"ইন্ট্রো"
কলকাতার অভিজাত এলাকা বালিগঞ্জের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সাদা মার্বেলের প্রাসাদ—“রায় চৌধুরী ভিলা”—যেখানে প্রতিটি দেয়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, অহংকার আর অন্ধকার গোপন রহস্যের ইতিহাস। এই বাড়ির কর্তা অরিন্দম রায় চৌধুরী—ভারতের অন্যতম বড় গাড়ি কোম্পানি “RoyChowdhury Motors Pvt. Ltd.”-এর প্রতিষ্ঠাতা, যার এক ইশারায় শেয়ার মার্কেট কেঁপে ওঠে। তাঁর স্ত্রী নন্দিতা রায় চৌধুরী—সামাজিক কাজের আড়ালে নিজের প্রভাব বিস্তার করা এক রহস্যময় নারী। তাঁদের বড় ছেলে নীল রায় চৌধুরী—২৮ বছর বয়স, ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা, গাঢ় কালো চোখ, ঠোঁটের কোণে স্থায়ী ব্যঙ্গাত্মক হাসি, আর এমন এক উপস্থিতি যা কারও শ্বাস আটকে দিতে যথেষ্ট। সে শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নয়, সে এক ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়—মানুষকে ব্যবহার করতে জানে, ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবে, আর প্রতিশোধকে শিল্পে পরিণত করেছে। ছোট ভাই অয়ন রায় চৌধুরী—বিদেশে পড়াশোনা করছে, এখনও পুরোপুরি এই অন্ধকার দুনিয়ায় পা রাখেনি।
অন্যদিকে শহরের এক সাধারণ গলিতে ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটে থাকে আবিবা ইসলাম মিম—২২ বছর বয়সী, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার বাবা মাহবুব ইসলাম—একজন স্কুল শিক্ষক, সৎ কিন্তু জীবনের কাছে বারবার হেরে যাওয়া মানুষ। মা শারমিন ইসলাম—গৃহিণী, সংসারের টানাপোড়েনে ক্লান্ত হলেও মেয়ের স্বপ্নে ভরসা রাখেন। ছোট ভাই রাফি—স্কুলে পড়ে, দুষ্টু কিন্তু বোনকে ভীষণ ভালোবাসে। আবিবা নিজে শান্ত, কিন্তু ভেতরে আগুন—বড় বড় চোখে স্বপ্ন, ঠোঁটে চাপা জেদ, আর এক ধরনের সরলতা যা তাকে আলাদা করে তোলে। সে একটি ছোট ডিজাইন কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ করে, আর ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখে—যেখানে তার অজানা কষ্ট আর ভালোবাসা মিশে থাকে।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, যতদিন না আবিবার জীবন জড়িয়ে পড়ে নীল রায় চৌধুরীর সাথে। এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কালো BMW গাড়ির সামনে হঠাৎ থেমে যায় আবিবা। গাড়ির দরজা খুলে নেমে আসে নীল—ভেজা শার্টে, চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি—যেন কাউকে খুঁজছিল, আর হঠাৎ পেয়ে গেছে। সেই প্রথম দেখা—কিন্তু সেই দৃষ্টিতেই শুরু হয় এক অদ্ভুত খেলা।
নীলের জীবনে ভালোবাসা মানে ছিল কেবল নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু আবিবার হাসি, তার সহজ কথা, তার অবাধ্যতা—সবকিছু নীলকে অস্থির করে তোলে। সে আবিবাকে নিজের জীবনে টেনে নেয়—জোর করে, শর্ত দিয়ে, ভয় দেখিয়ে। আবিবার কাছে নীল এক দুঃস্বপ্ন—কখনো রাগে ভয়ংকর, কখনো অদ্ভুতভাবে যত্নশীল। “তুমি আমার… আর আমার জিনিস আমি কাউকে দিই না”—নীলের এই কথায় যেমন ছিল অধিকার, তেমনই ছিল ভয়।
কিন্তু এই সম্পর্কের পেছনে লুকিয়ে ছিল আরও বড় ঝড়। রুদ্র প্রতাপ সিংহ—RoyChowdhury Motors-এর প্রাক্তন পার্টনার, যাকে কোম্পানি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বিশাল এক বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। সে কোম্পানির গোপন প্রজেক্ট বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল, যার ফলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সেই অপমান, সেই ক্ষোভ নিয়ে সে এখন ফিরে এসেছে—প্রতিশোধ নিতে। তার পরিবার—স্ত্রী কাবেরী সিংহ, ছেলে অর্ণব সিংহ—সবাই মিলে নীলের পরিবারকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু—আবিবা।
