Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পরাণ বঁধুয়া - 15

পরাণ বঁধুয়া

পর্ব - ১৫

জীবনের এই অদ্ভুত সন্ধিক্ষণেও সাহস দেখাল বাবলিই। মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "মাম্মাম সবসময় তোর কাছে কাছে থাকে তুই তো জানিস বেবি। সব মেয়েদের সঙ্গে তাদের মায়েরা থাকে। আমার মা আকাশের তারা হয়ে গেছে কতগুলো বছর। তাও মা আমার কাছে আছে। মা আমাকে যা যা শিখিয়েছে, সব আমার মনে আছে। আর সেগুলোর সঙ্গেই আমার মা আছে। তোর এই মাম্মামের মাথার ভিতরে একটা বল গজিয়েছে, দুষ্টু বল।" রুমু কান্নাভেজা বিস্ফারিত চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। বাবলি বলে যাচ্ছে, "সেই দুষ্টু বলটাকে উপড়ে ফেলে দেব আমরা। কিন্তু সেটা বেশ বড়। তাই ডাক্তারবাবুরা একটু, এই অল্প একটু ভয় পাচ্ছেন। আর তুই তো জানিস, ডাক্তাররা কেমন ভীতু হয়। তোর মাম্মাম যেমন তেলাচোরা দেখলে চোখ উলটে ফেলে।" রুমুর কান্না বন্ধ হয়ে গেছে। কাঁদার শক্তি বা সাহস কোনটাই আর নেই। মামনি এসে রুমুকে জড়িয়ে নিয়েছে। 

বাবলি এখনও স্থির। শান্তগলায় ছোট বাচ্চাকে বোঝাচ্ছে, "তুই কদিন মামনির কাছে থাকতে পারতি। কিন্তু তোর মামনিকে আমারও যে দরকার হবে রুমু। আমার যখন চিকিৎসা হবে মুম্বাইতে, তখন মামাই আর মামনি আমার কাছে থাকবে। তাই আমরা সবাই ঠিক করেছি, তুই এ বাড়িতে থেকে যা। তোকে যদি বড়দা আর বড়বৌদি আশ্রয় দেয়, আমি নিশ্চিন্তে মুম্বাই যাব। তোর জন্য আর কোনও চিন্তা থাকবে না আমার। আমার চিকিৎসার জন্যেও এসব চিন্তা ভাল নয়।"

--"রুমু, তুই বোকার মতো আপত্তি করলে তোর মায়ের অসুখ আরও বাড়বে। আর তোকে তো বিয়ে করে দূরে কোথাও অন্য কারও বাড়িতে চলে যেতে হচ্ছে না। তুই এখানে থাকবি, আমাদের কাছে। বৌদিরা থাকবে, আমি থাকব, তোর মাও থাকবে। এবার সুস্থ হয়ে উঠলে আর ওকে আমি মুম্বাই যেতেই দেব না। তুই মায়ের কাছেই থাকবি। এতবড় আনন্দের খবরে কেউ কাঁদে বোকা মেয়ে?" মামনি চোখের জল মুছে দেয় রুমুর। 

মৌ এসে হাত ধরে, "এসো রুমু, মুখটা ধুয়ে নাও তো। আমরা সবাই আছি তো। বাবলিপিসি মুম্বাই থেকে ফেরা পর্যন্ত তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। তারপর তো সব্বাই একসঙ্গে। কি মজা হবে বলোতো? এসো রুমু।" 

মৌ রুমুর হাত ধরে নিয়ে যায়, যন্ত্রের মতো রুমু হেঁটে যায়। নিজেও জানে না কিভাবে হাঁটছে। ছোটকা ইশারা করে ওকে একেবারে দোতলায় নিয়ে যেতে। একটু ভুলিয়ে রাখতে। 

রুমুকে নিয়ে মেয়েরা চলে যেতে বাবলিও উঠল। চোখেমুখে জল দিয়ে এসে বসল। যেভাবে আজ আসর শুরু হয়েছিল, আর সেই হাওয়া নেই। বুবুনকে ধরে রাখার, ঠাট্টা তামাসার ব্যাপারই এখন না। মেয়েরা সবাই উপরে চলে যেতে সামনের খালি সোফাটায় ছোটকার দুপাশে দুই ভাইপো বসে পড়েছে। 

বাবলি বসে বুবুনকে বলে, "বুবুন, আমি বুঝতে পারছি তোমার সিচুয়েশনটা সবচেয়ে এমব্যারেসিং। তোমার সামনে রুমু কেঁদে কেটে এমন একটা সীন করল। আমাদের উচিত ছিল ওকে আগে সব বলা। আমি তোমাদের বাড়ি থেকে কনফার্ম নিউজ না পাওয়া অবধি ওকে বলতে চাইনি। দু বাড়িতে আত্মীয়তা রয়েছে। সেই পুরনো সম্পর্ক যেন নতুন যে সম্পর্কের প্রস্তাব আমি রেখেছি, তাতে নষ্ট না হয়, এটাই চেয়েছি। তোমার আপত্তি থাকলে রুমুকে কিছু বলতামই না। এদিকে বড়দা হঠাৎ ডেকে পাঠাল। ওকে কিছুই বলা হয়নি। এখন যা হল, তুমি একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। রুমু ছেলেমানুষি করে ফেলেছে। যদি তুমি ক্ষমা করতে পার আমার মেয়েটাকে।" 

দোতলায় মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে করিডর ধরে রুমু যাচ্ছিল মৌয়ের সঙ্গে ওর ঘরে। সেখানে এই ওপেন লিভিং রুমের সমস্ত কথাই শোনা যায়। রুমু মন শক্ত করে নেয়। 

--"বাবলিপিসি প্লিজ, এভাবে আমাকে বোলো না। সিচুয়েশনটা আমাদের কারও হাতে নেই বটে, কিন্তু এইটুকু আমি বুঝি।" কি যে বলা উচিত ভেবে না পেয়ে প্রবল অস্বস্তিতে চুপ করে যায় বুবুন। 

মেজকা বলে, "বাবলি তুই একদম চিন্তা করিস না এগুলো নিয়ে। আমাদের বুবুন মোটেই এরকম ছেলে না। ওর কোনও অহঙ্কার নেই। পাড়ায় কার সঙ্গে না ওর ভাব। ছেলে, বুড়ো সবাই আমাদের পুপুল আর বুবুন বলতে অজ্ঞান। রুমু মায়ের কতটা কষ্ট হচ্ছে, ও সব বুঝতে পারছে আমাদের মতো। সব ঠিক হয়ে যাবে বাবলি। তুই এবার নিজের চিকিৎসায় কোন ফাঁক রাখিস না।"

--"আমি তবুও বলব বুবুন, তুমি আজকের পর একবার ভেবে দেখ। আমি রুমুর মা, আমি ওর জন্য বেস্টটাই চাইব। তুমি রুমুর মতো ছেলেমানুষকে নিয়ে চলতে পারবে তো?"

চলবে