ঐশী মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ এক ছেলের সাথে জোরে ধাক্কা খেলো। ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই তার মুখ লাল হয়ে গেল রাগে। কপালে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে, আর কোমরে ব্যথা লেগে গিয়েছে। ব্যথা সামলানোর আগেই সে দাঁত চেপে ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে ঝড়ের মতো চিৎকার করল—
—“চোখে দেখে হাঁটতে পারেন না নাকি? মাঠটাকে আপনার বাপের সম্পত্তি ভেবেছেন?”
ছেলেটা মুহূর্তের জন্য একেবারে অবাক হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল, তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা বিরক্তির সুরে উত্তর দিল—
—“আরে, তুমি-ই তো ঝড়ের মতো দৌড়ে আসছিলে! আমি তো দাঁড়িয়েই ছিলাম।”
ঐশীর চোখ আরও রাগে চকচক করে উঠল। সে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দু’হাত কোমরে রেখে গম্ভীর গলায় বলল—
—“আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন মানেই আমি পড়ে যাবো? দাঁড়ানোরও একটা জায়গা আছে, বুঝেছেন?”
চারপাশের বাতাসে যেন অদ্ভুত টান তৈরি হলো। ছেলেটার ঠোঁটে তখন অদ্ভুত এক মুচকি হাসি খেলে গেল। যেন রাগান্বিত ঐশীর গালাগালিও তার কাছে মজার লাগছে।
সে মাথা একটু কাত করে শান্ত গলায় বলল—
—“তোমার রাগ দেখলে মনে হয়, আকাশে বজ্রপাত হচ্ছে। তবে শুনে রাখো, আমি সত্যিই কোনো দোষ করিনি।”
ঐশী ঠোঁট ফুলিয়ে জবাব দিল—
—“দোষ করেন আর নাই করেন, আমার পড়ে যাওয়ার কারণ এক মাএ আপনিই। আর আমার কোমরটা তো ভেঙে যাচ্ছে।”
ছেলেটা এবার ভুরু কুঁচকে তাকাল, তবে চোখে একটুখানি উদ্বেগও দেখা গেল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বলল—
—“উঠতে কষ্ট হচ্ছে নাকি? দাও, আমি ধরছি।”
ঐশী তার হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল—
—“না দরকার নেই! আমি নিজেই উঠতে পারব।”
কিন্তু ওঠার সময় ব্যথায় মুখটা কুঁকড়ে গেল। ছেলেটা সেটা খেয়াল করল, আর হালকা হেসে বলল—
—“দেখলে? এত বড় বড় কথা বলো, অথচ ব্যথা লুকাতেও পারছো না।”
ঐশী দাঁত চেপে এক দম এগিয়ে গেল। লাইবা, রাইশা আর নৌরিন এসে ঐশী কে তুলে দাঁড় করালো।রাগে একবার কটমট করে তাকিয়ে বলল।
—“আর কখনো যদি সামনে এসেছেন, সাবধান!”
ছেলেটা মাঠে দাঁড়িয়েই থেকে গেল। ঠোঁটে মজা মেশানো হাসি, চোখে অদ্ভুত কৌতূহল। মনে মনে বলল—
“মেয়েটার রাগ যতই বেশি হোক, ওকে আবার খুঁজে বের করতেই হবে, এই ঝড়ের মতো মেয়ে সাথে আমার মেলানোর চেষ্টা,ঝগড়া করে করে দিন পাড় হয়ে যাবে, ইন্টারেস্টিং, ওহ হ্যাঁ চিঠি তা টো দেওয়া হলো না"
ছেলেটি ঐশী দের পিছু নেওয়া শুরু করে।
“এই যে, শুনছো… তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।”
ঐশীর চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে বিরক্ত হয়ে পিছন ঘুরতেই—ঠোঁটের কোণে উচ্চারিত হতে চলেছে “চ” শব্দটা। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ একটা খাম তার দিকে এগিয়ে আসে।
ঐশী থমকে দাঁড়ায়। ভ্রু কুঁচকে খামের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে উপরে গিয়ে ছেলেটির মুখের দিকে থেমে যায় তার দৃষ্টি। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই—ছেলেটা আচমকা খামটা তার হাতে গুঁজে দেয়। কোনো কথা না বলে, একটুও দেরি না করে, দ্রুত পেছন ঘুরে দৌড়ে সরে যায়।
সবকিছু এত হঠাৎ ঘটে যায় যে ঐশী আর তার বন্ধুরা স্তব্ধ হয়ে যায়। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল অবাক দৃষ্টিতে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা।
এটা বেশ রহস্যময় একটা মুহূর্ত হয়েছে।
ঐশীর বন্ধুরা অবাক হলেও ঐশীর মনে কিন্তু সন্দেহের ঝড় শুরু হবে—
কে এই ছেলে?
