পর্ব - ১০
--"তোমরা সবাই থামলে?" কড়া গলায় বলে ছোটমা। চোখের ইশারায় পুপুলকে সরতে বলে নিজে কাছে এসে দাঁড়ায়। বুবুনের পিঠে হাত রেখে বলে, "বুবুন, আমাকে বল।"
ছোটমা যখন বিয়ে হয়ে আসে, পুপুল সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ায়, আর বুবুন কোলে। ছোটমার কোলে চেপেই ওর ছোটবেলা কেটেছে। ছোটমা ওর একটু স্পেশাল। পুপুলের যেমন মেজমা। তাই ছোটমার মিষ্টি কথায় কাজ হয়।
বুবুন বলে, "আমি রুমুর বাবার কথা মোটেই ভাবিনি। সেসব বলতেও চাইনি। আমি বলেছি, রুমু একা একা আদরে যত্নে বড় হয়েছে। মুম্বাইয়ের মত জায়গায় থেকেছে। তার আগেও দিল্লীতে। ও হয়তো স্মার্ট, কিন্তু একটু বেশি স্মার্ট। এটাও ঠিক, বয়সও খুব কম। ওর পক্ষে আমাদের মতো বড় বাড়ির সবাইকে নিয়ে চলা সম্ভব? আমার তো মনে হয় না পারবে বলে।"
--"তুই ভুল ভাবছিস ভাইদা। রুমু ভারী ভাল, সহজ সরল মেয়ে। ওর ড্রেস, লুক, ঐ বাইরের ব্যাপারগুলো স্টাইলিশ। মেয়েটা খুব মিশুকে। এসেছে থেকে..... " উত্তেজনায় তুলি বলে যায় একটানা।
বুবুন এক ধমক দেয়, "এ্যাই তুই থামত। বড়দের কথার মধ্যে কেবল কথা।"
--"ওকে চুপ করাচ্ছ কেন? ও ঠিকই বলছে। রুমু ভারী ভাল মেয়ে। আমাদের তো সেজন্যই মনখারাপ। তুমি ওর সঙ্গে মেশোনি বলে। ও মায়ের মতো, মামাবাড়ির মতো। বাবার কোনো ছাপ ওর মধ্যে নেই। বাবার দোষে ওর দোষ হতে পারে না। তুমি সেটা ভাবছ না দেখে খুব ভাল লাগলো।" বৌমণি বলে।
ছোটমা এবার বলে, "ওরা ঠিক বলেছে বুবুন। না, তোর ওকে বিয়ে করতে হবে না। তবে একটা মানুষ সম্পর্কে ভুল ধারণা পুষে রাখিস না। রুমুর সঙ্গে তো সম্পর্ক থাকবে। একটা কথা তুই ঠিক বলেছিস। ও একা একা বড় হয়েছে। বাঈ মানে ঐ ঘরদোর দেখার লোকেদের কাছে বেশি ছিল। তাতে ও মানুষজনের সঙ্গ আরও বেশি খোঁজে। এই কদিন আমাদের ছাড়তেই চায় না। বড় মায়া মেয়েটার মনে। ভগবান না করুন, বাবলির একটা ভালমন্দ কিছু হলে মেয়েটার মুখের দিকে তাকাব কি করে? এখনও কিছু জানে না ও। এরপর যখন মা মুম্বাই যাবে, মেয়েকে রাখব কি করে কে জানে?" ছোটমা আঁচলে চোখ মোছে।
বুবুন বোকা বনে বসে আছে। কি সব বলছে? বাবলিপিসি রুমুকে রেখে মুম্বাই চলে যাবে কেন?
সেটাই প্রশ্ন করে, "বাবলিপিসি ওকে এখানে রেখে যাবে কেন?"
--"মুম্বাই যাওয়ার সময় নিয়েও যেতে পারে। রুমুই হয়তো এমন কান্নকাটি করবে যে নিতে বাধ্য হবে। বাবলি ঠিক হয়ে গেলে তো মিটেই গেল। তবে মেয়েটার কপাল তো, আমার বিশেষ ভরসা হয় না।" ছোটমা গিয়ে খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসেছে।
বুবুনের মনে হচ্ছে হায়রোগ্লিফিক ভাষায় কি সব বলছে ওকে।
--"আমি না তোমাদের একটাও কথা বুঝতে পারছি না। কি যে বলছ, জিজ্ঞেস করলে আরও কমপ্লেক্স করে বলছ। রুমুর কোনো সমস্যা? মানে খোলাখুলি বলোতো একবার।" বুবুন বুঝেছে কোথাও একটা গলদ আছে।
- "রুমুর সমস্যা কি জিজ্ঞেস করছিস, কেন তুই কিছু জানিস না? হ্যাঁ রে, তোরা বুবুনকে কিছু বলিসনি? ও জানেনা বাবলির কথা?" ছোটকা সবার মুখের উপর চোখ বোলায়।
অন্যদেরও মাথায় ঘুরছে, বুবুনকে কি বলেছি আমরা? সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, না তো, বুবুন তো ছিল না এই কথার সময়।
--"ছোটকা, জিজ্ঞাসাবাদ রাখ। আমাকে বল তো হয়েছেটা কি? আমার মনে হচ্ছে, একটা বড় গোলমাল আছে। আর গোলমালটা একা আমি জানি না।" বুবুনের চোখ সরু, কপালে ভাঁজ। ছোটকার দিকে ঝুঁকে বসেছে।
ছোটকারও কপালে ভাঁজ, একটু যেন অন্যমনস্ক, কনফিডেন্স লেভেলটা টলে গেছে। মাথার চুলের মধ্যে চিরুণির মত আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলে, "তুই মানে তোকে বোধহয় বলা হয়নি। বাবলির ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। বাবলি নিজেই জেনেছে। তারপর এখানে এসেছে সবার সঙ্গে দেখা করবে, পারলে রুমুর বিয়ে দেবে ভেবে। কেউ জানত না। রুমুও এখনও জানেনা। প্রথমে শর্মি জেনেছে, তারপর একে একে আমরা সবাই।"
স্তব্ধ হয়ে বসে আছে বুবুন। ঘরের বাকিরাও। বুবুন ভাবছে গত কয়েক ঘন্টা ধরে যে মেয়েটার উপর রাগে ফেটে পড়ছে ও, সেই রাগের কোনো ভিত্তিই নেই। এই বিয়ের প্রস্তাব ভালমন্দ যাই হোক, রুমু কিছু জানেই না। বরং কি দুর্ভাগা মেয়েটা।
আর বাকিরা ভাবছে, বুবুনকে সবচেয়ে দরকারি কথাটা জানানোই হয়নি। বুবুন যে জানেনা, সেটাই কারো খেয়াল হয়নি। তাই রুমুর ব্যাপারে ওর বিরক্তি কি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল এতক্ষণ। একবারও ওদের মনে হল না, রুমুকে নিজের পাত্রী মানতে নাই পারে বুবুন, কিন্তু এতটাও হৃদয়হীন নয় তাদের বাড়ির ছেলে যে রুমুর জন্য একটুও মায়াদয়া বোধ করবে না?
সবাই নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে।
চলবে