পর্ব - ১
মুখার্জী বাড়িতে সারাক্ষণ যেন হৈচৈ চলছে। মেজভাই তপনবাবুর একমাত্র মেয়ে নীরার জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হয়েছিল। এম এ পাশ করে বি এড পড়ছে নীরা, বাড়ির সবার আদরের তুলি। যৌথ পরিবারের হাওয়া এখনও ঘোরে এবাড়িতে। বড়সড় সিদ্ধান্ত নিতে বড়ভাই স্বপনবাবুর মতই মানা হয়। তা ওনার মত হল, এখন থেকে খোঁজ খবর হোক না। লাখ কথা না হলে তো আর বিয়ে হচ্ছে না।
সেটাও ঠিক। এই যে স্বপনবাবুর বড় ছেলে পুপুলের বিয়ে হল গতবছর, পাক্কা দুটি বছর ধরে পাত্রী দেখা চলেছে। রিটায়ার করেছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছিল। প্রায় প্রায় রবিবার গিন্নি আর দুই ভাইয়ের বৌকে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাওয়া। এদিকে তিন জায়ের কাউকে পছন্দ হয় না। রাগে আগুন হয়ে যেতেন মানুষটা। কোনো মেয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসেছে, কোনো মেয়ে হাতজোড় করে সবাইকে নমস্কার জানিয়েছে, এগুলো একটা যুক্তি হল বাতিল করার?
শেষে অবশ্য ময়ুরাক্ষীকে অদ্ভুত ভাবে পছন্দ হল। তিন গিন্নি গেছিলেন সিনেমা দেখতে। ময়ুরাক্ষী এসেছিল বন্ধুদের সঙ্গে। হলে ঢোকার আগে দেখেছেন, পাঁচটি মেয়ে হল্লা করছে, এ ওর কানে কানে কথা বলে ঠেলাঠেলি করে হাসছে। এতো সর্বত্র দেখা যায়।
ঘটনাটা হল সিনেমা দেখে বেরিয়ে। পা পিছলে পড়ে গেলেন মেজো গিন্নি বিদিশা। ছুটে এল ময়ুরাক্ষী। ধরে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানে বসালো। কোথা থেকে বরফও ম্যানেজ করে আনল। বন্ধুরা দেরি হলে বাড়িতে বকুনির ভয়ে সরে পড়ল। ময়ুরাক্ষী, মৌ কিন্তু ঠায় রয়ে গেল।
কর্তাদের বকুনির ভয়ে তাদের না জানিয়ে পুপুল আর বুবুন দুই ভাইকে ফোন করে আনানো হল। ওদের সঙ্গেও বেশ কথাবার্তা হল মৌয়ের। নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বলল, আন্টি কেমন থাকেন ওকে একবার খবর দিতে।
পরদিন তিন জা ফোনে আধঘণ্টা আড্ডা দিয়ে ফেললেন ওর সঙ্গে। পরের বার প্ল্যান করে একসঙ্গে সিনেমায় যাবেন অবধি ভাব এগিয়ে গেল।
ফোন রেখে বড়জা মঞ্জুশ্রী চুপিচুপি বাকি দুজনকে বললেন, "আজকালকার মেয়ে, প্রেম ট্রেম করে কিনা কে জানে। নাহলে কাল যখন পুপুলের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, ভারী মানিয়েছিল বল?"
বাকি দুই জাও সায় দেয়, হ্যাঁ হ্যাঁ। খোঁজ নিতে বাধা কোথায়?