ধীরে ধীরে আবিবা বুঝতে পারে, সে শুধু নীলের ভালোবাসার শিকার নয়—সে এক বড় খেলায় আটকে গেছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে রাখা হচ্ছে, তার প্রতিটি হাসি, কান্না—সবকিছু হিসাবের অংশ। তবুও, অদ্ভুতভাবে সে নীলের প্রতি টান অনুভব করতে থাকে—যে মানুষটা একদিকে তাকে ভাঙছে, অন্যদিকে আবার নিজের মতো করে আগলে রাখছে।
রাতের নির্জনে, নীলের রুমে দাঁড়িয়ে আবিবা কাঁপা গলায় বলে—“তুমি মানুষ না… তুমি একটা অন্ধকার।”
নীল হেসে কাছে আসে, তার কানে ফিসফিস করে—“আর তুমি সেই আলো… যেটাকে আমি নিভতে দেব না, কখনোই না।”
হাসি, কান্না, রাগ, স্পর্শ, দূরত্ব—সব মিলিয়ে এক জটিল সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে ভালোবাসা আর ঘৃণার সীমারেখা মুছে যায়। একদিকে রুদ্র প্রতাপের প্রতিশোধ, অন্যদিকে নীলের নিজের অন্ধকার অতীত—যেখানে লুকিয়ে আছে এমন কিছু সত্য, যা আবিবার জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
বৃষ্টির সেই রাতটার পর থেকেই আবিবা ইসলাম মিমের জীবন যেন আর নিজের থাকলো না—সবকিছু ধীরে ধীরে, অদৃশ্যভাবে চলে গেল নীল রায় চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে।
পরদিন সকালটা ছিল একদম অন্যরকম। ছোট্ট ডাইনিং টেবিলে বসে মিম চা খাচ্ছিল—মায়ের বানানো গরম দুধ চা, সাথে দুইটা মারি বিস্কুট। জানালার বাইরে ভেজা গাছপালা, রাস্তায় জমে থাকা পানি… সবকিছু আগের মতোই ছিল, শুধু মিমের ভেতরটা আর আগের মতো ছিল না।
“কি রে, এত চুপচাপ কেন?” —মা নাসরিন ইসলাম কৌতূহলী চোখে তাকালেন।
মিম হালকা হাসলো, মাথা নিচু করে বললো—
“কিছু না মা… একটু ক্লান্ত লাগছে।”
কিন্তু তার মাথার ভেতর ঘুরছিল শুধু একটা মুখ… গাঢ় কালো চোখ, ঠান্ডা হাসি… নীল রায় চৌধুরী।
ঠিক তখনই—
টেবিলের উপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠলো।
Unknown Number.
মিম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কলটা রিসিভ করলো—
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে খুব শান্ত, ধীর একটা কণ্ঠ—
“সকালের নাশতা ঠিকমতো খাচ্ছো তো?”
মিমের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো।
“আপনি…?”
“আমি কে, সেটা তো তুমি জানোই…”
এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর—
“নীল রায় চৌধুরী কখনো কাউকে একবার দেখলে ভুলে যায় না।”
মিম দাঁড়িয়ে গেল, বুকের ভেতর ধকধক শব্দ।
“আপনি আমার নাম্বার পেলেন কিভাবে?”
নীলের ঠান্ডা হাসি ফোনের ওপাশ থেকেও শোনা গেল—
“আমি চাইলে মানুষ হারিয়ে যায়, আর একটা নাম্বার খুঁজে বের করা তো খুব ছোট ব্যাপার, মিম।”
প্রথমবার… তার নামটা নীলের মুখে শুনে মিম কেমন যেন অদ্ভুত একটা শিহরণ অনুভব করলো।
“আপনি আমাকে ফলো করছেন?”
“না…”
একটু থেমে—
“আমি তোমাকে রক্ষা করছি।”
মিম বিরক্ত হয়ে বললো—
“আমার কোনো প্রোটেকশন লাগবে না।”
এইবার নীলের গলার স্বর একটু বদলে গেল—গভীর, কঠিন—
“তোমার লাগবে… কারণ তুমি বুঝতে পারছো না তুমি কোন খেলায় ঢুকে গেছো।”
কলটা কেটে গেল।
মিম কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার মনে হচ্ছিল—কিছু একটা খুব ভুল হচ্ছে… খুব বড় কিছু।
---
অন্যদিকে, রায় চৌধুরী ভিলার বিশাল গ্লাসের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নীল। হাতে ব্ল্যাক কফির মগ, চোখ নিচের গার্ডেনে—কিন্তু মাথার ভেতর শুধু একটাই মুখ…
আবিবা ইসলাম মিম।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো।
“Interesting…”
পেছন থেকে ঋত্বিক ঢুকে বললো—
“ভাই, আজকের মিটিং ১১টায়…”
নীল কোনো উত্তর দিল না।
“ভাই?”
