Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মন_তোকে_দিলাম - 4

শনিবার,,,,,,,,,,,,,,,,,,, 

22/04/2019,,,,,,,,,,, 



উপরে থেকে নিচে নেমে যাওয়া সরু সিঁড়িটা যেন অন্ধকারের পেটের ভেতরে ঢুকে গেছে। কাঠের ধাপগুলো পুরোনো আর ভাঙাচোরা, কোথাও কোথাও ফাটল ধরেছে। প্রতিটা ধাপে পা রাখলেই “কড়রর…” করে বিকট শব্দ উঠছে, যেন বহু বছর পর কেউ এই পথে নামছে। সিঁড়ির দুই পাশের দেয়াল ভেজা আর স্যাঁতসেঁতে, হাত ছোঁয়ালেই ঠান্ডা পানি আর শ্যাওলার পিচ্ছিল অনুভূতি লেগে থাকে। ওপরে থেকে আসা ক্ষীণ আলো কয়েক ধাপ পর্যন্ত পৌঁছায়, তারপরই সবকিছু ঘন কালো অন্ধকারে ডুবে যায়।

নিচের দিকে তাকালে শুধু অন্ধকার দেখা যায়, এতটাই গভীর যে মনে হয় সিঁড়িটার শেষই নেই। কোথাও থেকে ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, আর সেই বাতাসে মিশে আছে পচা গন্ধ—পুরোনো কাঠ, মরিচা ধরা লোহা আর বহুদিনের বন্ধ ঘরের দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ। সিঁড়ির কোণায় কোণায় মাকড়সার জাল ঝুলছে, কিছু জাল এত বড় যেন বহু বছর ধরে কেউ এখানে আসেনি।

নিচে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে। পুরো বেসমেন্টটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু মাথার ওপরে ঝুলে থাকা একটা পুরোনো বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে। আলোটা স্থির নয়—একবার জ্বলে ওঠে, আবার নিভে যায়। আর যখন নিভে যায়, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো জায়গাটা এমন অন্ধকারে ডুবে যায় যেখানে নিজের হাতটাও দেখা যায় না।

দেয়ালজুড়ে কালচে ছোপ, কোথাও কোথাও রক্তের মতো লাল দাগ শুকিয়ে আছে। মেঝেটা ঠান্ডা আর ভেজা, টুপ… টুপ… করে কোথাও থেকে পানি পড়ার শব্দ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেই শব্দের মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই মনে হয় কেউ খুব ধীরে শ্বাস নিচ্ছে।

এক কোণে মরিচা ধরা লোহার চেইন ঝুলছে, বাতাস না থাকা সত্ত্বেও সেগুলো আস্তে আস্তে দুলছে। আরেক পাশে ছেঁড়া কাপড়ে ঢাকা কিছু পুরোনো বাক্স পড়ে আছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—সেগুলোর একটার ওপর যেন একটু আগেই কেউ হাত বুলিয়েছে, কারণ ধুলোর ওপর স্পষ্ট আঙুলের দাগ দেখা যাচ্ছে।

বেসমেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা হলো এর নীরবতা। এমন এক নীরবতা, যেখানে নিজের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যায়। আর সেই নীরবতার মাঝেই হঠাৎ করে উপরের সিঁড়ি থেকে “ঠক… ঠক…” শব্দ ভেসে আসে। যেন কেউ ধীরে ধীরে নিচে নামছে। অথচ ওপরে তো কেউ থাকার কথা নয়…

অন্ধকার বেসমেন্টটার একদম মাঝখানে রাখা আছে একটা পুরোনো, শক্ত কাঠের চেয়ার। চেয়ারটার কাঠে সময়ের দাগ স্পষ্ট—কোথাও ফাটল, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া কালচে রক্তের মতো ছোপ। সেই চেয়ারের সাথেই শক্ত মোটা রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে সিফানকে।

তার দুই হাত চেয়ারের হাতলের পেছনে এমন শক্ত করে বাঁধা যে রশির চাপে কবজির চারপাশ লালচে হয়ে উঠেছে। পায়ের গোড়ালিও চেয়ারের নিচের অংশে শক্ত করে বাঁধা, সামান্য নড়ারও উপায় নেই। যতবার সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, ততবার রশিগুলো আরও গভীরভাবে তার চামড়ায় ছিড়ে বসে যাচ্ছে।

