মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২২০
মাংস আহারের বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
মাংস আহারের বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
বৃহস্পতি চলে গেলে যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি বহুবার বলেছেন যে অহিংসা পরম ধর্ম। আপনার কাছে এও শুনেছি যে পিতৃগণ আমিষ পছন্দ করেন সেজন্য শ্রাদ্ধে বহুবিধ মাংস দেওয়া হয়। হিংসা না করলে মাংস কোথায় পাওয়া যাবে? ভীষ্ম বললেন, যারা সৌন্দর্য স্বাস্থ্য আয়ু বুদ্ধি বল ও স্মরণশক্তি চান তারা হিংসা ত্যাগ করেন। স্বয়ম্ভুব মনু বলেছেন, যিনি মাংস আহার ও পশুহত্যা করেন না তিনি সর্ব জীবের মিত্র ও বিশ্বাসের পাত্র। নারদ বলেছেন, যে পরের মাংস খেয়ে নিজের মাংস বৃদ্ধি করতে চায় সে কষ্ট ভোগ করে। মাংসাশী লোক যদি মাংস আহার ত্যাগ করে তবে যে পূণ্যফল পায়, বেদাধ্যয়ন ও সকল যজ্ঞের অনুষ্ঠান সেরূপ ফল পেতে পারে না। মাংস ভোজনে আসক্তি জন্মালে তা ত্যাগ করা কঠিন। মাংস আহার ত্যাগ করলে সকল প্রাণী অভয় লাভ করে। যদি মাংসভোজী না থাকে তবে কেউ পশুহত্যা করে না, মাংস খাওয়ার জন্যই পশুঘাতক হয়েছে। মনু বলেছেন, যজ্ঞাদি কর্মে এবং শ্রাদ্ধে পিতৃগণের উদ্দেশে যে মন্ত্রপূত সংস্কৃত মাংস নিবেদিত হয় তা পবিত্র স্বরূপ, তা ভিন্ন অন্য মাংস অপবিত্র মাংস এবং অভক্ষ্য।
যুধিষ্ঠির বললেন, মাংসাশী লোকে পিঠা শাক প্রভৃতি সুস্বাদু খাদ্য অপেক্ষা মাংসই খেতে ভালোবাসে। আমিও মনে করি মাংসের তুল্য সরস খাদ্য কিছুই নেই। অতএব আপনি মাংস আহার ও মাংসবর্জনের দোষগুণ বলুন। ভীষ্ম বললেন, তোমার কথা সত্য, মাংস অপেক্ষা সুস্বাদু কিছু নেই। ক্ষীণদেহী দুর্বল ইন্দ্রিয়সেবী ও শ্রান্ত লোকের পক্ষে মাংসই শ্রেষ্ঠ খাদ্য, তাতে দ্রুত বলবৃদ্ধি ও পুষ্টি হয়। কিন্তু যে লোক অপরের মাংস খেয়ে নিজের মাংস বৃদ্ধি করতে চায় তার অপেক্ষা ক্ষুদ্র ও নৃশংস কেউ নেই। বেদে আছে, পশুগণ যজ্ঞের নিমিত্ত সৃষ্ট হয়েছে, অতএব যজ্ঞ ভিন্ন অন্য কারণে পশুহত্যা রাক্ষসের কাজ। প্রাচীন কালে মহামুনি অগস্ত্য অরণ্যের পশুগণকে দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলেন, সেজন্য ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মৃগয়া প্রশংসনীয়। লোকে মরণ পণ কোরে মৃগয়ায় যায়, হয় পশু মরে নতুবা মৃগয়াকারী মরে। দুই এরই সমান বিপদের সম্ভাবনা, এজন্য মৃগয়ায় দোষ হয় না। কিন্তু সর্বভূতে দয়ার তুল্য ধর্ম নেই, দয়ালু তপস্বীদেরকে ইহলোকে ও পরলোকে সেই পশু ভক্ষণ করে।
______________
(ক্রমশ)