Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পরাণ বঁধুয়া - 14

পরাণ বঁধুয়া

পর্ব - ১৪

--"ব্যস, ব্যস রুমু মা। এইটাই আমি শুনতে চাইছিলাম। আর আমার কিছু চাই না। আর তোমাকে আমি মুম্বাই ফিরতে দেব না। তোমাকে আমার বাড়িতে সবসময়ের জন্য রেখে দেব। ঐ যে আমার ছেলেটা রয়েছে, ওর বৌ করে, আমাদের মেয়ে করে রেখে দেব।" স্বপনবাবুর খুশি মনের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসছে বোঝা যায়। 

মৌ এতক্ষণ চেপেচুপে ছিল। এবার এসে রুমুকে জড়িয়ে ধরে। দুপাশ থেকে তুলি মিলিও জড়িয়ে ধরেছে। বড়দের সবার মুখে হাসি। বুবুনকে জড়িয়ে ধরেছে পুপুল আর ছোটকা। বাবলির চোখের কোণায় চিকচিক করছে জল। 

কেউ খেয়াল করে না, রুমু স্তব্ধ, আতঙ্কিত মুখে ফ্যালফেলিয়ে চেয়ে আছে। সবার উচ্ছ্বাসের মাঝখানে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে রুমু। দম বন্ধ হয়ে আসছে, হাত পায়ের তালু ঘামছে, জল চেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। 

ঠিক এরকম হয়েছিল ওর বাবা যখন চলে গেল। কয়েকদিন ধরেই বাড়িতে কেমন একটা থমথমে গরম বাতাস বইছিল। ওর সঙ্গেও মা রেগে রেগে কথা বলত। বাবা বাড়িতে এলেই মামনিকে ফোন করত। মামনি নিয়ে যেত ওদের ফ্ল্যাটে। একই কমপ্লেক্সের মধ্যে ঐ ফ্ল্যাটে নিজেদের ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি থেকেছে রুমু। কিন্তু এখন সেখানেও যেন কেমন মরচে ধরা রঙ। ছোট্ট রুমুও বুঝতে পারত, মাছ খাব না বলে বায়না করার সময় এটা না। আইসক্রিম আর প্যাস্ট্রি দিয়ে মামাই দুহাত ভরিয়ে দিলেও সেগুলো যেন ঠিক আগের মতো মিষ্টি না। 

তারপর একদিন রুমুকে কমপ্লেক্সের গ্রাউন্ডে খেলতে পাঠাল মামনি। যা আগে কোনোদিন হয়নি, গেটের সিকিউরিটি আর ওর দুই বন্ধু সিলভিয়া আর পিঙ্কির মায়েদের বলে ওকে একাই রেখে গেল মামনি। ছোটদের খেলা শেষ, একে একে সবার মা নিয়ে যাচ্ছে। সিলভিয়ার মায়ের সঙ্গে রুমু যাচ্ছে এলিভেটরের দিকে, কারণ ওরা এক বিল্ডিং এর, এলিভেটরটা নিচে নামতেই বাপি নেমে এল। পরে রুমুর খেয়াল হয়েছিল, বাপি একটা পাতলা ব্রিফকেস নিয়ে হাসপাতালে যেত। সেদিন একটা ট্রলিব্যাগ সঙ্গে। ওকে দেখে জড়িয়ে ধরল বাপি। কেমন যেন অন্যরকম দম বন্ধ করা সেই জড়িয়ে ধরাটা। অনেকক্ষণ পরে ওকে কপালে চুমু খেয়ে বাপি বলল, "রু মাই প্রিন্সেস, অলওয়েজ স্টে হ্যাপি। মাম্মাম আর মামনির কথা শুনে চলবে।" ছুটে চলে গেল বাপি। 

