পরাণ বঁধুয়া
পর্ব - ১৬
--"বুবুন আমাদের সবার সঙ্গে মানিয়ে চলে। শুনিসনি আমাদের কাছে এতকাল? ও ঠিক রুমুকে বুঝবে।" গর্বিত ভাবে বলে মামনি।
--"তোরা এভাবে ওকে প্রেশারাইজ করিস না। ইন্ডিপেনডেন্টলি ডিসিশন নিতে দে। বুবুন, তোমাকে এক্ষুণি উত্তর দিতে হবে না। আরেকটু ভাবো।" বাবলি বুবুনের মুখের কথাই শুনতে চায়।
এতক্ষণে বুবুনও একটু কথা খুঁজে পেয়েছে, ও বলে, "আমাকে এভাবে বলতে তো বারণ করলাম। আমি রুমুর কথায় কিছু মনে করার আছে তা ই ভাবিনি। তবে আমার একটা কথা আছে। রুমুকে কি খানিকটা প্রেশারাইজ করা হচ্ছে না? ওকে জোর করলে সেটা আরও খারাপ হবে। একেই একটা শক লেগেছে। ওর সঙ্গে কথা বলো তুমি। ওকে একটু সময় দাও।"
বাবলি মনে মনে বলে, "ঐ সময়টাই যে আমার নেই। তোমার কথা এত বছর শুনেছি, জানি। এখানে এসে তোমাকে চোখে দেখে একবার লোভ হল যে ভাগ্যকে শেষবার হারিয়ে দিয়ে যাব।"
ছোটকা বলে, "চল আমরা তিনজন উপরে যাই। রুমুর সঙ্গে গল্পগুজব করে ওর মন ভাল করে দিই। ওর মনের কথাও জানা হবে।" দুই ভাইপোকে নিয়ে তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড ছোটকা দোতলায় রওনা দেয়।
দোতলায় ততক্ষণে রুমুকে বোঝাচ্ছে মৌ, "রুমু তুমি তো বলো আমাদের সবাইকে তোমার ভাল লেগেছে। পরশুই বলছিলে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার সময় তোমার খুব কষ্ট হবে। তাহলে কেন যাবে? তোমার মা ও তো এরপর এখানেই থাকবে। আর কিসের আপত্তি তোমার?"
--"আমাদের ভাইদা কত ভাল জানিস? এর আগে যে প্রোজেক্টটা করেছিল, সেটার জন্য ও সায়েন্টিস্ট অফ দ্যা ইয়ার হয়েছিল। তার জন্যই এবার সরকারের এই প্রোজেক্টটায় একা ওকে ডাকা হয়েছে। ও রিজেক্ট করলে, তবেই অন্য কাউকে ভাবা হত।" তুলি মৌকে হেল্প করছে।
--"শুধু তাই, ওর মনটা যে কত নরম ভাবতে পারবে না। প্রথমে একটু চীৎকার চেঁচামেচি করে। তারপর তোমার জন্য প্রাণ দিয়ে দেবে। এই যে আমি বাড়িঘর, বাবা মা সব ছেড়ে এসেছি, বুবুন আমাকে নিজের ভাইয়ের মতো দাদার মতো আগলে আগলে রাখে জানো। আমার এতটুকু শরীর খারাপ শুনলে হয়ে গেল। ঠায় বসে থাকবে, ওষুধ খাওয়াবে। ওকে যত চিনবে, বুঝতে পারবে।" মৌ সত্যিই বুবুনের ভালবাসা পেয়েছিল। নিজেও খাঁটি একটা মেয়ে। তাই মন থেকে কথাগুলো বলে।
--"সত্যি আমাদের সবার মধ্যে ভাইদাই সবচেয়ে বেশি ভালবাসে বৌমণিকে। রাঙাদা বৌমণির সঙ্গে একবার ঝগড়া করলে হল। বৌমণির চেয়ে ভাইদা ওর উপর বেশি খেপে যাবে। তোর সঙ্গে তো সেভাবে আলাপই হয়নি ভাইদার। তাও কাল যেই বাবলিপিসির শরীরটা ভাল না, তোদের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে শুনল, চুপ করে গেল। ওর তো এখন বিয়ে করার একটুও মত ছিল না কাজের চাপের জন্য। কিন্তু এইসব শুনেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেল।" মিলি সবটাই বলে ফেলে, আর চোখ সরু করে শোনে রুমু।
ইতিমধ্যে ছোটকারা এসেছে। ছোটকা আর পুপুল সাধারণ কথাবার্তা শুরু করে। ছোটমা আসে রুমুর জন্য মিষ্টি নিয়ে। কোলের কাছে নিয়ে বসে ধীরে ধীরে খাইয়ে দেয়। রুমু আস্তে আস্তে একটু সুস্থ বোধ করছে। সে জানে, ভেবে নিয়েছে, মায়ের জন্য যেটা ভাল হবে, সেটাই করবে।
রুমুকে নিয়ে গল্পে মেতে উঠেছে সবাই। হাসির কথায় টুকটাক হাসছে রুমু। বুবুনের নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে এই জমাট আসরে। ও একটিও কথা বলেনি। বলার মতো কিছু নেইও, আর রুমুর আপত্তির কারণ হয়ে ও নিজেই কিছু বলতে গেলে রুমু বেশি বিরক্ত হবে, এইটি বোঝে। আবার চলে গেলেই ওকে ডাকাডাকি শুরু হবে। তাই ঘরের একপাশে বসে সবার সব কথা শোনে।
আরও কিছুক্ষণ পর সবাই নিচে যায়। মায়ের পাশে বসানো হয় রুমুকে। শক্ত করে মায়ের হাত ধরে আছে রুমু।
বাবলি বলে, "কি রে রুমু, তাহলে এখানে থাকবি তো? তোকে কত ভালবাসে ওরা সবাই। কেমন ওদের সঙ্গে মজার মজার গল্পে তুই সব ভুলে যাস। এ বাড়ির লোকেদের পেলে তুই ঠিক এখানে থাকতে পারবি, বল?"
ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ে রুমু, হ্যাঁ।
আবার হেসে ওঠে মুখার্জী বাড়ি। খুব কিছু হাল্লাগুল্লা না হলেও ঠিক হয় তুলির সঙ্গে একই দিনে বুবুন আর রুমুর বিয়ে হয়ে যাক। তার জন্য বিয়ে বাড়ি ভাড়া করা থেকে প্রচুর কাজ, যা নাকি এখন মাত্র দশদিনের মধ্যে করতে হবে। বাবলিকে সবাই আশ্বাস দেয়, ওর এসব নিয়ে ভাবতেই হবে না। যা হবে দুইবাড়ি একসঙ্গে করা হবে। গুজগুজ শুরু হয়ে যায়, কেনাকাটা করতে হবে।
স্বপনবাবু হুঙ্কার দেয়, "আবার কিসের কেনাকাটা রে? তুলির বিয়েতে পরবি শুনিয়ে শুনিয়ে তোরা সবকটা তুলির চেয়ে বেশি জিনিস কিনেছিস। আগামী দশবছর কেউ কিছু কেনার নাম করবি না।"
চলবে