মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৬
মহাপ্রস্থানের পথে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
মহাপ্রস্থানের পথে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী
অর্জুনের মুখে যাদবগণের বিনাশের বিবরণ শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, কাল সকলকেই বিনষ্ট করেন, তিনি আমাকেও আকর্ষণ করছেন। এখন তোমরা নিজেদের কর্তব্য স্থির করো। ভীম অর্জন নকুল ও সহদেব সকলেই বললেন, আমরাও কালের প্রভাব মেনে নিতে চাই।
পরীক্ষিৎকে রাজ্যে অভিষিক্ত কোরে এবং যুযুৎসুর উপর রাজ্যপালনের ভার দিয়ে যুধিষ্ঠির সুভদ্রাকে বললেন, তোমার পৌত্র কুরুবংশের রাজা হয়ে হস্তিনাপুরে থাকবেন। যাদবগণের একমাত্র বংশধর কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রকে আমি ইন্দ্রপ্রস্থে অভিষিক্ত করেছি, সে অবশিষ্ট যাদবগণকে পালন করবে। তুমি এঁদের রক্ষা করো, যেন অধর্ম না হয়। তারপর যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা বসুদেব, কৃষ্ণ ও বলরাম প্রভৃতির যথাবিধি শ্রাদ্ধ করলেন এবং কৃষ্ণের উদ্দেশে বেদব্যাস নারদ মার্কণ্ডেয় ভরদ্বাজ ও যাজ্ঞবল্ক্যকে ভোজন করিয়ে ব্রাহ্মণগণকে বহু ধনরত্ন দান করলেন। যুধিষ্ঠির কৃপাচার্যকে পরীক্ষিতের শিক্ষার ভার দিলেন এবং প্রজাগণকে আহ্বান কোরে মহাপ্রস্থানের সংকল্প জানালে, প্রজারা উদ্বিগ্ন হয়ে বারণ করতে লাগল, কিন্তু যুধিষ্ঠির তার সংকল্প ত্যাগ করলেন না।
যুধিষ্ঠির, তাঁর ভাইয়েরা এবং দ্রৌপদী সমস্ত অলঙ্কার ত্যাগ করে বল্কল পরলেন এবং যজ্ঞ কোরে তার আগুন জলে নিক্ষেপ করলেন। তারপর তারা হস্তিনাপুর থেকে যাত্রা করলেন। নারীগণ উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন। পুরবাসী ও অন্তঃপুরবাসিনীগণ বহুদূর পর্যন্ত তাদের পিছনে গেলেন, কিন্তু কেউ পাণ্ডবগণকে ফিরে আসতে বললেন না। নাগকন্যা উলূপী গঙ্গায় প্রবেশ করলেন, চিত্রাঙ্গদা মণিপুরে ফিরে গেলেন আর অন্যান্য পাণ্ডবপত্নীগণ পরীক্ষিতের কাছে রইলেন।
পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী উপবাস কোরে পূব দিকে চললেন, একটি কুকুর তাঁদের পিছনে যেতে লাগল। তারা বহু দেশ অতিক্রম কোরে লোহিত্ সাগরের তীরে উপস্থিত হলেন। আসক্তিবশত অর্জুন এ পর্যন্ত তার গাণ্ডীব ধনু ও দুই অক্ষয় তূণ ত্যাগ করেননি। এখন অগ্নিদেব মূর্তিমান হয়ে পথরোধ কোরে বললেন, পাণ্ডবগণ, আমার কথা শোনো, আমি অগ্নিদেব, অনেক দিন আগে অর্জুন ও কৃষ্ণের সহায়তায় খাণ্ডব বন দহন করেছিলাম। আমি বরুণের কাছ থেকে এই ধনু এনে অর্জুনকে দিয়েছিলাম, এখন ইনি এই ধনু বরুণকে ফিরিয়ে দিন। অর্জুনের আর গাণ্ডীবের প্রয়োজন নেই। কৃষ্ণের চক্রও এখন প্রস্থান করেছে, যথাকালে আবার তার কাছে যাবে। এই কথা শুনে অর্জুন তার গাণ্ডীব ধনু ও তূণ জলে নিক্ষেপ করলে অগ্নিদেব অন্তর্হিত হলেন। পাণ্ডবগণ পৃথিবী প্রদক্ষিণের ইচ্ছায় প্রথমে দক্ষিণ দিকে চললেন, তার পর লবণ সমুদ্রের উত্তর তীর দিয়ে পশ্চিম দিকে এলেন এবং সাগরপ্লাবিত দ্বারকাপুরী দেখে উত্তর দিকে যাত্রা করলেন।
______________
(ক্রমশ)