মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২২৮
কৃষ্ণের দ্বারকায় আগমন এবং যুধিষ্ঠির কর্তৃক মরুত্তের সোনা সংগ্রহ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারত সংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনি সমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনি সমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
কৃষ্ণের দ্বারকায় আগমন এবং যুধিষ্ঠির কর্তৃক মরুত্তের সোনা সংগ্রহ
হস্তিনাপুরে থেকে দ্বারকায় ফিরে এসে কৃষ্ণ তাঁর পিতা বসুদেবকে সবিস্তারে কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধের বিবরণ দিলেন, কিন্তু দৌহিত্র অভিমন্যুর মৃত্যুর সংবাদে বসুদেব অত্যন্ত কাতর হবেন এই আশঙ্কায় তা বসুদেবকে জানালেন না। সুভদ্রা বললেন, তুমি আমার পুত্রের নিধনের কথা গোপন করলে কেন? এই বলে সুভদ্রা মাটিতে পড়ে গেলেন। বসুদেব শোকার্ত হয়ে সুভদ্রার মাটিতে পড়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন কৃষ্ণ অভিমন্যুর মৃত্যুর সংবাদ দিলেন। দৌহিত্রের আশ্চর্য বীরত্বের বিবরণ শুনে বসুদেব শোক সংবরণ কোরে যথাবিধি শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন।
হস্তিনাপুরে পাণ্ডবগণও অভিমন্যুর জন্য শোকার্ত হয়ে কালযাপন করছিলেন। বিরাট রাজার কন্যা উত্তরা পতির শোকে দীর্ঘকাল অনাহারে ছিলেন, তার ফলে তার গর্ভস্থ সন্তান ক্ষীণ হতে লাগল। বেদব্যাস উত্তরাকে বললেন, তুমি শোক ত্যাগ করো, তোমার মহাতেজা পুত্র হবে, কৃষ্ণের প্রভাবে এবং আমার বাক্য অনুসারে সে পাণ্ডবগণের পরে পৃথিবী শাসন করবে।
এদিকে হস্তিনাপুরে কৃষ্ণ ও বেদব্যাসের উপদেশ অনুসারে যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য উদ্যোগী হলেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যুযুৎসুকে রাজ্য রক্ষার ভার দিলেন এবং মরুত্ত রাজার সঞ্চিত সোনার রাশি আনবার জন্য এক শুভদিনে পুরোহিত ধৌম্য ও ভাইদের সঙ্গে সৈন্যদল নিয়ে হিমালয়ের অভিমুখে যাত্রা করলেন। নির্দিষ্ট স্থানে এসে যুধিষ্ঠির শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিলেন এবং ফুল মোদক পায়স মাংস প্রভৃতি উপহার দিয়ে ভক্তিভরে মহেশ্বরের পূজা করলেন। তার পর যক্ষরাজ কুবের এবং তার অনুচরগণের জন্যও মাংস তিল ও অন্নাদি নিবেদন করলেন। মহাদেবকে ও যক্ষরাজ কুবেরকে তুষ্ট কোরে যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণগণের অনুমতি নিয়ে মরুত্ত কর্তৃক সঞ্চিত সোনা উত্তোলনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে ভূমি খনন করবার আদেশ দিলেন। সোনা ও মূল্যবান রত্নে পূর্ণ ক্ষুদ্র বৃহৎ বহু সংখ্যক কলস ভৃঙ্গার কড়াই এবং অসংখ্য বিচিত্র আধারে সেই খনি থেকে উত্তোলন করা হোলো। তার পর যুধিষ্ঠির আবার মহাদেবের পূজা করলেন এবং কয়েক হাজার উট ঘোড়া হাতি গাধা ও শকটের উপর সেই সোনার রাশি বহন কোরে নিয়ে হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। প্রচুর সোনার ভারে ক্লান্ত বাহনগণ দুই ক্রোশ অন্তর বিশ্রাম করে চলতে লাগল।
______________
(ক্রমশ)