সিফানের মাথাটা সামান্য নিচু, এলোমেলো চুল কপালের ওপর ঝুলে আছে। কপালের একপাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, আর ঠোঁটের কোণে জমে আছে লালচে ছোপ। তার দ্রুত শ্বাস নেওয়ার শব্দ ঠান্ডা, নীরব বেসমেন্টে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

মাথার ওপরে ঝুলে থাকা টিমটিমে হলুদ বাল্বটা বারবার জ্বলে নিভছে। আলো জ্বললেই সিফানের আতঙ্কে বড় হয়ে যাওয়া চোখ দেখা যায়, আর আলো নিভে গেলেই সে আবার অন্ধকারে হারিয়ে যায়। সেই কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকারে মনে হয় যেন তার চারপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে… খুব কাছে।

দূরে কোথাও থেকে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে—টুপ… টুপ… টুপ…। আর তার মাঝেই ধীরে ধীরে শোনা যায় ভারী জুতোর আওয়াজ। “ঠক… ঠক… ঠক…”

শব্দটা ক্রমশ কাছে আসছে। সিফান মাথা তুলে তাকানোর চেষ্টা করতেই বাল্বটা হঠাৎ দপ করে নিভে যায়। পুরো বেসমেন্ট অন্ধকারে ডুবে যায়। সিফান আতঙ্কে জড়ো সরো হয়ে যায়। 

সিফানের মনে হলো ঠিক তার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ঠান্ডা নিশ্বাস যেন তার মুখে এসে লাগছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও দ্রুত হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে মাথাটা ওপরে তুলতেই হঠাৎ—
“টিক!”

চারিদিকের সব আলো একসাথে জ্বলে উঠলো।এক মুহূর্তের জন্য তীব্র আলোয় সিফানের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকিয়ে রইলো।

এই কি সেই ভয়ংকর, অন্ধকার বেসমেন্ট?

অন্ধকারে যেটাকে মৃত আর অভিশপ্ত মনে হচ্ছিল, আলো 
জ্বালতেই সেটাই যেন অন্য এক জগতে বদলে গেছে। পুরো বেসমেন্টটা অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজানো। উপরের ছাদ থেকে ঝুলছে নরম হলুদ আর সাদা আলো, যেগুলো পুরো জায়গাটাকে উষ্ণ একটা আবহ দিচ্ছে। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগগুলো এখন আর ভয়ংকর লাগছে না; বরং পুরোনো ইটের ডিজাইনের সাথে মিলিয়ে জায়গাটাকে রহস্যময় সুন্দর দেখাচ্ছে।

মেঝেটা চকচকে কালো মার্বেলের, যেখানে আলোগুলোর প্রতিফলন পড়ে পুরো ঘরটাকে আরও বড় মনে হচ্ছে। 

একপাশে বড় বড় বুকশেলফ সাজানো, সেখানে সারি সারি পুরোনো বই রাখা। অন্য পাশে রাখা মেরুণ রঙের নরম সোফা আর কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপরে ছোট্ট কাঁচের ফুলদানিতে সাদা গোলাপ রাখা আছে।

দূরের দেয়ালে ঝুলছে বিশাল একটা ঘড়ি, যার টিক… টিক… শব্দ পুরো বেসমেন্টে ছড়িয়ে পড়ছে। কয়েকটা দামি পেইন্টিংও ঝুলছে দেয়ালে, আর কোণার দিকে রাখা ল্যাম্পের নরম আলো জায়গাটাকে আরও অভিজাত করে তুলেছে।

সিফান অবাক চোখে চারপাশ দেখতে থাকে। তার মনে হচ্ছিল যেন কোনো ধনী মানুষের গোপন লাউঞ্জে এসে পড়েছে, বেসমেন্টে নয়। কিছুক্ষণ আগেও যে জায়গাটা তাকে আতঙ্কে জমিয়ে দিচ্ছিল, এখন সেটাই অদ্ভুতভাবে শান্ত আর সুন্দর লাগছে।

কিন্তু একটা জিনিস তার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা কমতে দিল না।

এত সুন্দর একটা জায়গায়… তাকে কেন রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে?

সিফান চারদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ থেমে গেল। সামনে, অল্প দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি  পরা মানুষটার দিকে তার চোখ আটকে গেল। লোকটা ধীরে ধীরে হাসছিল… যেন অনেকক্ষণ ধরেই সিফানের জেগে ওঠার অপেক্ষা করছিল।

Happy reading☺
To be continue😅