মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৪
বলরাম ও কৃষ্ণের দেহত্যাগ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
বলরাম ও কৃষ্ণের দেহত্যাগ
বলরামের নিকটে এসে কৃষ্ণ দেখলেন, তিনি নির্জন স্থানে বৃক্ষমূলে বসে চিন্তা করছেন। কৃষ্ণ দারুককে বললেন, তুমি সত্বর হস্তিনাপুরে গিয়ে যাদবগণের নিধনের সংবাদ অর্জুনকে জানাও এবং তাকে শীঘ্র এখানে নিয়ে এসো। দারুক তখনই যাত্রা করলেন। তার পর কৃষ্ণ বভ্রুকে বললেন, তুমি নারীদের রক্ষা করতে যাও, যেন দস্যুরা তাদের আক্রমণ না করে। বভ্রু যাত্রার উপক্রম করতেই এক ব্যাধের মুগুর সহসা তার হাত থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে তার প্রাণহরণ করলো। তখন কৃষ্ণ বলরামকে বললেন, আমি নারীদের রক্ষার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি, আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করুন।
কৃষ্ণ তার পিতা বসুদেবের কাছে গিয়ে বললেন, অর্জুনের না আসা পর্যন্ত আপনি নারীদের রক্ষা করুন। বলরাম বনের মধ্যে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমি তার কাছে যাচ্ছি। আমি কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধে এবং এখানে বহু লোকের মৃত্যু দেখেছি। যাদবশূন্য এই পুরীতে আমি থাকতে পারব না, বনবাসী হয়ে বলরামের সঙ্গে তপস্যা করবো। এই বলে কৃষ্ণ বসুদেবকে প্রণাম করলেন এবং নারী ও বালকদের কান্না শুনে বললেন, অর্জুন এখানে আসছেন, তিনি তোমাদের দুঃখ দূর করবেন। বনে এসে কৃষ্ণ দেখলেন, বলরাম সেখানে বসে আছেন, তাঁর মুখ থেকে একটি শ্বেতবর্ণ সহস্ৰমাথা রক্তমুখ মহানাগ নির্গত হয়ে সাগরে প্রবেশ করছেন। সাগর, দিব্য নদী সকল, বাসুকি কর্কোটক তক্ষক প্রভৃতি নাগগণ এবং স্বয়ং বরুণ এসে স্বাগত প্রশ্ন ও শ্রদ্ধার জ্ঞাপন কোরে সেই মহানাগের সংবর্ধনা করলেন।
অগ্রজ বলরামের দেহত্যাগ দেখে কৃষ্ণ সেই বনে কিছুক্ষণ বিচরণের পর মাটিতে বসলেন এবং গান্ধারী ও দুর্বাসার অভিশাপের বিষয় চিন্তা করতে লাগলেন। তারপর তার প্রয়াণকাল আসন্ন হয়েছে এই বিবেচনায় তিনি ইন্দ্রিয় সংযম এবং মহাযোগ আশ্রয় কোরে শয়ন করলেন। সেই সময়ে জরা নামে এক ব্যাধ দূর থেকে কৃষ্ণকে হরিণ মনে কোরে তার পদতলে শরবিদ্ধ করলো। তার পর সে নিকটে এসে যোগমগ্ন পীতাম্বর কৃষ্ণকে দেখে ভয়ে তার চরণে পতিত হোলো। মহাত্মা কৃষ্ণ ব্যাধকে আশ্বাস দিলেন এবং নিজের উজ্জ্বলতা দ্বারা আকাশ আলোকিত কোরে ঊর্ধ্বে স্বলোকে প্রয়াণ করলেন। দেবতা ঋষি চারণ সিদ্ধ গন্ধর্ব প্রভৃতি কৃষ্ণের অর্চনা করলেন, মুনিশ্রেষ্ঠগণ ঋক্ মন্ত্র উচ্চারণ করলেন এবং ইন্দ্র তঁকে সানন্দে অভিনন্দিত করলেন।
______________
(ক্রমশ)