রুমু কিচ্ছু বোঝেনি। ভাবতেই পারেনি আর কোনদিন বাপিকে দেখতে পাবেনা। ও ভেবেছিল বাপি হাসপাতালে নাইট ডিউটিতে যাচ্ছে। সেদিন মামনি রাতে নিয়ে চলে গেল। ওর পছন্দের খাবার আর পুতুল দিয়ে খাটে বসিয়ে রাখল। মামনিও পাশে বসে ছিল। আর মামাই পায়চারি করতে করতে কি বলতে গেল। 

মামনি কেমন একটা গলায় বলল, "আহ এখন না। এখন রুমু ঘুমোবে। চলো রুমু মায়ের কাছে যাই।" 

মায়ের কাছে গিয়ে মামনি আর মায়ের মাঝখানে ঘুমিয়েছিল রুমু, সেটাও মনে আছে। 

পরদিন সকালে শুনল ওরা মুম্বাই যাবে। রুমু ভাবল বাপি আসলে সবাই মিলে বেরোবে। না, তা নয়। অর্ডার দিয়ে খাবার আনিয়ে সারাদিন সব বইপত্র আর জামাকাপড় প্যাক করল বড়রা। রুমুকেও মাঝে মাঝে হাত লাগাতে বলল মামনি। পরেরদিন বেশ কিছু জিনিস একটা বড় গাড়ি এসে নিয়ে গেল। দুটো বড় স্যুটকেস নিয়ে প্লেনে চেপে ওরা এল মুম্বাই। রুমু ভাবছে, তাহলে বাপি এখানে কাজে এসেছে আগে। এখন ওরা এল। একটা নতুন ফ্ল্যাটে গেল সবাই। মাম্মাম চলে গেল হাসপাতালে। এখন থেকে মাম্মাম এখানে চাকরি করবে। দুদিন থেকে মামনিরা চলে গেল। বারবার চোখ মুছতে মুছতে মামনি বলে গেল, আবার আসবে। 

দুজন বাঈ এল বাড়িতে, সুসমা বাঈ আর নিরজা বাঈ। রুমুর সুসমা মাসি আর নিরজা মাসি। এখনও ওরা রুমুদের বাড়ি দেখভাল করে। মামনিরা বছরে দুবার বেড়াতে যায়। বেড়াতে যায়, আর রুমুদের সঙ্গে থাকে না। 

বাপি আর কখনো আসেনি। মাম্মাম বলেছিল, বাপি অন্য জায়গায় চাকরি করছে। অনেক বন্ধুদের বাবা অন্য জায়গায় চাকরি করে, ও জানত। বিশ্বাস করেছিল। বোর্ড এগজামের পর মামাই আর মামনি এল। চারজন মিলে কাশ্মীর যাবে ওরা। যাওয়ার আগের দিন রুমু জানল সত্যি কথা। 

সিনেমার মতো সেই কাশ্মীরের সৌন্দর্যও চোখে না পড়া পর্যন্ত সব ঘটনা মনের প্রোজেক্টরে মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পেল ও। 

মুখ তুলে বলল, "আমি বিয়ে করব না কিছুতেই। আমার মাম্মামকে ছেড়ে থাকব না। তোমরা আমাকে আটকে রাখতে পারবে না।" ঠেলেঠুলে উঠে পড়ার চেষ্টা করে। 

বাবলি হাত বাড়িয়ে ওর হাত ধরে, নিজের পাশে বসায় এনে। রুমু মাকে জড়িয়ে ধরেছে, ঝরঝর করে চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। বাবলি গভীর শ্বাস টানছে, মেয়ের পিঠের উপর হাত বোলাচ্ছে। এই মুহূর্তটার কথা সবাই ভেবেছে, রুমুকে কি করে বলা হবে? এই অবধিই ভেবেছে। তারপর সবার ভাবনা পথ হারিয়েছে। বলার দূরে থাক, অন্য কেউ বললে শোনার, পাশে থাকার সাহসও করতে পারেনি। 

চলবে