Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

অন্ধকারের সংকেত - 1

কলকাতার আকাশটা সেদিন অদ্ভুতভাবে মেঘলা ছিল। দুপুর হলেও চারপাশে একটা গুমোট অন্ধকার নেমে এসেছিল। আমি, রুদ্র, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। রাস্তার গাড়িগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, যেন তারাও এই অদ্ভুত আবহাওয়ার প্রভাব অনুভব করছে।

ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।

আমি দরজা খুলতেই দেখতে পেলাম একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,

— অরিন্দম সেন কি বাড়িতে আছেন?

আমি মাথা নাড়লাম।

— আছেন। আপনি ভেতরে আসুন।

ভদ্রলোক ঘরে ঢুকতেই অরিন্দম সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।

— নমস্কার। আমি অরিন্দম সেন।

ভদ্রলোক বললেন,

— আমি অধ্যাপক অমিতাভ রায়। আমি আপনার সাহায্য চাই।

অরিন্দম চুপচাপ তাঁর দিকে তাকাল। তারপর বলল,
— কী ধরনের সাহায্য চান ?

অধ্যাপক রায় ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাম বের করলেন।
— গতকাল রাতে আমার বাড়ি থেকে একটা জিনিস চুরি হয়েছে।

— কী জিনিস?

— একটা মানচিত্র।

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম।
একটা মানচিত্র চুরি হওয়ার জন্য এত চিন্তার কী আছে?

কিন্তু অধ্যাপকের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল বিষয়টা সাধারণ নয়।

তিনি নিচু গলায় বললেন,
— এটা সাধারণ মানচিত্র নয়। প্রায় দুইশো বছরের পুরোনো।

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।অরিন্দম বলল — আমাকে বিস্তারিত বলুন।

অধ্যাপক রায় ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

প্রায় ছয় মাস আগে তিনি নদিয়ার এক পুরোনো জমিদার পরিবারের কাছ থেকে কিছু প্রাচীন দলিল সংগ্রহ করেছিলেন গবেষণার জন্য।

সেই দলিলগুলোর মধ্যেই ছিল একটি অদ্ভুত মানচিত্র।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটা সাধারণ কোনো জমির নকশা।

কিন্তু পরে বুঝতে পারেন মানচিত্রটিতে সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে।
এবং চিহ্নগুলো কোনো গুপ্তস্থানের ইঙ্গিত করছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
— গুপ্তধন?

অধ্যাপক রায় উত্তর দিলেন,
— হ্যাঁ হয়তো।

তারপর তিনি একটু থেমে বললেন,
— অথবা আরও ভয়ংকর কিছু থাকতেও পারে ।

অরিন্দমের চোখ চকচক করে উঠল। এমন রহস্যই ওর সবচেয়ে পছন্দ।

— মানচিত্রটা কোথায় রাখতেন?

— আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে।

— চুরি হয়েছে কীভাবে?

— সেটাই আশ্চর্য ব্যাপার।

গতকাল রাত দশটা পর্যন্ত মানচিত্রটি ছিল। আজ সকালে দেখি সেটা নেই। কিন্তু দরজা ভাঙা নয়।
জানালাও বন্ধ। কোনো জিনিসপত্রও এলোমেলো হয়নি। শুধু মানচিত্রটাই উধাও।

অরিন্দম কিছুক্ষণ চিন্তা করল।

তারপর বলল,

— আপনার বাড়িতে যেতে হবে।

এক ঘণ্টা পরে আমরা অধ্যাপক রায়ের বাড়িতে পৌঁছালাম। বাড়িটা উত্তর কলকাতার এক পুরোনো এলাকায়। ব্রিটিশ আমলের বিশাল বাড়ি। উঁচু ছাদ , লম্বা বারান্দা। আর চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।

অধ্যাপক আমাদের সরাসরি লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলেন। ঘরটা বইয়ে ভর্তি। চারদিকে হাজার হাজার বই। ঘরের এক কোণে কাঠের পুরোনো আলমারি।

সেখানেই মানচিত্রটি রাখা ছিল।

অরিন্দম আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।
কয়েক মিনিট পরে ও মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,

— রুদ্র, এটা দেখো।

আমি নিচে তাকালাম। একটা ক্ষুদ্র কালো দাগ।
যেন পোড়া কাগজের টুকরো।

অরিন্দম সেটা তুলে নিল। তারপর গন্ধ শুঁকে বলল,

— মজার ব্যাপার।

— কী?

— এটা সাধারণ কাগজ নয়।

অধ্যাপক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

— তাহলে?

— এটা কোনো পুরোনো পার্চমেন্টের অংশ,
অর্থাৎ মানচিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু।

আমি বললাম,

— চোর কি মানচিত্র ছিঁড়েছে?

— না।

আমার মনে হচ্ছে কেউ এখানে এসেছিল মানচিত্রের সত্যতা পরীক্ষা করতে।

ঘরের কোণ থেকে একজন লোক বেরিয়ে এল।
লোকটিকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। গায়ে কালো পোশাক , লম্বা গড়ন , কঠিন মুখ।

অধ্যাপক বললেন,

— ও আমার বাড়ির কেয়ারটেকার। নাম গোপাল।

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

— গতকাল রাতে কিছু দেখেছেন আপনি ?

