মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৩৭
ধৃতরাষ্ট্রের কাছে নারদ পর্বত বেদব্যাস ও যুধিষ্ঠিরাদির আগমন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ধৃতরাষ্ট্রের কাছে নারদ পর্বত বেদব্যাস ও যুধিষ্ঠিরাদির আগমন
রাজপুরী থেকে বেরিয়ে বহু দূর গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র ভাগীরথী নদীর তীরে উপস্থিত হলেন। সন্ধ্যায় সূর্যের আরাধনার পর বিদুর ও সঞ্জয় কুশ দিয়ে শয্যা প্রস্তুত কোরে দিলেন। ধৃতরাষ্ট্র এক শয্যায় এবং কুন্তীর সঙ্গে গান্ধারী অন্য শয্যায় রাত্রিযাপন করলেন। সকালে আহ্নিক ও হোমের পর তারা উত্তর দিকে যাত্রা করলেন এবং কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে রাজর্ষি শতযূপকে দেখতে পেলেন। ইনি কেকয় দেশের রাজা ছিলেন, বৃদ্ধাবস্থায় জ্যেষ্ঠপুত্রকে রাজ্য দিয়ে বনবাসী হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র বেদব্যাসের আশ্রমে গিয়ে দীক্ষা নিলেন এবং জটা অজিন ও বল্কল ধারণ কোরে শতযূপের আশ্রমে বিদুর সঞ্জয় গান্ধারী ও কুন্তীর সাথে কঠোর তপস্যায় রত হলেন।
একদিন নারদ পর্বত বেদব্যাস প্রভৃতি ঋষিরা ধৃতরাষ্ট্রকে দেখতে এলেন। কথাপ্রসঙ্গে নারদ বললেন, শতযূপের পিতামহ সহস্রচিত্য তপস্যার ফলে ইন্দ্রলোক লাভ করেছেন। আরও অনেক রাজা এই বনে তপস্যায় সিদ্ধিলাভ কোরে স্বর্গে গেছেন। ধৃতরাষ্ট্র, আপনিও বেদব্যাসের অনুগ্রহে গান্ধারীর সাথে উত্তম গতি লাভ করবেন। রাজা পাণ্ডু ইন্দ্রলোকে বাস কোরে নিত্য আপনাকে স্মরণ করেন। আমরা দিব্যনেত্রে দেখছি, সৎকর্মের ফলে কুন্তীও তার কাছে যাবেন। বিদুর যুধিষ্ঠিরের দেহে লীন হবেন, সঞ্জয় স্বর্গে যাবেন।
রাজর্ষি শতযূপ নারদকে বললেন, ধৃতরাষ্ট্র কোন্ লোকে যাবেন তা তো আপনি বললেন না। নারদ বললেন, আমি ইন্দ্রের কাছে শুনেছি রাজা ধৃতরাষ্ট্র আর তিন বৎসর জীবিত থাকবেন, তার পর গান্ধারীর সাথে দিব্য বিমানে কুবেরভবনে গিয়ে ইচ্ছা অনুসারে দেবতা গন্ধর্ব ও রাক্ষসলোকে বিচরণ করবেন। ধৃতরাষ্ট্রকে এইরূপে আশ্বস্ত কোরে নারদাদি প্রস্থান করলেন।
ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি বনে গেলে পুরবাসিগণ শোকার্ত হয়ে বলতে লাগলেন, পুত্রহীন বৃদ্ধ কুরুরাজ গান্ধারী ও কুন্তী নির্জন বনে কি কোরে বাস করছেন? পুত্রগণ ও রাজশ্রী ত্যাগ করে কুন্তী কেন দুষ্কর তপস্যা করতে গেলেন?
কুন্তীর বনগমনে পাণ্ডবগণ কাতর হয়ে কালযাপন করতে লাগলেন, কোনও বিষয়ে তারা মন দিতে পারলেন না। কয়েক দিন পরে তারা স্থির করলেন যে বনে গিয়ে সকলকে দেখে আসবেন, দ্রৌপদীও যাওয়ার জন্য উৎসুক হলেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে রথ হাতি ঘোড়া ও সৈন্য সজ্জিত হোলো, বহু পুরবাসী তাদের সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হোলো। পাঁচ দিন নগরের বাইরে বাস কোরে ষষ্ঠ দিনে যুধিষ্ঠির সদলে যাত্রা করলেন। কৃপাচার্য সৈন্যদলের নেতা হয়ে চললেন। যুধিষ্ঠির ও অর্জুন রথে, ভীম হাতিতে, নকুল ও সহদেব ঘোড়ায় এবং দ্রৌপদী প্রভৃতি নারীগণ পালকিতে যাত্রা করলেন। নগর ও গ্রামবাসী প্রজাগণ বিবিধ যান-বাহনে যুধিষ্ঠিরের পিছনে চললেন। যুযুৎসু ও ধৌম্য রাজপুর রক্ষার জন্য হস্তিনাপুরে রইলেন।
পাণ্ডবগণ যমুনা পার হয়ে কুরুক্ষেত্রে এসে শতযূপ ও ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রম দেখতে পেলেন এবং যান থেকে নেমে বিনীতভাবে পায়ে হেঁটে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। যুধিষ্ঠির সজলনয়নে তপস্বীদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের পিতৃব্য কোথায় আছেন? তারা বললেন, মহারাজ, তিনি ফুল ও জল আনতে এবং যমুনায় স্নান করতে গেছেন। পাণ্ডবগণ দ্রুত যমুনার দিকে চললেন এবং কিছুদূর গিয়ে দেখলেন, গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রকে নিয়ে কুন্তী আগে আগে আসছেন। সহদেব কাঁদতে কাঁদতে কুন্তীর পায়ে পড়লেন। তারপর পাণ্ডবগণ ধৃতরাষ্ট্রাদিকে প্রণাম কোরে তাদের জলপূর্ণ কলস বয়ে নিয়ে আশ্রমের দিকে চললেন।
নানা স্থান থেকে তাপসগণ পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী প্রভৃতিকে দেখতে এলে, সঞ্জয় তাদের সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী ও তাদের সাথে আগত সকলের পরিচয় দিলেন।
______________
(ক্রমশ)