রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা ।
গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি আর অরিন্দম সেই ধাতব চাকতিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম । চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা । দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল ।
চাকতির ওপর খোদাই করা চোখের চিহ্নটা যেন আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে ।
আমি বললাম,
— "ছায়া" কি কোনো সংগঠন?
অরিন্দম উত্তর দিল না ।
চাকতিটা হাতের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল ,
— জানি না। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত ।
— কী ?
— মানচিত্র চুরি করা লোক আর এই "ছায়া"-র মধ্যে সম্পর্ক আছে ।
আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম ।
প্রথম দিনেই রহস্যটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল , এখন তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল লাগছে ।
পরদিন সকালে আমরা আবার অধ্যাপক অমিতাভ রায়ের বাড়িতে গেলাম । অধ্যাপক সারারাত ঘুমোতে পারেননি । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে ।
অরিন্দম তাঁকে ধাতব চাকতিটা দেখাল।চাকতিটা দেখেই অধ্যাপক হঠাৎ চমকে উঠলেন ।
— এটা কোথায় পেলেন ?
— গতকাল যে লোকটাকে অনুসরণ করছিলাম , সে ফেলে গেছে ।
অধ্যাপকের মুখ সাদা হয়ে গেল ।
— অসম্ভব!
— আপনি এটা চিনতে পেরেছেন ?
অধ্যাপক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন ,
— বহু বছর আগে একটা পুরোনো ডায়েরিতে আমি এই চিহ্ন দেখেছিলাম ।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল ।
— কীসের ডায়েরি ?
— ১৮২৩ সালের ডায়েরি ।
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
অরিন্দম বলল — বিস্তারিত বলুন। অধ্যাপক গভীর নিঃশ্বাস নিলেন।
— ব্রিটিশ আমলে নদিয়ার এক জমিদার ছিলেন রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী । অত্যন্ত ধনী এবং প্রভাবশালী মানুষ ।
— তারপর ?
— হঠাৎ এক রাতে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান ।
— নিখোঁজ ?
— হ্যাঁ। শুধু তিনিই নন । তাঁর পরিবারের আরও ছয়জন সদস্য একই রাতে উধাও হয়ে যায় ।
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম ।
— কাউকে পাওয়া যায়নি?
— না।
— এটা কীভাবে সম্ভব ?
অধ্যাপক মাথা নাড়লেন ।
— সেটাই রহস্য । পুলিশ তদন্ত করেছিল । ব্রিটিশ প্রশাসন তদন্ত করেছিল । কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি ।
অরিন্দম বলল,
— মানচিত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী ?
অধ্যাপক উত্তর দিলেন ,
— নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে রাজেন্দ্রনারায়ণ একটা মানচিত্র তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায় ।
আমার গলা শুকিয়ে গেল ।
— এটা কী সেই মানচিত্র ?
— সম্ভবত সেই মানচিত্রই ।
ঘরে নীরবতা নেমে এল ।
আমরা যেন ধীরে ধীরে দুইশো বছরের পুরোনো এক অন্ধকার রহস্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ।
অধ্যাপক আমাদের একটা পুরোনো কাঠের বাক্স দেখালেন । বাক্সের ভেতর থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি বের করলেন । পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে ।
অরিন্দম সাবধানে ডায়েরিটা খুলল । কিছুক্ষণ পড়ার পর ওর চোখ বড় হয়ে গেল ।
— রুদ্র, এটা শোনো ।
আমি এগিয়ে গেলাম।
ডায়েরির একটা অংশে লেখা—
"আজ রাতে আবার সেই চোখের চিহ্ন দেখলাম । তারা বলেছে, গোপন কক্ষের কথা কেউ জানতে পারবে না। যারা জানবে, তারা আর বাঁচবে না।"
আমার শরীর কাঁপতে শুরু করল।
— কে লিখেছে এটা ?
অধ্যাপক বললেন -
— জমিদারের ব্যক্তিগত সহকারী।
আরও কয়েকটা পাতা উল্টানো হল । হঠাৎ একটা পাতায় কালো কালি দিয়ে আঁকা সেই একই প্রতীক।
একটা চোখ।
নিচে লেখা—
"ছায়া সব দেখতে পায় ।"
আমার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না।
দুপুরের দিকে আমরা অধ্যাপকের বাড়ি থেকে বেরোলাম। ঠিক তখনই অরিন্দম থেমে গেল।
— কী হয়েছে দাদা ?
— আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।
আমি অবাক হয়ে চারপাশে তাকালাম। রাস্তা স্বাভাবিক। মানুষজন চলাফেরা করছে। কিন্তু অরিন্দমের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
— কে, কাউকে তো দেখছি না ?
— ডানদিকে যে লোকটা সংবাদপত্র পড়ছে, ওকে দেখছ?
আমি তাকালাম। দেখলাম মাঝবয়সি একজন মানুষ। খুব সাধারণ চেহারা।
— ও?
— আমরা বেরোনোর পর থেকে তিনবার জায়গা বদলেছে।
— তুমি কি নিশ্চিত যে এই ?
