজ্ঞানুষ্ঠান করা উচিত, কিন্তু প্রজাপীড়ন কোরে নয়। যে রাজ্যে বালকেরা সুস্বাদু খাদ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু খেতে পায় না, ব্রাহ্মণাদি প্রজারা ক্ষুধায় কাতর হয়, পতি ও পুত্রদের মধ্য থেকে ক্রন্দনরতা রমণী সবলে অপহৃত হয়, সে রাজার জীবনে ধিক। যিনি প্রজাকে রক্ষা করতে পারেন না, সবলে ধন হরণ করেন, সেই নির্দয় কলিতুল্য রাজাকে প্রজাগণ মিলিত হয়ে বধ করবে। যিনি প্রজারক্ষার আশ্বাস দিয়ে রক্ষা করেন না সেই রাজাকে পাগল কুকুরের মতো বিনষ্ট করা উচিত। মনুস্মৃতি অনুসারে প্রজার পাপ ও পুণ্যের চার ভাগের এক ভাগ রাজার প্রাপ্য হয়।
তারপর ভীষ্ম গোদানের ফল সবিশেষ কীর্তন কোরে বললেন, গোসমূহের মধ্যে কপিলাই শ্রেষ্ঠ। প্রজাসৃষ্টির পর প্রজাপতি দক্ষ অমৃত পান করেছিলেন, তার উদ্গার থেকে কামধেনু সুরভী উৎপন্ন হন। সুরভীই সোনার মতো রঙ-এর কপিলা গাভীদের জন্ম দিয়েছিলেন। একদা কপিলাদের দুধের ফেনা মহাদেবের মাথায় পতিত হওয়ায় তিনি ক্রুদ্ধ হন, তার দৃষ্টিপাতের ফলে কপিলাদের শরীর বিভিন্ন রঙ-এর হয়েছে। প্রজাপতি দক্ষ তাকে বলেছিলেন, আপনি অমৃতে অভিষিক্ত হয়েছেন। দক্ষ মহাদেবকে একটি ষাঁড় ও কতকগুলি গাভী দিয়েছিলেন, সেই ষাঁড় মহাদেবের বাহন হোলো।
যুধিষ্ঠির, আমি এক প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোনো - একদিন লক্ষ্মী মনোহর বেশে গাভীদের নিকটে এলে তারা জিজ্ঞাসা করলো, দেবী, তুমি কে? তোমার রূপের তুলনা নেই। লক্ষ্মী বললেন, আমি সৌন্দর্যের দেবী শ্ৰী। আমি দৈত্যদের ত্যাগ করেছি সেজন্য তারা বিনষ্ট হয়েছে, আমার আশ্রয়ে দেবতারা চিরকাল সুখভোগ করছেন। আমি তোমাদের দেহে নিত্য বাস করতে ইচ্ছা করি, তোমরা শ্রীযুক্তা হও। গাভীরা বললো, তুমি অস্থিরা চপলা, বহুলোকের অনুরক্তা, আমরা তোমাকে চাই না। আমরা সকলেই সৌন্দর্যময়ী, তোমাকে আমাদের প্রয়োজন নেই। লক্ষ্মী বললেন, অনাহুত হয়ে যে আসে তার অপমান লাভ হয় — এই প্রবাদ সত্য। মানুষ দেব দানব গন্ধর্ব আদি উগ্র তপস্যা দ্বারা আমার সেবা করেন। অতএব তোমরাও আমাকে গ্রহণ করো, ত্রিলোকে কেউ আমার অপমান করে না। তোমরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে সকলে আমাকে অবজ্ঞা করবে, অতএব তোমরা প্রসন্ন হও, আমি তোমাদের শরণাগত। তোমাদের দেহের কোনও স্থান কুৎসিত নয়, আমি তোমাদের দেহের যে কোনো স্থানে বাস করতে সম্মত আছি। তখন গাভীরা মন্ত্রণা কোরে বললো, তোমার সম্মানরক্ষা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। তুমি আমাদের পবিত্র পুরীষ ও মূত্রে অবস্থান করো। লক্ষ্মী তুষ্ট হয়ে বললেন, তোমাদের মঙ্গল হোক, আমি খুশি হয়েছি।
______________
(ক্রমশ)