খামের ভেতরে কী আছে?
কেন কিছু না বলে দৌড় দিল?
এটা কি কোনো প্রেমপত্র, নাকি অন্য কিছু গোপন বার্তা?
ঐশীর ভ্রূ কুঁচকানো আর খামটা শক্ত করে ধরা—তার রাগ, অবাক হওয়া আর সন্দেহ মেশানো অনুভূতির মিলন ঘটাচ্ছে।
_ _ _ _
বিশাল বড় ইউনিভার্সিটির ঝকঝকে ফোয়ারা সামনে। সকাল নেমে এসেছে। ফোয়ারার পানি ঝরছে টুপটাপ করে, চারপাশে হালকা বাতাস। তিন বন্ধু—রাশিক, সাদ্দিক আর আহাদ—বেঞ্চে বসে আছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন দেশ বাঁচানোর প্ল্যান করছে।
রাশিক (চোখ সঙ্কুচিত করে, গম্ভীর স্বরে)
“দোস্তরা, আমি ভীষণ টেনশনে আছি। রাইশাকে প্রপোজ করব ভাবছি, কিন্তু ভয় হচ্ছে—যদি বলে, ‘আপনাকে তো শুধু আমার ভাইয়ের মতো লাগে’? তখন আমি সরাসরি ফোয়ারায় ঝাঁপ দেব।”
আহাদ:হাসি চেপে রাশিক কে উদ্দেশ্যে করে উত্তর দিল
“আরে ভাই, ভাই বানিয়ে দিলেও খুশি হওয়া উচিত। অন্তত ফ্রি খাবারের আশা থাকবে, বোনের বিয়েতে।”
রাশিক:রাগী চোখ দেখিয়ে বল্ল
“চুপ কর! ও আমার চাচাতো বন,তুই আবার নোটস দিয়ে ওকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছিস না তো? সন্দেহ হচ্ছে ভীষণ!”
আহাদ (নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত তুলে):
“আমি নির্দোষ! আমি তো শুধু মিঙ্গেল হওয়ার প্ল্যান বানাচ্ছি। তবে সত্যি কথা বলতে… মাঝে মাঝে রাইশা যখন হেসে আমার দিকে তাকায়, তখন মনে হয়… হয়তো—”
রাশিক (চিৎকার করে):
“দেখেছিস! দেখেছিস! আমার সন্দেহ সত্যি ছিল!”
সাদ্দিক (দীর্ঘশ্বাস ফেলে):
“তোদের প্রেমের কাহিনি বাদ দে, আমার দুঃখ আরও গভীর। মাইশার বাড়ির লোকেরা যদি ভাবে আমি সিরিয়াস না, তখন কী হবে? আমি তো টেনশনে মরছি।”
আহাদ (খিলখিল করে হেসে):
“ওরা তোকে পরীক্ষা নেবে—‘আপনি দিনে কতবার সিরিয়াস হন?’ উত্তর না মিললেই রিজেক্ট।”
সাদ্দিক (চোখ পাকিয়ে):
“তুই হাসিস? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে মাইশার বাড়ির লোকেরা হয়তো অন্য কারো সাথে ওর বিয়ে ঠিক করছে।”
রাশিক (ঠাট্টা করে):
“তুই চিন্তা করিস না, তখন ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে ‘মাইশা, আমি তোমার বজ্রপাত!’ বলে চেঁচাবি।”
সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করে।
আহাদ (হঠাৎ সিরিয়াস মুখে):
“আমার কথা তোদের বলি, আমার সন্দেহ হচ্ছে আমি কখনো মিঙ্গেল হবই না। মেয়েরা আমাকে দেখে ভাবে—‘এই ছেলে ফোয়ারার পানির মতো, শুধু ছিটিয়ে যায়, কারো হাতে ধরা দেয় না।’”
রাশিক (খিলখিল করে):
“তোর প্রেম শুরু হবে গালি দিয়ে। কোনো মেয়ে গায়ে পানি পড়লে তোকে ধমক দেবে, আর তুই ভাববি—‘এই তো আমার লাভ স্টোরি!’”