বিদিশার পায়ের ব্যাথা কমে গেছে। তাই বিকেলের চায়ের সঙ্গে ভাল "টা" গুছিয়ে মানে ভাসুরের পছন্দের পেঁয়াজি ভেজে কথাটা পাড়েন। ঢাকা চাপা দিয়ে কালকের ঘটনাও বলা হয়।
একেই ভাইয়ের বৌরা স্বপনবাবুর খুব প্রিয়। প্রবাসী ছোট বোনের জায়গাটা দখল করেছে বিয়ে হয়ে এসেই। তার উপর এবার যদি পাত্রী দেখার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তিনি হাতে চাঁদ পেলেন।
মৌয়ের থেকেই ওর বাবার নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করা হয়, দেখাশোনা, কথাবার্তা। বাড়িতে সানাই বাজে। মৌকে পেয়ে বাড়ির বড় থেকে ছোট সবাই খুশি। বিয়ের আগে একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়াত। এখন আরও সুবিধা, পাড়াতেই নিজের পিসিশাশুড়ির স্কুলে ঢুকে পড়েছে।
সে জায়গায় এবার আরও ছেলের না, বাড়ির মেয়ের বিয়ে বলে কথা। স্বপনবাবু একটু আগাম ময়দানে নামতে চান। লোকে দেখা হলে তো বলছেও তুলির বিয়ের কথা। এই তো আগের রবিবারের বাজারে অরূপ ঘোষাল, স্বপনবাবুর ছোটবেলার বন্ধুও কথা তুললেন, "কিছু ভাবছিস নাকি? আমার বোন সুকন্যার ছেলে তীর্থর জন্য মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। দেখেছিস তো ওকে, এক ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার। তোরা যদি হ্যাঁ বলিস, আমাদের খুব ইচ্ছে।"
স্বপনবাবু মনে মনে বলেন, "তোর ইচ্ছে হলেই তো হল না। আমার বাড়িতে যা তিন দেবী আছে।" মুখে বলেন, "বাড়িতে বলি। একদিন কথাবার্তা হোক।"
কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, উভয় পক্ষেরই পছন্দ। একমাত্র ছেলে, বাবা সরকারী চাকুরে, মা বেশ সুশিক্ষিতা, কাছাকাছি বাড়ি। এমন ইঞ্জিনিয়ার পাত্র কেউ হাতছাড়া করে? তুলির পড়াশোনার কথা তোলা হয়েছিল। ছেলের বাড়ির তিনজনই বলেছে, পড়া শেষ করবে, তারপর চাকরি বাকরিও করুক।
তুলির হবু শাশুড়িমা সুকন্যা বলেছেন, "আসলে কি জানেন, থাকতাম তো দুই জা। ভাসুর কমবয়সে চলে গেছিলেন। দিদিভাই আর আমি আমাদের দুই ছেলে দীপ আর তীর্থকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। দীপ চলে গেল আমেরিকায়। বৌয়ের ছেলেপুলে হবে, মাকেও নিয়ে গেল। আমার যেন দিন কাটে না। আপনাদের মেয়েটাকে পেলে ঘরটা আবার হেসে উঠবে।" আর তো কথা চলে না। ওদিকে এই দুটিতেও এখানে ওখানে দেখা করে বেশ ভাব হয়েছে বোঝা যায়। দাও বিয়ে লাগিয়ে।
বাড়ির ছেলেমেয়েদের দল তো বটেই বড়রাও বেশ হৈচৈ, হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছেন তাই। মৌ নিত্যদিন ননদদের নিয়ে কেনাকাটা সারছে।
তিন গিন্নির মুখে চওড়া হাসি, কেমন লক্ষ্মীমন্ত বৌ এনেছি দেখো। মৌয়ের বিয়ে হতেই এককথায় মেয়েটার এমন ভাল বিয়ে হচ্ছে। হুঁ হুঁ বাবা।
চলবে
[ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই আমার সমস্ত পাঠক বন্ধুদের। শুরু করলাম আরো একটি রোমান্টিক থ্রিলার। আশা করি এবারও আপনাদের পাশে পাব। এই প্ল্যাটফর্মে আমার চতুর্থ গল্প হলেও, এটাই আমার প্রথম উপন্যাস। প্রতিলিপিতে আমার প্রোফাইল "Srabanti Ghosh অনীশা 🔱🕉️🌅🧿 গল্পের রঙমহল" এ সম্পূর্ণ গল্পটাই পেয়ে যাবেন। একটানা পড়তে চাইলে সেখানে পড়ে নিতে পারেন। ]