Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পরাণ বঁধুয়া - 12

পরাণ বঁধুয়া

পর্ব - ১২

পড়ার টেবিলের কাছে এসে টেবিলটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বুবুন। রাত ভোর হয়ে আসছে। খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া এসে সরাসরি ওর গায়ে লাগছে। শিরশিরে একটা অনুভূতি, শীত করছে ওর। ঠান্ডা হাওয়া লেগে নাকি মনের কোণায় একটা ভয় আছে বলে? 

জানালার সামনে এসে দাঁড়ায় বুবুন। বাবলিপিসি বা ওর বাড়ির লোকেরা কেন এই বিয়েটা চায় ও বুঝতে পেরেছে। রুমুকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করতে পারেনি বটে, তবে নিজের মনে ও জানে, নিজের কাছেও কখনো নিজের বিয়ে নিয়ে আলাদা করে ভাবেনি। তবুও কি কোনো ছবি আছে ওর মনের গোপনে? কেমন হলে ওর পছন্দ হবে নিজের স্ত্রীকে? 

কেমন আবার? মায়ের মতো, মেজমা, ছোটমা, বৌমণির মতো। লেখাপড়া জানবে, চাকরি করলে করবে, সবচেয়ে বড় কথা, সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে। রুমু কি এই ছবিটায় ফিট করে? সবাই তো বলছে, করে। 

শিরশিরে হাওয়ায় ওর রাতজাগা চোখ জুড়িয়ে আসছে। ভোরের আকাশে ছাই কমছে, লাল আর হলুদ ছড়িয়ে যাচ্ছে সেখানে। সোনালী কমলা আলো নেমে আসছে আকাশ থেকে। টুপটাপ করে ঝরছে গাছের পাতায় জমা জলের ফোঁটা। একটা একটা করে পাখি জেগে উঠে শিস দিচ্ছে। 

এতো রঙ, আলো, পাখি, সব আয়োজন তো রোজ থাকে। দেখার লোক থাকে কি? আর যখন প্রকৃতির এই অনন্য বিস্তৃত সৌন্দর্যের সামনে এইরকম হঠাৎ এসে দাঁড়ায় মানুষ, সেখানে বোধহয় এভাবেই নিজের মনের দ্বন্দ্বকে বড্ডো ছোটো মনে হয়। শুধু থেকে যায় কল্পনার মধুরতাটুকু। 

সায়েন্টিস্ট ডঃ অনীশ মুখার্জীর মন আজ সেই কল্পনা দখল করে নিয়েছে। সে ভাবছে, একটু আগেই রুমুকে সুযোগ করে দেওয়ার কথা ভাবছিলে না? জীবনে একবার নিজে সুযোগ পেয়েছ তুমি, সায়েন্টিস্টের রোজকার ডেটা এ্যানালিসিস আর এ্যাপ্লিকেশন থেকে বেরিয়ে ম্যাজিশিয়ান হয়ে ওঠার। একবার যদি রুমুকে বিয়ে করে ফেল, রুমু সব পেয়ে যাবে। আজ যা আছে, সবকিছু রুমুর থেকে যাবে। 

ভোরের আকাশের নরম হলদে কমলা সূর্যের দিকে তাকিয়ে ওর খুব ইচ্ছে করে, এরকম একটা ম্যাজিক হোক। রুমুর জীবনের সব অন্ধকার শেষ হয়ে এবার সূর্যের আলোর মতো হেসে উঠুক ওর জীবন। যদি সেই আলোটাকে ধরে আনতে ওকেই ম্যাজিশিয়ান হতে হয়, ও রাজি। না, আবেগে ভেসে গিয়ে না। বুবুন বোঝে, এই বিয়ের সিদ্ধান্ত ওর খাঁটি যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক মনের। কারণ সবকটা সম্ভাবনা খতিয়ে দেখলে, এটাই সবচেয়ে ফলদায়ী সমাধান। 

আলোয় আলোয় আকাশ হেসে উঠল। ওর ঘরের এই পুবের জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে এসে সেই হাসির টুকরো ছিটিয়ে পড়ছে ওর ঘরের মেঝেতে, টেবিলে, বিছানায়। ওর মনও এখন হালকা হয়ে গেছে। বুবুন এসে শুয়ে পড়ে বিছানায়। চাদরটা মুড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। 

মা এসে ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙাল। এত দেরি অবধি ঘুমোয়না কখনো। বেলা দেখেই মা ডাকতে এসেছিল। ফ্রেশ হয়ে যখন বুবুন একতলায় লিভিং রুমে এল, বাবা আর মেজকা গল্প করছে। ছোটকা নেই, বাজারে গেছে বোধহয়। রাঙাদাও মিসিং, মানে সেও গেছে। মায়েরা পাশের রান্নাঘরে। 

বুবুন এসে বাবাকে বলল, "আমার একটা কথা ছিল।"

--"কি? আমার সঙ্গে? বল। আমি আর তপন একটু বেরোব। বাবলুদের বাড়ি যাব। আজ রবিবার। মৌদের বলেছি, রুমুকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে। পুপুল আর তীর্থ নিয়ে যাবে। আমরা দুজন ও বাড়ি গিয়ে কথা বলব।"

--"বাবা," বুবুন বাবার হাঁটুর উপর হাত রেখে মেঝেতে বসে, "আমি রাজি বাবা। তুমি ওদের বলে দাও, আমি রুমঝুমকে বিয়ে করব।" সবাই এপাশ ওপাশ থেকে এসে দাঁড়িয়েছে। মায়েদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তপনবাবুও খুশি মুখে দাদার দিকে তাকায়। 

স্বপনবাবুর মুখে হাসি নেই। বুবুনের মাথায় হাত রেখে বলেন, "আমি জানতাম। তুই কোনোদিন কারও অবাধ্য হোসনি। আজও হবি না। সকালে ঘুম থেকে উঠিসনি, তখনই ভেবেছি, রাতে তোর ঘুম হয়নি। কিন্তু বুবুন, এটা তো আমি তোকে করতে দেব না। তোকে আমি পড়াশোনা করতে বলেছি, কারণ আমার মনে হয়েছিল, তুই অনেকদূর এগোবি। কি পড়বি, আমি কখনো ঠিক করে দিতে চাইনি। তেমনি তুই কাকে বিয়ে করবি, আমরা তোর উপর চাপিয়ে দেব না। সেটা তোর একার জন্য না, রুমুর জন্য, আমাদের সবার জন্য খারাপ।"

বুবুন মনে মনে প্রমাদ গোণে। এখন কি ওকে কাকুতি মিনতি করতে হবে নাকি বিয়ে করার জন্য? একবার নাহয় বলেই ফেলেছে বিয়ে করবে না। তেমনি বাড়ির একজনও তো ওকে বলেনি পুরো ঘটনাটা। গলা খাঁকড়ে বলে, "আমি চাপে পড়ে বলছি না বাবা। ঐ তো ছোটমা জানে, আমি বাবলিপিসির কথা কিছু জানতাম না। ওরা সবাই আমাকে বলল। তারপর আমি ভেবেচিন্তেই বলছি। বলো না।" ছোটমাকে ইশারা করে।

চলবে