সাদ্দিক (মাথা নেড়ে):
“আমারও মনে হয় তাই। আহাদ প্রেম করবে মার খেয়ে।”
তিনজন আবার একসাথে হো হো করে হেসে ওঠে। ফোয়ারার আলো ঝিকমিক করে পানির ফোঁটার সাথে তাদের সন্দেহগুলো উড়ে যায়, কিন্তু মনের ভেতরে প্রত্যেকে গোপনে ভাবে—
“হয়তো আমারটাই সত্যি হবে। হয়তো প্রেম আসলেই একদিন ফোয়ারার পানির মতো হঠাৎ ছিটকে পড়বে।”
সকালের হালকা শীতল হাওয়া ইউনিভার্সিটির ফোয়ারার চারপাশে মৃদু শব্দে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফোয়ারার জলরাশি রোদের আলোয় চিকচিক করে ঝিকিমিকি করছে, চারপাশের পুরোনো গাছগুলো যেন সেই আলোতে রুপালি আবরণে মোড়া। ক্লাস শুরু হওয়ার আগের সেই ফাঁকা সময়টাতে চারদিক বেশ শান্ত—মাঝে মাঝে দু-একটা পাখির ডাক আর বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দই কেবল শোনা যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দূর থেকে শোনা গেল গর্জন তোলা এক বাইকের শব্দ। শব্দটা প্রথমে খুব ক্ষীণ ছিল, কিন্তু মুহূর্তে যেন সব নীরবতাকে ভেঙে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। রাশিক, আহাদ আর সাদ্দিক একসাথে ঘুরে তাকাল। রাস্তার বাঁক ঘুরে কালো রঙের বাইকটি চোখে পড়ল। হেলমেটের নিচে মুখটা দেখা যাচ্ছিল না, তবুও শব্দ আর ভঙ্গিতে যেন এক অদ্ভুত পরিচিতি লুকিয়ে আছে।
বাইকটি ফোয়ারার কাছে এসে ধীরে ধীরে থামল, টায়ারের নিচে ছোট পাথর ঘষে উঠল এক মৃদু শব্দ। তিনজনের চোখে তখনও কৌতূহল আর অচেনা উত্তেজনা। বাইকওয়ালা একটুখানি মাথা ঝাঁকিয়ে হেলমেটের স্ট্র্যাপ খুলল। মুহূর্তেই কালো হেলমেট সরিয়ে যখন মুখটা বেরিয়ে এলো, রোদে ঝলমল করে উঠল চেনা সেই মুখ—যেন পুরনো দিনের ছবি হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এসেছে।
রাশিকের ঠোঁটের কোণে ধরা দিল নিঃশব্দ এক হাসি, আহাদ আর সাদ্দিকও বিস্ময় আর আনন্দে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। তিনজনের মুখে তখন একইরকম খুশির ঢেউ, যেন অগণিত স্মৃতি একসাথে ভেসে উঠল। রাশিক আর অপেক্ষা করতে পারল না—দ্রুত পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেল ছেলেটির দিকে। চারপাশের সকাল, ফোয়ারার স্রোত আর ঝলমলে রোদ যেন সেই পুনর্মিলনের সাক্ষী হয়ে নীরব দাঁড়িয়ে রইল।
Happy Reading ☺
To be continue😅