মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৯
যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শন
জনমেজয় বৈশম্পায়নকে বললেন, মহর্ষি বেদব্যাসের আশীর্বাদে আপনি সর্বজ্ঞ হয়েছেন। আমার পূর্ব পিতামহগণ স্বর্গে গিয়ে কোন্ স্থানে রইলেন তা শুনতে ইচ্ছা করি। বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বলতে লাগলেন।
যুধিষ্ঠির স্বর্গে গিয়ে দেখলেন, দুর্যোধন সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে দেবগণ ও সাধুগণের মধ্যে বসে আছেন। যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হয়ে উচ্চস্বরে বললেন, আমি দুর্যোধনের সঙ্গে বাস করবো না। যে লোক দ্রৌপদীকে সভার মধ্যে নিগৃহীত করেছিল, যার জন্য আমরা মহাবনে বহু কষ্ট ভোগ করেছি এবং যুদ্ধে বহু সুহৃৎ ও বান্ধব বিনষ্ট করেছি, সেই লোভী অদূরদর্শী দুর্যোধনকে দেখতে চাই না, আমি আমার ভাইদের কাছে যাবো। নারদ সহাস্যে বললেন, মহারাজ, এমন কথা বলো না, স্বর্গে বাস করলে বিরোধ থাকে না। স্বর্গবাসী সকলেই দুর্যোধনকে সম্মান করেন। ইনি ক্ষত্ৰধর্ম অনুসারে যুদ্ধে নিজের দেহ উৎসর্গ কোরে বীরলোক লাভ করেছেন, মহাভয় উপস্থিত হলেও ইনি কখনও ভীত হননি। তোমরা পূর্বে যে কষ্ট পেয়েছিলে তা এখন ভুলে যাও, বৈরভাব ত্যাগ কোরে দুর্যোধনের সঙ্গে মিলিত হও।
যুধিষ্ঠির বললেন, যার জন্য পৃথিবী বিনষ্ট হয়েছে এবং আমরা প্রতিশোধ নেবার জন্য ক্রুদ্ধ হয়েছি, সেই অধর্মাচারী পাপী জ্ঞাতিদ্রোহী দুর্যোধনের যদি এই গতি হয় তবে আমার মহাপ্রাণ মহাব্রত সত্যপ্রতিজ্ঞ ভাইয়েরা কোথায় গেছেন? কর্ণ ধৃষ্টদ্যুম্ন সাত্যকি বিরাট দ্রুপদ শিখণ্ডী অভিমন্যু দ্রৌপদীর পুত্রগণ প্রভৃতি কোন্ লোকে গেছেন? আমি তাদের দেখতে ইচ্ছা করি। দেবর্ষি, সেই মহারথগণ কি স্বর্গবাসের অধিকার পাননি? তারা যদি এখানে না থাকেন তবে আমিও থাকব না। আমার ভাইয়েরা যেখানে আছেন সেই স্থানই আমার স্বর্গ।
দেবগণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, যদি তাদের কাছে যাবার ইচ্ছা থাকে তো যাও, বিলম্ব কোরো না। এই বলে তারা এক দেবদূতকে আদেশ দিলেন, যুধিষ্ঠিরকে তার আত্মীয়-সুহৃদ্গণের নিকটে নিয়ে যাও। পাপীরা যে পথে যায় সেই পথ দিয়ে দেবদূত যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে চললেন। সেই পথ অন্ধকারে ঢাকা, পাপীদের গন্ধযুক্ত, রক্তমাংসের কাদা অস্থি চুল ও মৃতদেহে ছেয়ে আছে এবং মশা মাছি কৃমিকীট ও ভল্লুকাদি হিংস্র প্রাণীতে সমাকীর্ণ। চতুর্দিকে আগুন জ্বলছে। লৌহমুখ কাক, সূচীমুখ শকুন এবং পর্বতাকার প্রেতগণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। চর্বি ও রক্তমাখা ছিন্নবাহু ছিন্নপদ মৃতদেহ সর্বত্র পড়ে আছে। সেই পূতিগন্ধময় লোমহর্ষকর পথে যেতে যেতে যুধিষ্ঠির ফুটন্ত জলপূর্ণ দুর্গম নদী, গরম তেলপূর্ণ লোহার কলস, তীক্ষ্ম কণ্টকময় শাল্মলী বৃক্ষ প্রভৃতি এবং পাপীদের যন্ত্রণাভোগ দেখলেন। তিনি দেবদূতকে প্রশ্ন করলেন, এই পথ দিয়ে আর কত দূর যেতে হবে? আমার ভাইয়েরা কোথায়? দেবদূত