পরাণ বঁধুয়া
পর্ব - ১১
নিজের ঘরে দুহাতের মধ্যে মাথা রেখে পড়ার টেবিলের সামনে বসে ছিল বুবুন। কত রাত কে জানে। হাতঘড়িটা খাটের পাশের টেবিলে হলেও সামনের দেওয়ালে ঘড়ি আছে। এই টেবিলে ওর মোবাইল। মুখ তুলে দেখার কথাও মনে নেই। ছোটবেলায় দেখা বাবলিপিসিকে মনে আছে। পরে আরও আলোচনা হত বলে হয়তো বেশি করে মনে আছে।
খুব ভালবাসত ওদের। দিল্লি থেকে এলে মামনিরা চারজন ওদের ছোটদের ঘুরতে নিয়ে যেত, যা যা কেনা আর খাওয়া বারণ ছিল, আইসক্রিম, চকলেট, প্যাস্ট্রি, সব কিনে দিত। জামাকাপড় তো নিয়েই আসত। ওরা দুভাই সিনেমা দেখেছে, যতকাল পিসিরা দেখিয়েছে।
ছোট রুমুর চেহারাটা মনে নেই। দৌড়োদৌড়ি করত, ছিঁচকাঁদুনে ছিল মনে আছে। সবাই, বিশেষ করে মামনি বেদম আহ্লাদ দিত। যখন তখন কোলে নিয়ে বসে থাকত। তখন কি একটু হিংসে হত? বুবুনের মনে হয়, হত। তাছাড়া তখন সদ্য কৈশোর, কে ঐ পুঁচকে মেয়েদের খবর রাখে? পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে এখানে ওখানে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে চলে যেত ও আর রাঙাদা। বাড়ি এসে দেখত, তুলি মিলির সঙ্গে পুতুলের বিয়ে নিয়ে ঝগড়া করে রুমু কাঁদছে। সারা বাড়ি ওকে ভোলাচ্ছে।
রুমু মানে ওর মনে সেই ছবিটাই ছিল, আছে। তার উপর এই বড় রুমুও বোধহয় খুব বড় হয়নি। তাই ছোট একটা মেয়ে হিসেবে সেদিন ওকে নোটিশই করেনি। নিচের লিভিং রুমে ছিল কতক্ষণ? মেয়েদের সঙ্গে কেনাকাটা দেখতে চলে গেল। বাবলিপিসি ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলল বরং। সেই বাবলিপিসির এই জীবনটাতেও তেল ফুরিয়ে আসছে, সেদিন বুঝতেই পারে নি।
কি অবস্থায় লড়াইয়ের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। নতুন পিসোকে দেখিয়ে দিতেই বোধহয় দাদা বৌদির সঙ্গেও থাকেনি। নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ নিজে নিয়ে লোকটাকে জবাব দিয়েছে। অবশ্য মামনি আর পিসো এই ব্যবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছে।রুমুর সঙ্গে দূরত্ব ওরা মানতে পারেনি। তবে বাবলিপিসির মনোভাবকে সন্মান জানিয়েছে। তার পরও তার নামে পরোয়ানা?
আর রুমু? আবার ছোটবেলার ছিঁচকাঁদুনে রুমুকে মনে পড়ে। কে জানে কি করে নতুন পিসোর চলে যাওয়াটা অত ছোটবেলায় রুমুকে সহ্য করতে শিখিয়েছিল বাবলিপিসি। বুবুন তো ভাবতেই পারে না, বাবাকে ছাড়া, বা আরও সত্যি কথা বলতে গেলে, বাবার কি হয়েছে সেটাও মুখে আনা যাবে না, এমন জীবন হতে পারে। এতগুলো বছর রুমু সেই জীবনটা কাটাচ্ছে।
বড্ড মায়া হয় বুবুনের। ও সায়েন্টিস্ট, যদি ম্যাজিশিয়ান হত, গিলি গিলি গে বলে রুমুকে আবার ছোটবেলায় নিয়ে যেত। ওর বাবার ঘটনাটা মুছে দিত। রুমুকে ওর ভালবাসার চারজন মানুষের হাত ধরে বড় হওয়ার সুযোগ পাইয়ে দিত।
একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে ডঃ অনীশ মুখার্জীর। ম্যাজিক তো সত্যিই হয় না। চারজনের একজন হাত ছেড়ে দিয়েছে কবেই। তাই বাকি দুজনের কাছ থেকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে রুমুকে। আর একটা মাত্র আশ্রয় মা ও এবার......
অবশ্য মামনি আর পিসো রুমুকে ভেসে যেতে দেবে না। যেমন নতুন পিসোর জায়গাটা রুমুর জীবনে ফাঁকা থাকলেও, বাবলিপিসি নিশ্চয়ই ওকে নিজের সবটুকু দিয়েছে। এরাও বাবলিপিসি না হয়ে উঠতে পারলেও রুমুর দুহাত ধরে রাখবে। ওর নিজের বাড়ির লোকেরাও তো রুমুকে এত ভালবেসেছে। তারা নিশ্চয়ই রুমুর জীবনে সেরকম দিন এলে পাশে দাঁড়াবে। রুমু লেখাপড়া কন্টিনিউ করবে। চাকরি বাকরি পেলে পরে ওর উপযুক্ত বয়সে ভাল বিয়ে দেওয়া যাবে তখন।
চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বুবুন। রুমুর কোথায় বিয়ে হবে কে জানে? মামনির সঙ্গেই বা কতবার দেখা করার সুযোগ থাকবে আর ওর বাড়ির লোকেরাই বা কতটা কাছাকাছি থাকতে পারবে তখন মেয়েটার? কেমন হবে শ্বশুর বাড়ির লোকগুলো? আর রুমুর বরই বা কেমন হবে? বুবুন নিজেই যদি ভাল করে খোঁজখবর নিয়ে দেখে, তাও কি ফুলপ্রুফ হবে? পিসো আর রুমুর বাবা নতুন পিসো তো বন্ধু ছিল। রুমুর বর যদি পরে সেরকম বেরোয়? বা অন্যরকম কিছু খারাপ হয়? রুমুকে যদি লেখাপড়া, চাকরি বাকরি করতে না দেয়?
ওর নিজের আন্ডারে পি এইচ ডি করছিল একটা মেয়ে, বুবুন তখন সবে সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হয়েছে। সে মেয়ের বিয়ে ঠিক হল। পড়াশোনা করবে কথা হয়ে গেছে। বিয়ের পর ওর ইঞ্জিনিয়ার বর বলে দিল, তার মায়ের ইচ্ছে নেই।
উঠে পড়ে বুবুন। বিছানার পাশের টেবিল থেকে জল নিয়ে খায়। ঘড়ি দেখে। রাত দুটো পঞ্চাশ। পায়চারি করতে করতে ভাবে, রুমুর বিয়ে হয়ে গেলে মামনি আর পিসোরই ওর উপর অধিকার কমে যাবে। সেখানে ওর বাড়ির লোকগুলো তো কেউ না, অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীয়।
চলবে