Read Story of Mahabharat Part 226 Krishna goes to Dwarka and Story of Utanka a Desert Resident by Ashoke Ghosh in Bengali আধ্যাত্মিক গল্প | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 226

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২২৬

কৃষ্ণের দ্বারকাযাত্রা ও মরুবাসী উতঙ্কের কাহিনি

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

কৃষ্ণের দ্বারকাযাত্রা ও মরুবাসী উতঙ্কের কাহিনি

কৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে যেতে চান শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, তোমার মঙ্গল হোক। তুমি বহুদিন পিতামাতাকে দেখনি, এখন তাদের কাছে যাওয়া তোমার কর্তব্য। দ্বারকাপুরীতে গিয়ে তুমি আমার মামা বসুদেব, মামী দেবকী এবং বলদেবকে আমাদের অভিবাদন জানিও, আমাকে ও আমার ভাইদেরকে স্মরণে রেখো, আমার অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় আবার এখানে এসো।

ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, পিসি কুন্তী ও বিদুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কৃষ্ণ তার বোন সুভদ্রার সঙ্গে রথে চড়ে দ্বারকায় যাত্রা করলেন। বিদুর, ভীম, অর্জুন ও সাত্যকি তার পিছনে গেলেন। কিছু দূর গিয়ে তিনি বিদুর প্রভৃতিকে ফিরে যেতে বলে দারুক ও সাত্যকিকে বললেন দ্রুত রথ চালাও। কৃষ্ণ ও অর্জুন বহুক্ষণ পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলেন, তার পর রথ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে অর্জুনাদি হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।

কৃষ্ণের যাত্রাপথে বিভিন্ন শুভ লক্ষণ দেখা গেল। বাতাস বেগে প্রবাহিত হয়ে রথযাত্রার পথের ধূলো কাঁকর আদি পরিস্কার কোরে দিলো, ইন্দ্র সুগন্ধ জল ও দিব্য পুষ্প বর্ষণ করতে লাগলেন। কিছু দূর যাবার পর কৃষ্ণ মরুপ্রদেশে উপস্থিত হয়ে মুনিশ্রেষ্ঠ উতঙ্কের দর্শন পেলেন। পরস্পর অভিবাদন ও কুশল জিজ্ঞাসার পর উতঙ্ক বললেন, তোমার যত্নে কুরুপাণ্ডবদের মধ্যে সুসম্পর্ক হয়েছে তো? কৃষ্ণ বললেন, আমি সন্ধির জন্য বহু চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু তা সফল হয়নি। বুদ্ধি বা বল দিয়ে দৈবকে অতিক্রম করা যায় না। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ সবান্ধবে যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করেছেন, কেবল পঞ্চপাণ্ডব জীবিত আছেন, তাঁদেরও পুত্র এবং মিত্র নিহত হয়েছেন। উতঙ্ক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, কৃষ্ণ, তুমি সমর্থ হয়েও কুরুপুরুষদেরকে রক্ষা করনি, তোমার মিথ্যাচারের জন্যই কুরুকুল বিনষ্ট হয়েছে, আমি তোমাকে শাপ দেবো। কৃষ্ণ বললেন, আমি অনুনয় করছি, শাপ দেবেন না। অল্প তপস্যার প্রভাবে আমাকে কেউ পরাভূত করতে পারেন না। আমি জানি যে আপনি কৌমার ও ব্রহ্মচর্য পালন কোরে তপঃসিদ্ধ হয়েছেন, গুরুকেও তুষ্ট করেছেন। আপনার তপস্যা আমি নষ্ট করতে ইচ্ছা করি না। তারপর কৃষ্ণ তাঁর দিব্য ঐশ্বর্য সকল বর্ণনা করলেন এবং উতঙ্কের অনুরোধে বিশ্বরূপ দেখালেন। উতঙ্ক বিস্ময়াপন্ন হয়ে বললেন, হে বিশ্বাত্মা বিশ্বসম্ভব, তোমাকে নমস্কার করি, তুমি দুই পা দিয়ে পৃথিবী, মাথা দিয়ে আকাশ, জঠর দিয়ে দ্যুলোক-ভূলোকের মধ্যদেশ এবং বাহু দিয়ে দিকসমূহ ব্যাপ্ত করে আছো। দেব, তোমার এই মহৎ রূপ সংবরণ কোরে পূর্বরূপ ধারণ করো। কৃষ্ণ পূর্বরূপ গ্রহণ কোরে প্রসন্ন হয়ে বললেন, মহর্ষি, আপনি অভীষ্ট বর প্রার্থনা করুন। উতঙ্ক বললেন, পুরুষোত্তম, তোমার যে রূপ দেখেছি তাই আমার জন্য পর্যাপ্ত বর। যদি নিতান্তই বর দেওয়া কর্তব্য মনে করো তবে এই বর দাও যেন এই মরুভূমিতে ইচ্ছা অনুসারে জল পেতে পারি। কৃষ্ণ বললেন, জলের প্রয়োজন হলেই আমাকে স্মরণ করবেন। এই বলে কৃষ্ণ প্রস্থান করলেন।

কিছুকাল পরে একদিন উতঙ্ক মরুভূমিতে চলতে চলতে তৃষিত হয়ে কৃষ্ণকে স্মরণ করলেন। তখন এক দিগম্বর মলিনদেহ চণ্ডাল তার কাছে উপস্থিত হোলো, তার সঙ্গে কুকুরের দল, হাতে খড়্গ ও ধনুর্বাণ। তার পায়ের নীচ দিয়ে প্রস্রাব প্রবাহিত হচ্ছে। চণ্ডাল সহাস্যে বললো, ভৃগুবংশজাত উতঙ্ক, তুমি আমার এই জল পান করো। উতঙ্ক পিপাসার্ত হয়েও সেই জল নিলেন না, ক্রুদ্ধ হয়ে তিরস্কার করলেন। চণ্ডাল অন্তর্হিত হোলো। তার পর কৃষ্ণ আবির্ভূত হোলে উতঙ্ক বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণকে চণ্ডালের প্রস্রাব দেওয়া তোমার উচিত নয়। কৃষ্ণ সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আপনাকে অমৃত দেবার জন্য আমি ইন্দ্রকে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, মানুষকে অমরত্ব দেওয়া অকর্তব্য। যদি উতঙ্ককে অমৃত দিতেই হয় তবে আমি চণ্ডালের রূপে দিতে যাবো, যদি তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেন তবে অমৃত পাবেন না। মহর্ষি, আপনি চণ্ডালরূপী ইন্দ্রকে ফিরিয়ে দিয়ে অন্যায় করেছেন। যাই হোক, আমি বর দিচ্ছি, আপনার পিপাসা পেলেই মেঘ উদিত হয়ে এই মরুভূমিতে জলবর্ষণ করবে, সেই মেঘ উতঙ্কমেঘ নামে বিখ্যাত হবে। বর পেয়ে উতঙ্ক খুশি হয়ে সেখানে বাস করতে লাগলেন। এখনও উতঙ্কমেঘ সেই মরুভূমিতে জলবর্ষণ করে।

______________

(ক্রমশ)