বললেন, মহারাজ, আপনি শ্রান্ত হলেই দেবগণের আদেশ অনুসারে আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো। মনঃকষ্টে ও দুর্গন্ধে পীড়িত হয়ে যুধিষ্ঠির প্রত্যাবর্তনের উপক্রম করলেন। তখন তিনি এই করুণ বাক্য শুনলেন - হে ধর্মপুত্র রাজর্ষি, দয়া কোরে মুহূর্তকাল থাকুন। আপনার আগমনে সুগন্ধ পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে, দীর্ঘকাল পরে আপনাকে দেখে আমরা সুখী হয়েছি, আমাদের যন্ত্রণারও উপশম হয়েছে। দয়ালু যুধিষ্ঠির বারবার এইরূপ শুনে প্রশ্ন করলেন, আপনারা কে, কেন এখানে আছেন? তখন চারিদিক হতে উচ্চকণ্ঠে উত্তর এল — আমি কর্ণ, আমি ভীম, আমি অর্জুন, আমি নকুল, আমি সহদেব, আমি ধৃষ্টদ্যুম্ন, আমি দ্রৌপদী, আমরা দ্রৌপদীপুত্র। যুধিষ্ঠির ভাবতে লাগলেন, দৈব এ কি করেছেন! কোন্ পাপের ফলে এঁরা এই নিদারুণ স্থানে আছেন? আমি জেগে না ঘুমিয়ে আছি, চেতন না অচেতন? এ কি আমার মনের বিকার না বিভ্রম? যুধিষ্ঠির দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় ব্যাকুল হলেন এবং ক্রুদ্ধকণ্ঠে দেবদূতকে বললেন, তুমি যাঁদের দূত তাদের কাছে গিয়ে বলো যে আমি ফিরে যাবো না, এখানেই থাকব, আমাকে পেয়ে আমার ভাইয়েরা সুখী হয়েছেন। দেবদূত ফিরে গিয়ে ইন্দ্রকে যুধিষ্ঠিরের বাক্য জানালেন।
কিছুক্ষণ পরে ইন্দ্রাদি দেবগণ ও ধর্ম যুধিষ্ঠিরের কাছে এলে সহসা অন্ধকার দূর হোলো, বৈতরণী নদী, লৌহকুম্ভ, কণ্টকময় শাল্মলী বৃক্ষ প্রভৃতি এবং বিকৃত শরীর সকল অদৃশ্য হোলো, পাপীদের আর্তনাদ আর শোনা গেল না, শীতল সুগন্ধ পবিত্র বায়ু বইতে লাগল। ইন্দ্র বললেন, যুধিষ্ঠির, দেবগণ তোমার উপর প্রীত হয়েছেন, তুমি আমাদের সঙ্গে এসো। ক্রুদ্ধ হয়ো না, সকল রাজাকেই নরক দর্শন করতে হয়। সকল মানুষেরই পাপপুণ্য থাকে। যার পাপের ভাগ অধিক এবং পুণ্য অল্প সে প্রথমে স্বর্গ ভোগ করে পরে নরকে যায়। যার পুণ্য অধিক এবং পাপ অল্প সে প্রথমে নরক ও পরে স্বর্গ ভোগ করে। তুমি দ্রোণকে অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ দিয়ে প্রতারিত করেছিলে, তাই আমি তোমাকে ছলক্রমে নরক দেখিয়েছি। তোমার ভাইয়েরা এবং দ্ৰৌপদীও ছলনা করার জন্য নরকভোগ করেছেন। তোমার পক্ষে যে সকল রাজা নিহত হয়েছিলেন তারা সকলেই স্বর্গে এসেছেন। যার জন্য তুমি পরিতাপ করো সেই কর্ণও পরমসিদ্ধি লাভ করেছেন। তুমি পূর্বে কষ্টভোগ করেছ, এখন শোকশূন্য নিরাময় হয়ে আমার সঙ্গে স্বর্গে বাস করবে। এই ত্রিলোকপাবনী দেবনদী আকাশগঙ্গায় স্নান কোরে মানুষভাব থেকে মুক্ত হও।
মূর্তিমান ধর্ম তার পুত্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, বৎস, এই তৃতীয়বার তোমাকে আমি পরীক্ষা করেছি, তোমাকে বিচলিত করা অসাধ্য। তোমরা কেউ নরক-ভোগের যোগ্য নও, তুমি যা দেখেছ তা ইন্দ্রের মায়া। তার পর যুধিষ্ঠির আকাশগঙ্গায় স্নান কোরে মনুষ্যদেহ ত্যাগ করলেন এবং দিব্য দেহ ধারণ কোরে যেখানে পাণ্ডব ও ধৃষ্টরাষ্ট্রের পুত্রগণের সঙ্গে ক্রোধশূন্য হয়ে সুখে অবস্থান করছিলেন সেখানে গেলেন।
______________
(ক্রমশ)