মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৭
মহাপ্রস্থানের পথে দ্রৌপদী সহদেব নকুল অর্জুন ও ভীমের মৃত্যু
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারত সংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনি সমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনি সমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
মহাপ্রস্থানের পথে দ্রৌপদী সহদেব নকুল অর্জুন ও ভীমের মৃত্যু
সাগরের জলে প্লাবিত হয়ে যাওয়া দ্বারকাপুরী দেখে উত্তর দিকে যাত্রা কোরে পাণ্ডবগণ ও দ্রৌপদী হিমালয় পার হয়ে বালুকার্ণব ও মেরুপত দর্শন কোরে যোগযুক্ত হয়ে দ্রুত চলতে লাগলেন। যেতে যেতে হঠাৎ দ্রৌপদী যোগভ্রষ্ট হয়ে ভূপতিত হলেন। ভীম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, দ্রৌপদী কোনও অধর্ম আচরণ করেননি, তবে কেন ভূপতিত হোলো? যুধিষ্ঠির বললেন, অর্জুনের উপর দ্রৌপদীর বিশেষ পক্ষপাত ছিলো, এখন সে তারই ফল পেয়েছে। এই বলে যুধিষ্ঠির সমাহিত মনে চলতে লাগলেন, দ্রৌপদীর দিকে আর ফিরে তাকালেন না।
দ্রৌপদী পড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে সহদেব পড়ে গেলেন। ভীম বললেন, এই সহদেব নিরহংকার ছিলো এবং সর্বদা আমাদের সেবা করতো, তা সত্ত্বেও সে ভূপতিত হোলো কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, সহদেব মনে করতো ওর চেয়ে বিজ্ঞ আর কেউ নেই। এই বলে যুধিষ্ঠির পিছনে না তাকিয়ে এগিয়ে চললেন।
তারপর কিছুক্ষণ পরে নকুল পড়ে গেলেন। ভীম বললেন, আমাদের এই অতুলনীয় রূপবান ভাই ধর্ম থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি এবং সর্বদা আমাদের আদেশ পালন করতো, তবুও ভূপতিত হোলো কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, নকুল মনে করতো তার তুল্য রূপবান কেউ নেই। ভীম, তুমি আমার সঙ্গে এসো, নকুল তার কর্মের বিধি দ্বারা নির্দিষ্ট ফল পেয়েছে। এইভাবে দ্রৌপদী, নকুল ও সহদেবের পরিণাম দেখে অর্জুন শোকার্ত হয়ে চলছিলেন। তার পর কিছু দূর গিয়ে তিনিও পড়ে গেলেন। ভীম বললেন, অর্জুন পরিহাস করেও কখনও মিথ্যা বলেনি, তবে কেন এঁর এমন দশা হোলো? যুধিষ্ঠির বললেন, অর্জুন সর্বদা গর্ব করতো যে এক দিনেই সে সকল শত্রু বিনষ্ট করবে, কিন্তু সে তা করতে পারেনি। তা ছাড়া অর্জুন অন্য ধনুর্ধরদের অবজ্ঞা করতো। ঐশ্বর্যকামী পুরুষের এমন করা উচিত নয়। এই বলে যুধিষ্ঠির চলতে লাগলেন।
তারপর ভীম ভূপতিত হয়ে বললেন, মহারাজ, দেখুন, আমিও পড়ে গেছি। আমি আপনার প্রিয়, তবে আমার পতন হোলো কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, তুমি অত্যন্ত ভোজন করতে এবং অন্যের বল না জেনেই নিজের বলের গর্ব করতে। এই বলে যুধিষ্ঠির ভীমের প্রতি না তাকিয়ে এগিয়ে চললেন আর সেই কুকুর তার পিছনে চললো।
______________
(ক্রমশ)