পরাণ বঁধুয়া
পর্ব - ১৩
ছোটমা এগিয়ে এসে বলে, "হ্যাঁ বড়দা। বুবুনকে আমাদের কারো আগে বলাই হয়নি সব কথা। কাল সব শুনল ও। যাকগে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন সব ভাল হচ্ছে এটাই ভাল।"
--"বুবুন উঠে বোস। তোমরা তার মানে দল বেঁধে ওকে বুঝিয়েছ কাল? খুব অন্যায় করেছ। ওর সিদ্ধান্ত ওকে নিতে দেওয়া উচিত ছিল।" বাবার কথায় বুবুন আরও মুষড়ে পড়ে।
--"না বড়দা, এইটে বোলো না। তোমার এই ছেলেকে না বোঝানো যায়, না আমরা কাল বুঝিয়েছি।" ছোটকা এসে ঢুকেছিল, শেষদিকের কথা শুনেছে। এগিয়ে এসে বলে, "বুবুনই আমাদের বোঝাতে এসেছিল, তখন জানাজানি হল সব কথা। তারপর বুবুন কি ঠিক করেছে, আমরা জানিও না।"
--"বেশ বুঝলাম। তার মানে বাবলির খবরটা শুনে তুমি রুমুকে উদ্ধার করে হিরো সাজতে চাইছ?" এবার নতুন রাস্তায় আক্রমণ।
বাবার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল মা, "এ আবার কি কথা? সিনেমা নাটক হচ্ছে নাকি যে হিরো সাজবে? বাবলির জন্যই তো আমরাও সবাই এখনই বিয়েতে রাজি। আয় তো বুবুন, আমি খুব খুশি হয়েছি, তোর বিয়ে এরকম চেনা ঘরে হচ্ছে বলে। কোথায় না কোথায় গিয়ে পড়ত মেয়েটা। এ বেশ আমাদের ঘরের মেয়ে ঘরেই থেকে গেল। শোনো, তোমরা তো যাচ্ছিলেই, এখন আমরা সবাই যাব। আজই সব কথাবার্তা সেরে ফেলব।"
--"যা ভাল বোঝো করো।" ব্যাজার মুখে বলেন স্বপনবাবু, "শেষবার জিজ্ঞেস করছি বুবুন, তুমি ভাল করে ভেবেছ তো?" বুবুন ঘাড় কাত করে দেয়। "বেশ, তাহলে অবশ্য কথাবার্তা আর ফেলে রাখলে চলবে না। এক কাজ করো। আমরা এতজন গিয়ে কাজ নেই। ওদের এখানে ডেকে নাও। এখানেই খাওয়া দাওয়া হোক। হ্যাঁরে, বাজার কি এনেছিস?"
--"মাংস আর পাবদা মাছ এনেছি বাবা।" পুপুল ততক্ষণে এক লাফে বাজারের ব্যাগদুটো রান্নাঘরে চালান করে এসেছে, "বলো তো একটু চিংড়িও নিয়ে নিই। আর দই মিষ্টি তো আনতেই হবে। পাকা দেখা বলে কথা।" ভাইকে জড়িয়ে ধরে পুপুল। লজ্জা পেয়ে ছাড় তো বলে পালায় বুবুন।
🌿🌹🌹🌿
এ বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে রুমুকে নিয়ে চলে এসেছে সবাই। প্রথমে একটু গুছিয়ে বসা, জল মিষ্টি দেওয়ার পর দেখা যায়, বুবুন নেই। পুপুল আর ছোটকা ধরে আনে ওকে। ততক্ষণে স্বপনবাবু পড়েছেন রুমুকে নিয়ে, "কি রুমু, আমাদের বাড়ি কেমন লাগছে? আমাদের সবাইকে কেমন লাগছে?"
--"খুব ভাল। তোমরা সবাই খুব ভাল। সবাই আমার বন্ধু হয়ে গেছে।" তুলি আর মিলির মাঝখানে বসেছে ঝলমলে রুমু। বুবুনের হাত ধরে নেমে এসেছে পুপুলরা। ওদের ঠেলাঠেলি আর ফিসফিস করে কথার জন্য রুমু একবার তাকিয়ে দেখেও। বুবুন সম্পূর্ণ অন্যদিকে ফিরে আছে। বাড়ির সবাই কি পরিমাণ লেগপুল করবে, ওর জানা। রাঙাদার বেলায় ও নিজেই কম করেছে নাকি? বা তুলিকে?
--"তাহলে তুমি এখানেই থেকে যাও। বরাবরের জন্য আমাদের বাড়িতেই থেকে যাও।" মিষ্টি হেসে বড়গিন্নি বলেন।
রুমুও হাসে, ফিক করে, "ওফ তাতে যা মজা হত না। ওখানের বন্ধুরা কেউ এখানকার মতো না। ওরা একটু পার্টি করল, হইহুল্লোড় করল, ব্যস। এত লাইভলি না। তবে আমার যে ক্লাস আছে। এবার এলাম বলেই কতদিন নষ্ট হচ্ছে। তাও মাম্মামের এত ইচ্ছে বলে আসতে হল। এসে অবশ্য খুব মজা হচ্ছে। এবার থেকে ছুটিতে নিশ্চয়ই আসব।"
সবাই মুখ টিপে হাসছে, বাবলিও। স্বপনবাবু সবার মুখের দিকে তাকিয়ে নিলেন। ওনার পর্যন্ত মজা লাগল, বুবুন বেচারা কে দুদিক থেকে দাদা আর কাকা ধরে রেখেছে, নাহলে বোধহয় ছুটে পালাত। সেটা হচ্ছে না বলে মন দিয়ে পায়ের নখ দেখছি হাবভাব করছে।
স্বপনবাবু মুচকি হেসে রুমুকে বললেন, "পড়াশোনা নষ্ট হওয়া একদম উচিত না। তুমি এখানে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাও। মাইগ্রেশন নিয়ে নাও। বলো তো ভাইস প্রিন্সিপাল আমার চেনা। আমি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে এ্যাপ্লিকেশন করিয়ে দিই।"
রুমু একটু মুশকিলে পড়ে। কারও বাড়িতে গেলে থেকে যাও বলা আপ্যায়নের একটা অংশ জানে। সেভাবেই ও বলেছে আবার আসবে। সত্যিই আসার ইচ্ছেও আছে, এদের খুব ভাল লেগেছে। এখন একজন বয়স্ক মানুষ ইউনিভার্সিটি, মাইগ্রেশন অবধি কথা নিয়ে গেলে কি উত্তর দেওয়া যায়? বিহ্বলের মতো মায়ের দিকে তাকায়।
মায়ের মুখেও হাসি, "সেই ভাল। তুই এখানে থেকে যা। এখানে লেখাপড়া কর।"
--"সবাই মিলে আমাকে খ্যাপাচ্ছ কেন বলোতো? আমি একটু বেশি কথা বলি বলে? আমি তুলিদির সঙ্গে তীর্থদার সঙ্গেও দেখা করতে চলে গেলাম বলে?" রুমুও হাসিমুখে বলে, "আমার সত্যিই তোমাদের সবাইকে খুব ভাল লেগেছে। মামনি আর মামাইয়ের মতো তোমদেরও আমার খুব আপন মনে হয়েছে।"
চলবে