— শতভাগ।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। লোকটাও ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
হঠাৎ অরিন্দম একটা মোড় ঘুরে দ্রুত গলিতে ঢুকে পড়ল। আমিও তার পিছনে।
কয়েক সেকেন্ড পরে লোকটাও গলিতে ঢুকল।
আর তখনই—
অরিন্দম সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— কে আপনি ? আমাদের অনুসরণ করছেন কেন?
লোকটা থমকে গেল । তার মুখে ভয়ের ছাপ ।
— আমি... আমি... কই না তো ।
— সত্যি কথা বলুন।
লোকটা কাঁপা গলায় বলল,
— আমি কিছু জানি না।
— তাহলে অনুসরণ করছিলেন কেন?
— আমাকে বলা হয়েছে অনুসরন করতে ।
— কে বলেছে?
লোকটা চারপাশে তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
—একজন লোক যে পুরো ছায়ার মতো...
আমার শরীরের রক্ত যেন জমে গেল।
— ছায়া কে?
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই—
ধাম!
একটা বিকট শব্দ।
লোকটা হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল । আমি চিৎকার করে উঠলাম। লোকটার কাঁধ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে ।
কেউ তাকে গুলি করেছে!
অরিন্দম মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে তাকাল। দূরের একটা ছাদে যেন কারও ছায়া দেখা গেল ।
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর অদৃশ্য।
আমরা দ্রুত আহত লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার জানালেন, সে বেঁচে আছে। কিন্তু জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি বললাম,
— এখন কী হবে?
অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
— ওর জ্ঞান ফিরলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।
ঠিক তখনই একজন নার্স দৌড়ে এল।
— আপনারা কি ওই রোগীর সঙ্গে এসেছেন?
— হ্যাঁ।
— তাহলে তাড়াতাড়ি আসুন।
আমরা ছুটে গেলাম।
কেবিনে ঢুকতেই দেখি লোকটার জ্ঞান ফিরেছে।
সে আতঙ্কে কাঁপছে। আমাদের দেখেই হাত বাড়িয়ে বলল,
— ওরা আসছে...ওরা...
— কারা?
— সেই ছায়া...
— ছায়া টা কে?
লোকটার চোখ ভয়ে বড় হয়ে গেল। সে কষ্ট করে বলল,
— মানচিত্র... মানচিত্র খুঁজবেন না...
— কেন?
— কারণ... কারণ
হঠাৎ তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে নিজের গলা চেপে ধরল। ডাক্তাররা ছুটে এলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মনিটরের শব্দ বদলে গেল।
টানা একটানা আওয়াজ।
লোকটা মারা গেছে।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অরিন্দমের মুখ পাথরের মতো কঠিন।
ডাক্তার বিস্মিত গলায় বললেন,
— অদ্ভুত ঘটনা তো !
— কী?
— গুলির আঘাতে ইনি মারা যায়নি।
— তাহলে?
— শরীরে বিষ পাওয়া গেছে।
আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
বিষ? কিন্তু কখন? কীভাবে?
রাত ন'টার দিকে আমরা বাড়ি ফিরলাম। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। মাত্র দুদিনে—
একটা চুরি,
একটা হুমকির চিঠি,
একটা রহস্যময় সংগঠন,
আর একজনের মৃত্যু।
সবকিছু যেন সিনেমার মতো লাগছে। অরিন্দম নিজের ঘরে বসে ডায়েরির কপি পড়ছিল। হঠাৎ ও বলল,
— রুদ্র শোনো এখানে ।
— হ্যাঁ?
— একটা জিনিস খেয়াল করেছ?
— কী?
— ডায়েরিতে বারবার "গোপন কক্ষ" কথাটা এসেছে ।
আমি বললাম,
— হ্যাঁ।
— আর মানচিত্রটাও সম্ভবত সেই কক্ষের অবস্থান দেখাচ্ছিল।
— তাহলে চোর মানচিত্র নিয়ে সেই কক্ষ খুঁজতে গেছে?
— সম্ভব হলে হতে পারে ।
ওর কথা শেষ হতেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।
ঠক... ঠক... ঠক...
রাত তখন প্রায় দশটা। আমি দরজা খুলতে গেলাম। দরজা খুলেই থমকে দাঁড়ালাম। বাইরে কেউ নেই। ফাঁকা সিঁড়ি। শুধু মেঝেতে একটা কালো খাম পড়ে আছে।
আমি সেটা তুলে নিলাম।
ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ। কাগজে লাল কালিতে লেখা মাত্র চারটি শব্দ—
"তোমরাই পরবর্তী লক্ষ্য আমাদের ।"
আর নিচে আঁকা সেই একই প্রতীক—
👁️
-ইতি ছায়া।
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম। আর তখনই দেখলাম—
সামনের বাড়ির ছাদের ওপর একটা কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।
সে আমাদের দিকেই তাকিয়ে। পরের মুহূর্তে বিদ্যুতের ঝলকানি আকাশ চিরে গেল। আর আলো নিভতেই সেই অবয়ব অদৃশ্য হয়ে গেল...
চলবে...
---
গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক, কমেন্ট ও ফলো করুন। আপনার একটি ফলোই রহস্যের এই যাত্রাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। পরবর্তী পর্বে রহস্য আরও গভীর হবে! 🔥📖👁️