পরাণ বঁধুয়া
পর্ব - ২০
রুমুর দিকে জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বুবুন বলে, "জল খাও। ভাল লাগবে।"
রুমু মুখ তুলে তাকায় এত নরম গলা শুনে।
আরও গলা নামিয়ে বুবুন বলে, "আচ্ছা, আমি সরি। কিন্তু বিলিভ মি, প্ল্যানটা আমার না।"
রুমু এবার জলের গ্লাসটা নেয়, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "জানি, তুমি না।" ঢকঢক করে জলটা খেয়ে নেয়। তারপরও বসে আছে।
বুবুন একটু ইতস্তত করে বলে, "বসবে এখানে? ওদের আসতে এখনও অনেক দেরি। আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি।"
--"তুমি বিয়েতে রাজি হলে কেন?" খুব নরম গলায় থেমে থেমে প্রশ্ন করে রুমু।
বুবুন ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে এদিক ওদিক তাকায়, একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, "তোমার বিয়েতে আপত্তি বললে না কেন? এখন বাড়ি চল, বলবে।"
রুমুর মাথা নিচু, চোখে টলটলে জল, "মা, মার কি হবে?"
একটু আগের রাগটা উধাও হয়ে সেখানে কি ভীষণ মায়া হয়। একেবারে ছেলেমানুষ। সত্যিই বকুনি দিয়ে চালানোর মতো ছোট রয়ে গেছে এখনও।
বুবুন বলে, "তোমার মায়ের কিচ্ছু হবে না। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছে বলে বাবলিপিসি সব বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখছে আর ভয় পাচ্ছে। অপারেশন হয়ে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।"
--"মাম্মামের এরকম না হলে আমি কক্ষণো তোমাকে এখন বিয়ে করতাম না।" রুমু মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলে।
আ একটা জলের গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দেয় বুবুন, "আমি জানি। সবটাই দেখেছি তো। বলছি, আমি একটু কফি খাব। তুমি কিছু খাবে?"
রুমু গোঁজ হয়ে বসে আছে। বুবুন ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দেয়, দুটো ব্ল্যাক কফি, দুটো গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ।
রুমু বলে, "আমি ব্ল্যাক কফি খাই না।"
--"ও আচ্ছা। ওরটা একটা কোল্ড কফি দেবেন প্লিজ।"
--"আমি কফি খাই না।"
--"তাহলে হট চকলেট খাবে?" সাড়া নেই।
বুবুন ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে, "ওর হট চকলেট।" ওয়েটার চলে যেতে বলে, "বিয়ে করার ইচ্ছে তোমার ছিল না, আমিও জানি। তুমি কি করবে ভেবেছিলে? কি হতে চাও?"
--"আমি ট্রাভেল ব্লগার হতে চাই। আমি ওয়ার্ল্ড ট্যুরে যেতে চাই। মাম্মাম আমাকে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে নিতে পারবে না। আর মাম্মামের টাকায় আমি আমার উইশ ফুলফিল করতে চাইও না। আমি নিজেই ব্লগার হয়ে সব ঘুরব।"
--"ভেরি গুড। আমার খুব ভাল লাগল, তুমি নিজে নিজের উইশ ফুলফিল করতে চাও। তবে তার জন্য এখনও আরও পড়াশোনা করতে হবে, আর একটু বড় হতে হবে তোমাকে।" বুবুন আবার জলের গ্লাসটা নিয়ে চুমুক দেয়।
গ্লাস নামিয়ে রেখে বলে, "এবার বলো, কি করবে? এখন বিয়ে করবে না কি বাড়ি ফিরে সব বলে দেবে? আমি শুধু বলে দিই, বিয়ে না করলে শুধু শুধুই তোমার মা অপারেশনের আগে টেনশন করবে। নাও, খাবার এসে গেছে। আগে খেয়ে নাও।" বুবুন ওর সামনে প্লেট গ্লাস এগিয়ে দেয়, "খেতে খেতে ঠিক কর, কি করবে। যাই কর, আমি তোমার সঙ্গে থাকব।"
--"কেন? তুমি কেন সঙ্গে থাকবে?"
--"ধরো আমি তোমার বন্ধু। আমার বাড়ির লোকেরাও সবাই তোমার বন্ধু। তোমার যেটাতে ভাল হবে ভেবেছিল, তাই করতে গেছিল। তুমি বিয়ে না করলেও ওরা তোমার পাশে থাকবে দেখো।"
রুমু চুপচাপ একটুখানি স্যান্ডউইচ ছিঁড়ে খায়। বুবুন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে বলে, "ও আবার কি মুর্গীর মতো খুঁটে খুঁটে খাওয়া? দুপুরেও দেখলাম খাওয়ার কি ছিরি।
--"তা কি করে খাব শুনি? আমাকে বাড়িতে নিরজা মাসি খাইয়ে দেয়। মাম্মাম একদম পছন্দ করে না খাইয়ে দেওয়া। তাই এখানে কেউ খাইয়ে দেয় না। তখন খালি ছোটমা মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছিল।"
রুমুর এই অদ্ভুত খিঁচুনি শুনে অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখে বুবুন। সাধে বাবলিপিসি মেয়েকে নিয়ে এত চিন্তা করছে? কিন্তু সেই চিন্তা দূর করতে তো জোর করে ওর বিয়ে দেওয়া যায় না, সেটা বেআইনী।
এদিকে রুমু ভাবে, তখন যেভাবে ভেবেছিল, মাম্মামের কথায় বিয়ে করে নিলে মাম্মাম খুশি থাকবে। আবার এদের বাড়ির লোকগুলোও ভাল, রুমুকে ভালবাসে। আর বুবুন...... রুমু ঢোঁক গেলে।
বুবুনের স্যান্ডউইচ শেষ, ও কফি খেতে খেতে রুমুকে অবজার্ব করছিল। মেয়েটা খুব মিষ্টি দেখতে। এখনও মুখের ডৌলে বালিকা সুলভ কমনীয়তা। একমাত্র মেয়ে, বাবলিপিসির একমাত্র অবলম্বন, খুব আহ্লাদী বোঝাই যায়। এখন পাগলীটা কি ঠিক করবে কে জানে।
নিজেরই অবাক লাগে, এখন একগাদা কাজের চিন্তা ওর মাথায় ঘোরার কথা। সেখানে ও এইরকম পুঁচকে একটা খ্যাপাটে, আনপ্রেডিক্টেবল মেয়েকে নিয়ে ক্যাফেতে বসে আছে, সে কতক্ষণে একফালি স্যান্ডউইচ খেয়ে শেষ করবে, তারপর ওকে বিয়ে করবে কি করবে না, সিদ্ধান্ত নেবে।
চলবে