মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৫
অর্জুনের দ্বারকায় গমন ও হস্তিনাপুরে প্রত্যাবর্তন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অর্জুনের দ্বারকায় গমন ও হস্তিনাপুরে প্রত্যাবর্তন
দারুক হস্তিনাপুরে যুধিষ্ঠিরের সভায় গিয়ে দ্বারকার ঘটনাবলী জানালেন। ভোজ অন্ধক কুকুরু ও বৃষ্ণি বংশীয় বীরগণের নিধন শুনে পাণ্ডবগণ শোকাকুল হলেন। যদুকুল ধ্বংস হয়েছে এই আশঙ্কায় অর্জুন তাঁর মামা বসুদেবকে দেখবার জন্য তখনই যাত্রা করলেন। দ্বারকায় উপস্থিত হয়ে তিনি দেখলেন সেই নগরী স্বামীহীনা রমণীর ন্যায় শ্রীহীন হয়েছে। কৃষ্ণসখা অর্জুনকে দেখে কৃষ্ণের ষোল হাজার স্ত্রী উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন। অর্জুনের চোখ অশ্রূপূর্ণ হোলো, তিনি সেই পতিপুত্রহীনা নারীদের দিকে চাইতে পারলেন না, সশব্দে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে গেলেন। রুক্মিণী সত্যভামা প্রভৃতি তাঁকে উঠিয়ে স্বর্ণময় পীঠে বসালেন এবং তাঁকে ঘিরে ধরে বিলাপ করতে লাগলেন।
তারপর অর্জুন বসুদেবের কাছে এসে দেখলেন, তিনি পুত্রশোকে কাতর হয়ে শুয়ে আছেন। বসুদেব বললেন, অর্জুন, আমার মৃত্যু নেই। যাঁরা শত শত নৃপতি ও দৈত্যগণকে জয় করেছিলেন, সেই পুত্রদের না দেখেও আমি জীবিত আছি। যে দুজন তোমার প্রিয় শিষ্য ছিলো, যারা অতিরথ বলে খ্যাত এবং কৃষ্ণের প্রিয়তম ছিলো, সেই প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিই বৃষ্ণিবংশ নাশের মূল কারণ। অথবা আমি তাদের দোষ দিতে পারি না, ঋষিশাপেই আমাদের বংশ বিনষ্ট হয়েছে। তুমি ও নারদাদি মুনিগণ যাঁকে সনাতন বিষ্ণু বলে জানতে, আমার পুত্র সেই কৃষ্ণ যদুবংশের এই বিনাশ উপেক্ষা করেছেন, তিনি জ্ঞাতিদের রক্ষা করতে চেষ্টা করেননি। কৃষ্ণ আমাকে বলে গেছেন - “আমি আর অর্জুন একই, অর্জুন দ্বারকায় এসে স্ত্রী ও বালকগণের রক্ষার ভার নেবেন এবং মৃতজনের পারলৌকিক ক্রিয়া করবেন। তিনি প্রস্থান করলেই দ্বারকা সমুদ্রজলে প্লাবিত হবে। আমি বলদেবের সঙ্গে কোনও নির্জন স্থানে যোগস্থ হয়ে অন্তকালের প্রতীক্ষা করবো।
তারপর বসুদেব বললেন, অর্জুন, আমি আহার ত্যাগ করেছি, জীবনধারণে আমার ইচ্ছা নেই। কৃষ্ণের কথা অনুসারে এই রাজ্য, নারীগণ ও ধনরত্ন তোমাকে সমর্পণ করছি। অর্জুন বললেন, মামা, কৃষ্ণ ও বান্ধববিহীন এই পৃথিবী আমি দেখতে ইচ্ছা করি না। আমার ভাইদের ও দ্রৌপদীর মনের অবস্থাও একই রকম, কারণ আমরা একাত্মা। রাজা যুধিষ্ঠিরেরও প্রয়াণকাল উপস্থিত হয়েছে, অতএব আমি স্ত্রী বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে সত্বর ইন্দ্রপ্রস্থে যাবো।
পরদিন সকালে বসুদেব যোগস্থ হয়ে দেহত্যাগ কোরে স্বর্গলাভ করলেন। দেবকী ভদ্রা মদিরা ও রোহিণী স্বামীর চিতায় আরোহণ কোরে তার সহগামিনী হলেন। অর্জুন সকলের অন্তিম কার্য সম্পন্ন করলেন এবং বলরাম ও কৃষ্ণের দেহ খুঁজে এনে সৎকার করলেন। সপ্তম দিনে তিনি কৃষ্ণের ষোল হাজার পত্নী, পৌত্র বজ্র এবং অসংখ্য নারী বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে যাত্রা করলেন। রথী গজারোহী ও অশ্বারোহী অনুচরগণ এবং ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি প্রজা তাঁদের সঙ্গে গেলেন। অর্জুন দ্বারকার যে যে স্থান অতিক্রম করতে লাগলেন তৎক্ষণাৎ সেই সেই স্থান সমুদ্রের জলে প্লাবিত হোলো।