গোপাল মাথা নাড়ল।

— না বাবু।

— কোনো অচেনা লোক ?

— না।

— কোনো শব্দও শোনেননি?

— রাত বারোটার দিকে মনে হয় বারান্দায় কারও পায়ের শব্দ শুনেছিলাম।

— তারপর?

— বাইরে বেরিয়ে কাউকে দেখিনি।

অরিন্দম কিছু বলল না।
কিন্তু আমি বুঝলাম ওর মাথায় কিছু একটা ঘুরছে।

বিকেলের দিকে আমরা বাড়ি থেকে বেরোলাম।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

— কী মনে হচ্ছে অরিন্দম দা ?

অরিন্দম বলল,

— চোর মানচিত্রের জন্যই এসেছিল। সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে কীভাবে জানল মানচিত্রটার কথা?

আমি থেমে গেলাম। সত্যিই তো। মানচিত্রটার কথা তো খুব কম মানুষই জানত। তাহলে খবরটা বাইরে গেল কীভাবে?

ঠিক তখনই অরিন্দমের ফোন বেজে উঠল। ও ফোন ধরতেই মুখের ভাব বদলে গেল।

— কী বলছেন?

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—

— আমরা এখনই আসছি।

ফোন কেটে দিয়ে ও দ্রুত হাঁটা শুরু করল।

আমি বললাম,

— কী হয়েছে?

— অধ্যাপক রায় ফোন করেছিলেন।

— কেন?

অরিন্দমের গলায় অদ্ভুত উত্তেজনা।

— তাঁর লাইব্রেরিতে আরেকটা জিনিস পাওয়া গেছে।

— কী?

— একটা চিঠি।

— চিঠি?

— হ্যাঁ।

— কে পাঠিয়েছে?

অরিন্দম নিচু গলায় বলল,

— সেটাই জানতে যাচ্ছি।

আমরা দ্রুত বাড়িতে ফিরে এলাম। অধ্যাপক রায়ের মুখ ফ্যাকাশে।

তিনি কাঁপা হাতে একটা হলদে কাগজ এগিয়ে দিলেন। কাগজে কালো কালিতে মাত্র একটি লাইন লেখা।

“মানচিত্র খুঁজবেন না। নইলে ১৮২৩ সালের ইতিহাস আবার ফিরে আসবে।”

আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।

অরিন্দম চিঠিটা হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর বলল,

— এটা আজ এসেছে?

— হ্যাঁ।

— কোথা থেকে পেলেন?

— লাইব্রেরির টেবিলের ওপর ছিলো ।

— দরজা বন্ধ ছিল?

— হ্যাঁ,ছিল।

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বন্ধ ঘরে চিঠি এল কীভাবে?

অরিন্দম জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ ওর চোখ সরু হয়ে গেল।

— রুদ্র।

— কী?

— ওদিকে দেখো।

আমি তাকালাম। রাস্তার ওপারে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কালো ছাতা হাতে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে আছে।

আমি বললাম,

— কে ও?

অরিন্দম উত্তর দিল না। হঠাৎ লোকটা ঘুরে হাঁটা শুরু করল।

অরিন্দম চিৎকার করে উঠল—

— চল তাড়াতাড়ী !

আমরা দৌড়ে নিচে নেমে এলাম। রাস্তা পার হয়ে লোকটার পিছু নিলাম। কিন্তু সে অদ্ভুত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে একটা গলিতে ঢুকল। আমরাও ঢুকলাম তার পেছনে ।

কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখি— গলি ফাঁকা , কেউ নেই।

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,

— সে গেল কোথায়?

অরিন্দম চারপাশে তাকাল। তারপর মাটির দিকে নজর দিল। সেখানে একটা ছোট ধাতব বস্তু পড়ে ছিল। ও সেটা তুলে নিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

— কী ওটা?

অরিন্দমের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

— এটা একটা প্রতীক।

— কিসের?

— আমি নিশ্চিত নই।

ধাতব চাকতির ওপর খোদাই করা ছিল একটা অদ্ভুত চিহ্ন। একটা চোখ। আর চোখের নিচে লেখা—

“ছায়া”

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ তখনও আমরা জানতাম না—

এই “ছায়া” নামটাই খুব শীঘ্রই আমাদের নিয়ে যাবে এমন এক রহস্যের মধ্যে, যার শুরু দুইশো বছর আগে হলেও শেষ এখনও হয়নি...

চলবে...




গল্পটি যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই ❤️ লাইক করুন, 💬 কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান এবং 📌 ফলো করুন যাতে পরবর্তী পর্ব মিস না করেন।

আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনই আমাকে নতুন নতুন রহস্যময় গল্প লিখতে উৎসাহ দেয়।

পরবর্তী পর্বে: "ছায়া" আসলে কে? আর ১৮২৩ সালের সেই ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সঙ্গে চুরি হওয়া মানচিত্রের সম্পর্ক কী?

ফলো করুন, সঙ্গে থাকুন, রহস্যের পর্দা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে... 🔥📖👁️‍🗨️