Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 242

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪২

শাম্বের মুষল প্রসব এবং দ্বারকায় দুর্লক্ষণ

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারত সংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

শাম্বের মুষল প্রসব এবং দ্বারকায় দুর্লক্ষণ

বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বললেন, যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলাভের পর ছত্রিশ বছরে বৃষ্ণিবংশীয়গণ অত্যন্ত দুর্ণীতিপরায়ণ হয়ে পরস্পরকে বিনষ্ট করেছিলেন। জনমেজয় বললেন, কার শাপে এরূপ ঘটেছিল আপনি সবিস্তারে বলুন। কৃষ্ণ থাকতে তারা রক্ষা পেলেন না কেন? বৈশম্পায়ন বলতে লাগলেন - একদিন বিশ্বামিত্র কন্ব ও নারদ মুনি দ্বারকায় এসেছেন দেখে সারণ প্রভৃতি বীরগণের কুবুদ্ধি হোলো। তারা শাম্বের পেটে মুষল বেঁধে স্ত্রীবেশে সজ্জিত কোরে মুনিদের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ইনি পুত্রলাভের অভিলাষী বভ্রুর পত্নী। আপনারা বলুন ইনি কি প্রসব করবেন। এই প্রতারণায় মুনিগণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এই কৃষ্ণপুত্র শাম্ব একটি ঘোর লোহার মুষল প্রসব করবে। তোমরা অত্যন্ত দুবৃত্ত নৃশংস ও গর্বিত হয়েছ। সেই মুষলের প্রভাবে বলরাম ও কৃষ্ণ ভিন্ন যদুকুলের সকলেই বিনষ্ট হবে। বলরাম সমুদ্রে দেহত্যাগ করবেন, জরা নামক এক ব্যাধ কৃষ্ণকে শরবিদ্ধ করবে। এই বলে মুনিগণ কৃষ্ণের কাছে গিয়ে অভিশাপের কথা জানালেন।

কৃষ্ণ বৃষ্ণিবংশীয়গণকে বললেন, মুনিরা যা বলেছেন তাই হবে। এই বলে তিনি তার ভবনে প্রবেশ করলেন, অভিশাপের প্রতিকার করতে ইচ্ছা করলেন না। পরদিন শাম্ব মুষল প্রসব করলেন। রাজা উগ্রসেন বিষগ্ন হয়ে সেই মুষলের সূক্ষ্ম চূর্ণ করালেন, যাদবগণ তা সাগরে ফেলে দিলেন। তারপর উগ্রসেন বলরাম ও কৃষ্ণের আদেশে নগরে এই ঘোষণা করা হোলো আজ থেকে এই নগরে কেউ সুরা প্রস্তুত করবে না। যে করবে তাকে সবান্ধবে জীবিত অবস্থায় শূলে দেওয়া হবে।

বৃষ্ণি ও অন্ধকগণ সাবধানে রইলেন। এই সময়ে দেখা গেল, কৃষ্ণপিঙ্গলবর্ণ মুণ্ডিতমস্তক বিকটাকার কালপুরুষ গৃহে গৃহে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং মাঝে মাঝে অদৃশ্য হচ্ছেন। তাকে দেখতে পেলেই যাদবগণ শরবর্ষণ করতেন কিন্তু বিদ্ধ করতে পারতেন না। দ্বারকায় নানা প্রকার দুর্লক্ষণ দেখা গেল। মূষিকের দল নিদ্রিত যাদবগণের নখ ও কেশ কাটতে লাগল, সারস প্যাঁচা ছাগল ও শৃগালেরা ডাকতে লাগল। গাভীর গর্ভে গর্দভ, অশ্বের গর্ভে হাতির শাবক, কুকুরীর গর্ভে বিড়াল এবং বেজীর গর্ভে ইঁদুর জন্ম নিলো। যাদবগণ নির্লজ্জভাবে পাপকার্য করতে লাগলেন।

একদিন ত্রয়োদশীতে অমাবস্যা দেখে কৃষ্ণ যাদবগণকে বললেন, কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের আগে এই রকম দুর্লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, আমাদের বিনাশ আসন্ন হয়েছে। তোমরা সমুদ্রতীরে প্রভাস তীর্থে যাও।

______________

(ক্রমশ)