কিছুদিন পরে তারা পঞ্চনদ প্রদেশের এক স্থানে এলেন। সেখানকার আভীর দস্যুগণ যাদবনারীদের দেখে লুব্ধ হয়ে লাঠি নিয়ে আক্রমণ করলো। অর্জুন ঈষৎ হেসে তাদের বললেন, যদি বাঁচতে চাও তো দূর হও, নতুবা আমার তীরের আঘাতে সবাই মরবে। দস্যুগণ থামলো না দেখে অর্জুন অতি কষ্টে তার গাণ্ডীব তুলে নিলেন কিন্তু কোনও দিব্যাস্ত্র স্মরণ করতে পারলেন না। তিনি এবং সহগামী যোদ্ধারা বাধা দেবার চেষ্টা করলেও দস্যুরা নারীদের হরণ করতে লাগল, কোনও কোনও নারী স্বেচ্ছায় তাদের কাছে গেলো। অর্জুনের বাণ নিঃশেষ হলে তিনি ধনু দিয়ে প্রহার করতে লাগলেন, কিন্তু সেই ম্লেচ্ছ দস্যুগণ তাঁর সামনেই বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় সুন্দরীদের হরণ কোরে নিয়ে গেলো। অর্জুন তার দুর্দশা দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন এবং অবশিষ্ট নারীদের নিয়ে কুরুক্ষেত্রে এলেন।
কৃতবর্মার পুত্র এবং ভোজ নারীগণকে মার্তিকাবত নগরে এবং সাত্যকির পুত্রকে সরস্বতী নদীর নিকটবর্তী প্রদেশে রেখে অর্জুন অবশিষ্ট বালক বৃদ্ধ ও রমণীদেরকে ইন্দ্রপ্রস্থে আনলেন। কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রকে তিনি ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্য দিলেন। কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী গান্ধারী শৈব্যা হৈমবতী ও জাম্ববতী অগ্নিপ্রবেশ করলেন। সত্যভামা ও কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ হিমালয় অতিক্রম কোরে কলাপ গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন। দ্বারকাবাসী পুরুষগণকে বজ্রের কাছে রেখে অর্জুন সজলনয়নে বেদব্যাসের আশ্রমে এলেন।
অর্জুনকে দেখে বেদব্যাস বললেন, তোমাকে এমন শ্রীহীন দেখছি কেন? তুমি কি ব্রাহ্মণহত্যা করেছ, না যুদ্ধে পরাজিত হয়েছ? অর্জুন দ্বারকার সমস্ত ঘটনা, কৃষ্ণ-বলরামের মৃত্যু এবং দস্যুহস্তে তার পরাজয়ের বিবরণ দিলেন। পরিশেষে তিনি বললেন, সেই শঙ্খচক্রগদাধর শ্যামতনু পীতাম্বর পরমপুরুষ কৃষ্ণ, যিনি আমার সঙ্গে রথে থাকতেন, সেই কৃষ্ণকে আমি দেখতে পাচ্ছি না, আর আমার জীবনধারণের প্রয়োজন কি? তার অদর্শনে আমার শরীর অবসন্ন হয়েছে, আমি শান্তি পাচ্ছি না। আপনি বলুন এখন আমার কি কর্তব্য।
বেদব্যাস বললেন, বৃষ্ণি-অন্ধক বীরগণ ব্রহ্মশাপে বিনষ্ট হয়েছেন, তাঁদের জন্য শোক কোরো না। কৃষ্ণ জানতেন যে তাদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী, সেজন্য নিবারণে সমর্থ হয়েও উপেক্ষা করেছেন। তিনি পৃথিবীকে ভারমুক্ত কোরে দেহত্যাগ কোরে স্বীয় ধামে ফিরে গেছেন। ভীম ও নকুল-সহদেবের সাহায্যে তুমি মহৎ দেবকার্য সাধন করেছ, যেজন্য পৃথিবীতে এসেছিলে তা সম্পন্ন কোরে কীর্তিমান হয়েছ। তোমাদের কাল পূর্ণ হয়েছে, এখন প্রস্থান করাই শ্রেয়। তোমার অস্ত্রসমূহের প্রয়োজন শেষ হওয়াতেই তারা স্বস্থানে ফিরে গেছে। আবার যথাকালে তারা তোমার হস্তগত হবে।
ব্যাসের উপদেশ শুনে অর্জুন হস্তিনাপুরে গেলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে সমস্ত ঘটনা জানালেন।
______________
(ক্রমশ)