Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

অন্ধকারের সংকেত - 3

সেই রাতটা আমার জীবনের অন্যতম ভয়ংকর রাত হয়ে থাকবে ।

সামনের বাড়ির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কালো অবয়বটা বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গেই অদৃশ্য হয়ে গেল । আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম । মনে হচ্ছিল শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে গেছে ।

অরিন্দম দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে এল ।

— কী হয়েছে, রুদ্র ?

আমি কাঁপা গলায় বললাম ,

— ছাদে… কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল ।

অরিন্দম এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইরে বেরিয়ে গেল । আমিও তার পিছু নিলাম । আমরা রাস্তা পার হয়ে সামনের বাড়িতে পৌঁছালাম । পুরোনো বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ছাদে উঠলাম ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি — সেখানে কেউ নেই ।

শুধু ছাদের এক কোণে একটা কালো কাপড় পড়ে আছে ।
অরিন্দম সেটা হাতে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করল ।

— এটা কী ?
আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

— কারও পোশাকের অংশ । সম্ভবত তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় ছিঁড়ে গেছে ।

আমি বললাম ,
— তাহলে আমরা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম ।

অরিন্দমের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল ।
— না, রুদ্র । আমার মনে হয় সে ইচ্ছা করেই এটা রেখে গেছে ।

— কেন ?

— আমাদের বোঝানোর জন্য যে সে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখছে ।

কথাটা শুনে আমার শরীর শীতল হয়ে গেল ।
পরদিন সকালে অরিন্দম আমাকে ডেকে তুলল ।
ওর চোখে সারারাত না ঘুমানোর ছাপ ।

— তাড়াতাড়ী তৈরি হও রূদ্ৰ ।

— কোথায় যাব আমরা ?

— হাসপাতালে।

— কেন?

অরিন্দম আমার দিকে তাকিয়ে বলল ,
— গতকাল যে লোকটা মারা গেল , তার পরিচয় জানতে হবে ।

হাসপাতালে পৌঁছে আমরা জানতে পারলাম, মৃত ব্যক্তির নাম সঞ্জয় পাল । পেশায় তিনি একজন সাধারণ হিসাবরক্ষক ।

কিন্তু তাঁর মোবাইল ফোনে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে , যা আমাদের অবাক করে দিল ।
একটি অচেনা নম্বর থেকে বারবার মেসেজ এসেছে তার ফোনে ।

শেষ মেসেজটি পড়ে আমার গা শিউরে উঠল ।

“গোয়েন্দাদের ওপর নজর রাখো । ভুল করলে তোমার পরিবারের শেষ দেখতে হবে ।”

নিচে কোনো নাম নেই । শুধু একটি চিহ্ন— চোখের ।

অরিন্দম বলল ,

— এর মানে সঞ্জয় নিজের ইচ্ছায় কাজ করেনি । তাকে বাধ্য করা হয়েছিল ।

আমি বললাম,

— তাহলে ছায়া শুধু একজন মানুষ নয় ?

অরিন্দম উত্তর দিল,

— সম্ভবত এরা একটা সংগঠন ।

হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় একজন বৃদ্ধ লোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল । তার চোখে মুখে আতঙ্ক ।

— আপনি কি অরিন্দম সেন ?

— হ্যাঁ ।

— আপনাকে একটা কথা বলার আছে ।

— কী কথা ?

বৃদ্ধ চারদিকে তাকালেন , যেন কেউ শুনছে কিনা নিশ্চিত হতে চাইছেন । তারপর নিচু গলায় বললেন—

— ১৮২৩ সালে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল না ।

অরিন্দমের চোখ সরু হয়ে গেল ।

— তাহলে?

বৃদ্ধের গলা কেঁপে উঠল — সেটা ছিল… একটা হত্যাকাণ্ড।

আমার বুক ধক করে উঠল ।

— আপনি কীভাবে জানেন ?

— কারণ আমার পূর্বপুরুষ সেই জমিদারবাড়ির একজন কর্মচারী ছিলেন ।

অরিন্দম বলল ,

— আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে ?

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করলেন। পুরোনো, মরচে ধরা লোহার চাবি ।

— আমার পরিবার দুইশো বছর ধরে এটা লুকিয়ে রেখেছে ।

— এটা কিসের চাবি ?

বৃদ্ধ বললেন —

— এটা জমিদারবাড়ির গোপন কক্ষের চাবি ।

আমরা দুজনেই হতবাক । যে গোপন কক্ষের কথা এতদিন শুধু ডায়েরিতে ছিল , তার চাবি এখন আমাদের সামনে ।

কিন্তু ঠিক তখনই—

ঠাস!

একটা গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল ।বৃদ্ধের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল ।তার বুক থেকে রক্ত বের হতে শুরু করল । তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন । আমি চিৎকার করে উঠলাম—

— না!

অরিন্দম মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে তাকাল ।রাস্তার উল্টো দিকে একটি কালো মোটরসাইকেল দ্রুত সরে যাচ্ছে ।তার পিছনের লোকটির মুখ ঢাকা ।
শুধু যাওয়ার আগে সে হাত তুলে একটা চিহ্ন দেখাল --- একটি চোখের ।


অরিন্দম দ্রুত বৃদ্ধের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো । বৃদ্ধ তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন । কষ্ট করে তিনি অরিন্দমের হাত ধরলেন ।

— শুনুন… ওরা… ওরা…

— আপনি যানেন কে এই ছায়া ?

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

— গোপন কক্ষে… শুধু ধন নেই…

— তাহলে কী আছে ?

বৃদ্ধের চোখে ভয়ের ছাপ আরও গভীর হলো ।

তিনি শেষ শক্তি দিয়ে বললেন—

— ওখানে আছে… প্রমাণ… যে প্রমাণ বের হলে…


হঠাৎ তাঁর গলা থেমে গেল । হাতটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল । তিনি মারা গেছেন । কিন্তু তাঁর শেষ কথাগুলো আমাদের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করল ।

কী সেই প্রমাণ?কোন সত্যকে দুইশো বছর ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে?

আর কেন "ছায়া" নামের সংগঠন যে কোনো মূল্যে সেই সত্য বাইরে আসতে দিতে চায় না?

অরিন্দম মাটিতে পড়ে থাকা চাবিটা তুলে নিল ।
তার চোখে আমি সেই পরিচিত দৃঢ়তা দেখতে পেলাম । সে ধীরে ধীরে বলল—

— রুদ্র , এবার আমাদের নদিয়ার সেই জমিদারবাড়িতে যেতে হবে ।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম—

— এখনই?

অরিন্দম জানালার বাইরে কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—

— যত দেরি করব , ছায়া আমাদের থেকে তত এগিয়ে যাবে এবং তত বেশি‌ ক্ষতি করবে ।

কিন্তু অরিন্দম তখনও জানত না —

সেই জমিদারবাড়ির দরজা খুললেই আমরা এমন একজনের মুখোমুখি হব, যার নাম ইতিহাসের পাতায় নেই… 

চলবে...


---

❤️ গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করুন।
💬 আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
📌 ফলো করুন, কারণ পরবর্তী পর্বে শুরু হবে জমিদারবাড়ির ভয়ংকর অভিযান। 👁️🔥