Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 250

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৫০

কৌরব ও পাণ্ডবগণের স্বর্গলাভ

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

কৌরব ও পাণ্ডবগণের স্বর্গলাভ

যুধিষ্ঠির কৌরব ও পাণ্ডবগণের কাছে এসে দেখলেন, কৃষ্ণ ব্রাহ্মীদেহ ধারণ কোরে দীপ্যমান হয়ে বিরাজ করছেন, তাঁর চক্র প্রভৃতি ঘোর অস্ত্রসমূহ পুরুষমূর্তিতে তার নিকটে রয়েছে, অর্জুন তাঁকে উপাসনা করছেন। যুধিষ্ঠিরকে দেখে কৃষ্ণ ও অর্জুন যথাবিধি অভিবাদন করলেন। তার পর যুধিষ্ঠির অন্যান্য স্থানে গিয়ে বারো জন আদিত্যের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ কর্ণ, মরুৎগণবেষ্টিত ভীম, অশ্বিনীদ্বয়ের নিকটে নকুল ও সহদেব এবং সূর্যের ন্যায় প্রভাশালিনী পদ্মফুলের মালা পরিহিতা দ্রৌপদীকে দেখলেন।

ইন্দ্র বললেন, দ্রৌপদী অযোনিজা লক্ষ্মী, শূলপাণি তোমাদের প্রীতির নিমিত্ত এঁকে সৃষ্টি করেছিলেন। এই পাঁচ জন গন্ধর্ব তোমাদের পুত্ররূপে এঁর গর্ভে জন্মেছিলেন। এই গন্ধর্বরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে দেখ, ইনিই তোমার পিতৃব্য ছিলেন। এই সূর্যতুল্য বীর তোমার অগ্রজ কর্ণ। বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় মহারথগণ, সাত্যকি প্রভৃতি ভোজবংশীয় বীরগণ এবং সুভদ্রাপুত্র চন্দ্রকান্তি অভিমন্যু — এঁরা সকলেই দেবগণের মধ্যে রয়েছেন। এই দেখ তোমার পিতা পাণ্ডু ও মাতা কুন্তী ও মাদ্রী, এঁরা বিমানযোগে সর্বদা আমার কাছে আসেন। বসুগণের মধ্যে ভীষ্ম এবং বৃহস্পতির পাশে তোমার গুরু দ্রোণকে দেখো। অন্যান্য রাজা ও যোদ্ধারা গন্ধর্ব যক্ষ ও সাধুগণের সঙ্গে রয়েছেন।

জনমেজয় প্রশ্ন করলেন, দ্বিজোত্তম, আপনি যাঁদের কথা বললেন তারা কত কাল স্বর্গবাস করেছিলেন? কর্মফলভোগ শেষ হলে তারা কোন গতি পেয়েছিলেন? বৈশম্পায়ন বললেন, অগাধবুদ্ধি সর্বজ্ঞ বেদব্যাসের নিকট আমি যেমন শুনেছি তাই বলছি। ভীষ্ম বসুগণে, দ্রোণ বৃহস্পতির শরীরে, কৃতবর্মা মরুৎগণে, প্রদ্যুম্ন সনৎকুমারে, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী কুবেরলোকে, পাণ্ডু কুন্তী ও মাদ্রী ইন্দ্রলোকে এবং বিরাট দ্রুপদ ভূরিশ্রবা উগ্রসেন কংস অক্রুর বসুদেব শাম্ব প্রভৃতি বিশ্বদেবগণে প্রবেশ করেছেন। চন্দ্রপুত্র বৰ্চা অভিমন্যু রূপে জন্মেছিলেন, তিনি চন্দ্রলোকে গেছেন। কর্ণ সূর্যের, শকুনি দ্বাপরের এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন পাবকের শরীরে গেছেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা রাক্ষসের অংশে জন্মেছিলেন, তারা অস্ত্রাঘাতে পূত হয়ে স্বর্গলাভ করেছেন। বিদুর ও যুধিষ্ঠির ধর্মে লীন হয়েছেন। বলরামরূপী ভগবান অনন্তদেব রসাতলে প্রবেশ করেছেন। নারায়ণের অংশে যিনি জন্মেছিলেন সেই কৃষ্ণ নারায়ণের সহিত যুক্ত হয়েছেন। তার ষোলো হাজার পত্নী কালক্রমে সরস্বতী নদীতে প্রাণত্যাগ কোরে অপ্সরার রূপে নারায়ণের কাছে গেছেন। ঘটোৎকচ প্রভৃতি দেবলোক ও রাক্ষসলোক লাভ করেছেন। কর্মফলভোগ শেষ হলে এঁদের অনেকে সংসারে প্রত্যাবর্তন করবেন।

রাজা জনমেজয় বৈশম্পায়নের মুখে মহাভারতের কথা শুনে অতিশয় বিস্মিত হলেন। তাঁর যজ্ঞ সমাপ্ত হোলো, সর্পগণের মুক্তিতে আস্তীক মুনি প্রীত হলেন। ব্রাহ্মণগণ দক্ষিণা পেয়ে তুষ্ট হয়ে চলে গেলেন, নিমন্ত্রিত রাজারাও প্রস্থান করলেন। তার পর জনমেজয় যজ্ঞস্থান তক্ষশিলা থেকে হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।

______________

(ক্রমশ)