Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 243

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৩

যাদবগণের বিনাশ

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

যাদবগণের বিনাশ

দ্বারকায় আরও নানা প্রকার উৎপাত দেখা গেল। কৃষ্ণবর্ণা নারী নিদ্রিত গৃহবধূদের মঙ্গলসূত্র এবং ভয়ংকর রাক্ষসগণ যাদবদের অলংকার ছাতা ও কবচ হরণ করতে লাগল। কৃষ্ণের চক্র সকলের সামনে আকাশে অন্তর্হিত হোলো, দারুকের সামনে ঘোড়ারা কৃষ্ণের দিব্য রথ নিয়ে সাগরের উপর দিয়ে চলে গেলো। অপ্সরারা বলরামের তালধ্বজ এবং কৃষ্ণের গরুড়ধ্বজ হরণ কোরে উচ্চরবে বললে, যাদবগণ, প্রভাসতীর্থে চলে যাও।

বৃষ্ণি ও অন্ধক মহারথগণ প্রচুর খাদ্য পেয় মাংস মদ নিয়ে তাদের পরিবারবর্গ ও সৈন্যদের সঙ্গে প্রভাসে গেলেন। সেখানে তারা নারীদের সঙ্গে নিরন্তর পানভোজন করতে থাকলেন এবং ব্রাহ্মণের জন্য প্রস্তুত আহারে মদ মিশিয়ে বানরদের খাওয়াতে লাগলেন। বলরাম সাত্যকি গদ ও কৃতবর্মা কৃষ্ণের সামনেই সুরাপান করতে লাগলেন। সাত্যকি অত্যন্ত মত্ত হয়ে কৃতবর্মাকে বললেন, কোন্ ক্ষত্রিয় মৃতবৎ নিদ্রামগ্ন লোককে বধ করে? তুমি যা করেছিলে যাদবগণ তা ক্ষমা করবেন না। প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে সমর্থন করলেন। কৃতবর্মা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ভূরিশ্রবা যখন ছিন্নবাহু হয়ে অনশনে ছিলেন তখন তুমি নৃশংসভাবে তাকে বধ করেছিলে কেন? সাত্যকি স্যমন্তক মণি হরণ ও সত্রাজিৎ বধের বৃত্তান্ত বললেন। পিতার মৃত্যুর কথা শুনে সত্যভামা কৃষ্ণকে ক্রুদ্ধ করবার জন্য তার কোলে বসে কাঁদতে লাগলেন। সাত্যকি উঠে বললেন, সুমধ্যমা, আমি শপথ করছি, ধৃষ্টদ্যুম্ন শিখণ্ডী ও দ্রৌপদীর পুত্রগণ যেখানে গেছেন কৃতবর্মাকে সেখানে পাঠাব। এই পাপাত্মা অশ্বত্থামার সাহায্যে তাদের নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করেছিল। এই বলে তিনি খড়গাঘাতে কৃতবর্মার শিরচ্ছেদ কোরে অন্যান্য লোককেও বধ করতে লাগলেন।

তখন ভোজ ও অন্ধকগণ সাত্যকিকে ঘিরে ধরে উচ্ছিষ্ট ভোজনপাত্র দিয়ে মারতে লাগলেন। কালের বিপর্যয় বুঝে কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হলেন না। রুক্মিণীপুত্র প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে রক্ষা করবার জন্য যুদ্ধ করতে লাগলেন, কিন্তু সাত্যকির সাথে তিনিও নিহত হলেন। তখন কৃষ্ণ এক মুষ্টি এরকা নিলেন, তা বর্জতুল্য লৌহ-মুষলে পরিণত হোলো। সেই মুষলের আঘাতে তিনি সম্মুখস্থ সকলকে বধ করতে লাগলেন। সেখানকার সমস্ত এরকাই মুষল হয়ে গেলো। তার দ্বারা অন্ধক ভোজ বৃষ্ণি প্রভৃতি যাদবগণ পরস্পরকে হত্যা করতে লাগলেন এবং মত্ত হয়ে পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে বধ করলেন। আগুনে পতিত পতঙ্গের ন্যায় সকলে মরতে লাগলেন, কারও পলায়নের বুদ্ধি হোলো না। কৃষ্ণের সামনেই প্রদ্যুম্ন শাম্ব চারুদেষ্ণ অনিরুদ্ধ গদ প্রভৃতি নিহত হলেন। তখন বভ্রু ও দারুক বললেন, বহু লোককে বিনষ্ট করেছেন, এখন আমরা বলরামের কাছে যাই চলুন।

______________

(ক্রমশ)