নীল হঠাৎ বললো—
“ঋত্বিক…”
“হ্যাঁ?”
“কাউকে যদি নিজের করে নিতে ইচ্ছা করে… তাহলে কি করা উচিত?”
ঋত্বিক অবাক—
“মানে?”
নীল ধীরে ঘুরে তাকালো—চোখে সেই ভয়ংকর শান্তি—
“তার চারপাশের সব রাস্তা বন্ধ করে দিতে হয়… যাতে সে শেষ পর্যন্ত শুধু তোমার কাছেই আসে।”
ঋত্বিকের শরীর দিয়ে কাঁপুনি চলে গেল।
সে জানে—এই টোন মানে কিছু একটা খারাপ হতে যাচ্ছে।
---
পার্ট #২
কয়েকদিন পর…
মিম অফিস থেকে বের হয়ে বাসার দিকে হাঁটছিল। সন্ধ্যা নামছে, রাস্তার লাইটগুলো জ্বলে উঠছে। হঠাৎ সে টের পেল—কেউ তাকে ফলো করছে।
পেছনে তাকাতেই তিনজন লোক… চোখে খারাপ দৃষ্টি।
“এই শুনছো…”
মিম হাঁটার গতি বাড়ালো।
“এই দাঁড়াও না…”
হঠাৎ একজন তার হাত ধরে ফেললো।
“কোথায় যাচ্ছো একা একা?”
মিম চিৎকার করে উঠলো—
“ছাড়ুন!”
ঠিক তখনই—
একটা কালো গাড়ি ব্রেক কষে তাদের সামনে থামলো।
দরজা খুলে নামলো নীল।
কালো শার্ট, হাত গোটানো,হাতে একটা ঘুড়ি পড়া,চোখে আগুনের মতো ঠান্ডা রাগ।
“ওর হাত… কে ধরেছে?”
তিনজনের মধ্যে একজন হাসলো—
“তুই কে রে?”
পরের মুহূর্ত—
একটা জোরালো ঘুষি!
লোকটা সোজা মাটিতে পড়ে গেল।
সবকিছু এত দ্রুত হলো যে মিম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
নীল একে একে তিনজনকে এমনভাবে মারলো—কোনো চিৎকার নেই, কোনো তাড়াহুড়া নেই… শুধু নিখুঁত, ঠান্ডা আঘাত।
শেষে সে ধীরে ধীরে মিমের দিকে এগিয়ে এলো।
মিম পিছিয়ে গেল—
“আপনি… এভাবে কেন…”
নীল তার হাত শক্ত করে ধরে বললো—
“আমি আগেই বলেছিলাম… তুমি নিরাপদ না।” '' তোমার প্রটেকশন লাগবে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তোমার পাশে কাউকে চাই ''but তুমি আমার কথা শুনো নি।
নীল আবিবার হাত ধোরে কথা গুলো তাকে বলছিলো।
“ছাড়ুন!”
“চুপ…”
তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা শুনে মিম আর কথা বলতে পারলো না।
নীল তার মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো—
“কেউ তোমাকে ছুঁলে… আমি সহ্য করতে পারি না।”
মিমের চোখ ভিজে উঠলো—ভয়, রাগ, আর অদ্ভুত এক অনুভূতির মিশ্রণ।
“আপনি আমার কে?”
"আপনি কেন বারবার আমার সামনে আসেন?"
"এই ভাবে আমাকে কেন ডিসটার্ব করছেন?"
"আপনি কি চান আমার থেকে?"
কথা গুলো আবিবা কান্না করতে করতে বলছিলো।
এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…
নীল তার কানের কাছে ঝুঁকে ধীরে বললো—
“তোমার সবকিছু।”
নীল মনে মনে বলে ''আমার তোমাকে অনেক ভালো লেগেছে,,তোমার পাশে কাওকে দেখলে আমার রক্ত ফুটে উঠে ফুটন্ত লাভার মতো।
"তুমি শুধু আমার আমিও তোমাকে কারোর হতে দিবো।
তুমি একান্তই আমার ".........
---
দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল আরেক জোড়া চোখ…
রুদ্র সেন।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো—
“খেলা শুরু হলো, নীল… এবার দেখি তুমি কতটা বাঁচাতে পারো তোমার প্রিয় মানুষটাকে…”