Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মন_তোকে_দিলাম - 6

শনিবার,,,,,,,,,,,,,,,,, 

22/04/2019,,,,,,,, 


জেহেফিলের হাতে থাকা সিগারেটটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও সে সেটাকে আঙুলের ফাঁকে ধরে রেখেছে, যেন নিজের অজান্তেই। বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঝড়ো বাতাস বারবার তার এলোমেলো চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কপালের উপর এসে পড়া চুলগুলো সরানোরও প্রয়োজন বোধ করছে না সে।


আজকের রাতটা অদ্ভুত সুন্দর। আকাশের মাঝখানে গোলাকার চাঁদটা রূপার থালার মতো ঝুলে আছে। তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছে, যেন আকাশজুড়ে কেউ হীরের কণা ছড়িয়ে দিয়েছে।


মাথা উঁচু করে চাঁদের দিকে তাকাল সে। জ্যোৎস্নার আলো তার চোখে এসে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই, কোনো কষ্ট নেই। কিন্তু পরের মুহূর্তেই বাস্তবতা তাকে আবার গ্রাস করল।কীসের এত দুঃখ। সে তো হৃদয় হীন কোনো দিন ও তো মৃত্যু কে ভয় পাইনি তাহলে আজ কেন হয়। 


ঝড়ো হাওয়ায় তার পাঞ্জাবি উড়ে উঠল। এলোমেলো চুলগুলো আরও বিশৃঙ্খল হয়ে গেল। অথচ সে স্থির। একদম পাথরের মূর্তির মতো স্থির।


ফোন বের করেই প্রতিদিনের অভ্যাসের মতো আজও সেই মেয়েটার ছবি দেখতে শুরু করল জেহেফিল। গ্যালারিতে থাকা শত শত ছবির মাঝেও তার আঙুল গিয়ে থামল এক নির্দিষ্ট ছবিতে।


স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই মেয়েটার হাসিমাখা মুখটা যেন মুহূর্তের মধ্যেই তার চারপাশের সমস্ত অন্ধকার দূর করে দিল। চাঁদের আলোয় ভেজা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেও জেহেফিলের মনে হলো, তার হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনটাই যেন সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে।


ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। কতবার যে এই ছবিটা দেখেছে, তার হিসাব নেই। তবুও প্রতিবারই মনে হয়, যেন নতুন করে দেখছে। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা সরলতা আর চুলের এলোমেলো গোছাগুলো তার হৃদয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম দেয়।


অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও পাথরের মতো কঠিন ছিল, সেই মানুষটার চোখে এখন অন্যরকম কোমলতা।


ঝড়ো বাতাসে তার চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে গেল। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার। সমস্ত মনোযোগ জুড়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা সেই মুখটা।


পৃথিবীর কাছে সে হয়তো ভয়ংকর, নির্মম কিংবা অনুভূতিহীন। কিন্তু এই একটি মেয়ের সামনে এলেই তার সমস্ত কঠোরতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ, কষ্ট আর অস্থিরতা কিছুক্ষণের জন্য হলেও শান্ত হয়ে আসে।


জেহেফিল ধীরে ধীরে ছবিটার উপর আঙুল বুলিয়ে দিল। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে করে বলল—

"তুমি কোনো দিন ও জানতে পারবে না যে, আমার প্রতিটা দিন তোমার মুখ দেখেই শুরু হয়... আর শেষও হয় তোমার মুখ দেখেই।" 


জেহেফিলের চোখ ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেয়েটার চোখে আটকে যায়। যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ হঠাৎ করেই থেমে গেছে। চারপাশে কী হচ্ছে, কে আসছে, কে যাচ্ছে—কিছুই আর তার কানে পৌঁছায় না। সেই গভীর, মায়াবী চোখ দুটো তাকে প্রতিবারের মতো আজও নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে।


জেহেফিল ধীরে ধীরে স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,

"ধ্বংস যদি এত সুন্দর হয়, তবে তোমার চোখের প্রেমে পড়াটা আমার সবচেয়ে সুন্দর ধ্বংস।"


তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে ছিল ভালোবাসা, মুগ্ধতা আর একরাশ উন্মাদনা।


ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আহাদ বিরক্ত হয়ে বলল,

"ভাই!"


কোনো সাড়া নেই।

আহাদ আবার ডাকল,

"ভাই...!"


তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।তৃতীয়বার ডাকার পরও যখন জেহেফিলের কোনো হুঁশ ফিরল না, তখন আহাদ বিরক্ত হয়ে মাথা চুলকে বলল,

"ভাই, সিফানকে যে আজকে মেরে দিলেন! কালকে তো ওনার বিয়ে ঠিক করেছে । এই রকম চললে তো কাল আপনার বিয়েই হবে না"


"বিয়ে হবে না" কথাটা কানে যেতেই যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল জেহেফিলের শরীরে।


সে তড়িঘড়ি করে মাথা তুলে আহাদের দিকে তাকাল।সেই দৃষ্টি দেখে আহাদের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। শুকনো ঢোক গিলে সে এক পা পিছিয়ে গেল।মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

"আমি কি কিছু ভুল বললাম? এমন করে তাকিয়ে আছে কেন? যেন আমি ওনার হট প্রেমিকাকে, আমি তো ভুল কিছু বলিনি ! হায় আল্লাহ, আজকে আবার কোন বিপদে পড়লাম!"


আহাদের মুখের অদ্ভুত ভাব দেখে জেহেফিল চোখ সরিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে চোখে ভালোবাসার ছাপ ছিল, এখন সেখানে শুধু শীতলতা।


মেয়েটার ছবির দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে দিল সে।তারপর ধীরে ধীরে আহাদের সামনে এসে দাঁড়ালো।


চারপাশে রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। জেহেফিলের মুখে কোনো অনুভূতি নেই। যেন একজন মানুষের মৃত্যু তার কাছে প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা।


কণ্ঠ কঠোর করে সে বলল,

"লাশটা শেখ বাড়িতে রেখে দিয়ে আসবি"

আহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।


জেহেফিল আবার বলল,

"সিফানের নিজের রুমে শুইয়ে দিবি। ওরা তো কাল বিকেলে আসবে। তুই সন্ধ্যার আগেই লোক দের দিয়ে কাজটা শেষ করে ফেলবি"


"জি ভাই"


"আর শোন..."


জেহেফিলের কণ্ঠ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।

"ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ বাড়িতে যাবে না। কেউ কিছু দেখবে না, কেউ কিছু জানবে না। যদি একটা ভুলও হয়, তাহলে তার দায় তোর"

আহাদ দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।


জেহেফিল দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। আহাদ ভেবেছিল এবার বুঝি রক্ষা! লোকটা চলে যাচ্ছে।


সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পিঠ বাঁকা করতেই

"আহাদ!"


জেহেফিলের কণ্ঠ ভেসে আসতেই আহাদ এমনভাবে পিঠ সোজা করল, যেন স্কুলের হেডস্যার হাতেনাতে ধরে ফেলেছে।

জেহেফিল পিছনে না ফিরেই বলল,

"আর হ্যাঁ, ক্যামেরাগুলো হ্যাক করে নিবি। যেন কেউ কিছু দেখতে না পায়"


"হ্যাঁ ভাই, এই সব কমন জ্ঞান আমার আছে" আহাদ অতি উল্লাসে বলে"


"নাহ,সে আমি জানি।ফাস্ট টাইম তো এই সব কিছু করছিস, তাই মনে করিয়ে দিলাম"


আহাদের মুখ কুঁচকে গেল।

ভাই, এমনভাবে বলছেন যেন আমি জীবনে কোনো কাজই করিনি!


"করেছিস তো"


"তাহলে?"


"গত মাসে একটা সহজ কাজ দিয়েছিলাম"


"কোনটা?"


"তোকে আব্বুর গাড়ির ট্র্যাকার খুলে ফেলতে বলেছিলাম"


"হ্যাঁ, খুলেছিলাম তো!"


"ট্র্যাকার না খুলে পুরো বাম্পার খুলে নিয়ে এসেছিলি"


পাশের দু'জন লোক মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।


আহাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,

"ভুল তথ্য! ট্র্যাকারটা বাম্পারের ভেতরে ছিল। আমি শুধু একটু বেশি উৎসাহ দেখিয়েছিলাম"


"তোর ওই 'একটু বেশি উৎসাহ'-এর জন্য তিন ঘণ্টা ধরে মেকানিক খুঁজতে হয়েছিল"


"ভাই, বড় মানুষেরা ছোটখাটো ভুল ধরেন না"


"ঠিক বলেছিস। কিন্তু তোর ভুলগুলো ছোটখাটো না, ঐতিহাসিক"


আহাদ বুকের ওপর হাত রেখে নাটকীয় গলায় বলল,

"আপনি আমাকে সম্মান করেন না ভাই"


"করিই তো। না করলে এত বড় দায়িত্ব দিতাম?"


আহাদের চোখ চকচক করে উঠল।

"সত্যি?"


"হ্যাঁ। কারণ তোর মতো ভুল আর কেউ এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে করতে পারে না"


আহাদ হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে রইল, আর জেহেফিল ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বেরিয়ে গেল। 


Happy Reading ☺

To Be Continue 😅