Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

অন্ধকারের সংকেত - 4

বৃদ্ধ মানুষটির নিথর দেহ রাস্তার ওপর পড়ে ছিল।

তার চোখ দুটো এখনও খোলা , যেন মৃত্যুর আগের সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনও তার সামনে ভাসছে ।

আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম । জীবনে অনেক অপরাধের কথা শুনেছি , কিন্তু নিজের চোখের সামনে এভাবে একজন মানুষকে প্রাণ হারাতে দেখা — সেটা আমার কাছে প্রথম ।

অরিন্দম ধীরে ধীরে বৃদ্ধের চোখ বন্ধ করে দিল ।
তার মুখে কোনো ভয় ছিল না ,ছিল প্রচণ্ড রাগ ।

— ছায়া ভুল করেছে , রুদ্র ।

আমি অবাক হয়ে তাকালাম ।

— কী বলছ ?

— ওরা ভাবছে মানুষকে মেরে সত্যকে চিরদিন লুকিয়ে রাখা যায় । কিন্তু প্রতিটা খুন আসলে নতুন একটা সূত্র রেখে যায় ।

আমি বললাম —

— কিন্তু বৃদ্ধ তো শেষ কথাটা বলেই যেতে পারলেন না ।

অরিন্দম বৃদ্ধের হাতে শক্ত করে ধরা পুরোনো লোহার চাবিটার দিকে তাকাল ।

— কথাটা বলেননি , কিন্তু উত্তরটা দিয়ে গেছেন ।

আমি চাবিটার দিকে তাকালাম ।সাধারণ একটা মরচে ধরা লোহার চাবি । কিন্তু এই চাবির জন্যই আজ দুজন মানুষ মারা গেছে ।

চুরি হওয়া মানচিত্র , ১৮২৩ সালের ডায়েরি , "ছায়া" সংগঠন আর গোপন কক্ষ—সব রহস্য যেন এই ছোট্ট জিনিসটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ।

সেদিন রাতে আমরা বাড়িতে ফিরে এলাম ।ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা ।আমি ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়লাম ।

— অরিন্দম , তোমার কি সত্যিই মনে হয় গোপন কক্ষে কোনো গুপ্তধন আছে ?

অরিন্দম টেবিলের ওপর চাবিটা রেখে বলল —

— আমি ধনসম্পদে বিশ্বাস করি না , রুদ্র ।

— তাহলে ?

— ক্ষমতায় বিশ্বাস করি ।

— ক্ষমতা ?

— ইতিহাসের এমন অনেক সত্য আছে , যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের সম্মান , সম্পদ কিংবা পরিচয় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে ।

আমি চুপ করে গেলাম ।
তার মানে দুইশো বছর আগে এমন কিছু ঘটেছিল , যা কেউ এখনও পৃথিবীর সামনে আসতে দিতে চায় না ।ঠিক তখনই —

ট্রিং... ট্রিং...

ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল ।রাতের নীরবতায় শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে জোরে শোনাল ।

আমি ফোনটা ধরতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু অরিন্দম হাত তুলে থামিয়ে দিল ।

— দাঁড়াও ।

— কেন ?

— এই অসময়ে কে ফোন করবে ?‌ তুমি ফোনটা তোলো না‌ দাঁড়াও ।

কয়েক সেকেন্ড ফোনটা বাজতে থাকল ।তারপর অরিন্দম নিজেই রিসিভার তুলল ।

— হ্যালো ।

কোনো উত্তর নেই ।শুধু শোনা গেল ভারী শ্বাসের শব্দ ।অরিন্দম শান্ত গলায় বলল —

— আমি জানি ছায়া বলছো তো ?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ।তারপর একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল —

— তুমি বুদ্ধিমান , অরিন্দম সেন ।

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল ।অরিন্দম বলল —

—সত্যি কথা বলো তুমি কে? যে ছায়া সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছো ?

লোকটা হাসল । তার হাঁসিটা একদম ঠান্ডা, নিষ্ঠুর হাসি।

— আমি একজন মানুষ , যার বংশ দুইশো বছর ধরে একটা গোপন সত্য রক্ষা করে আসছে ।

— তুমি কি ছায়ার নেতা ?

— বেশি প্রশ্ন করো না । শুধু শুনে রাখো । নদিয়ার জমিদারবাড়িতে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বের করে দাও ।

অরিন্দমের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল ।

— তাহলে আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি ।


ওপাশের গলাটা হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল ।

— সেখানে গেলে তোমাদের নামও ,ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের তালিকায় যোগ হবে ।

এই কথা বলার পর ফোন কেটে গেল ।

আমি বললাম —

— এবার কি সত্যিই আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত ?

অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল —

— রুদ্র , মানুষ যখন তোমাকে কোনো জায়গায় যেতে এত বাধা দেয় , বুঝতে হবে সেখানেই উত্তর লুকিয়ে আছে ।

পরের দিন ভোরেই আমরা রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম ।অরিন্দম তার ব্যাগে রাখল —

পুরোনো লোহার চাবিটা ,
১৮২৩ সালের ডায়েরির অনুলিপি , টর্চ , ক্যামেরা এবং আরো কিছু জরুরি সরঞ্জাম ।


আমি জিজ্ঞেস করলাম —

— পুলিশকে জানানো উচিত নয় অরিন্দম ?

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল —

— ছায়ার প্রভাব কতদূর ছড়িয়ে আছে আমরা জানি না । ভুল লোককে বিশ্বাস করলে আমরা সত্যের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাব ।



পরদিন সকালে শহর ছেড়ে আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে গ্রামের রাস্তার দিকে এগোতে লাগল ।
যত আমরা নদিয়ার দিকে এগোচ্ছিলাম , ততই মনে হচ্ছিল আমরা যেন বর্তমান সময় ছেড়ে অতীতের দিকে চলে যাচ্ছি ।

কয়েক ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছালাম শিবপুর গ্রামে ।গ্রামে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল ।

আমাদের গাড়ি দেখেই কয়েকজন বৃদ্ধ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে শুরু করল ।যেন তারা জানে আমরা কোথায় যাচ্ছি ।

একজন বৃদ্ধ আমাদের কাছে এসে বললেন —

— আপনারা কি চৌধুরী বাড়ির খোঁজ করছেন ?

আমি অবাক হয়ে বললাম—

— হ্যাঁ ,আপনি কী করে বুঝলেন ?

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ।

— কারণ যারা বাইরের লোক এখানে আসে , তাদের মধ্যে বেশিরভাগের সেই জায়গার খোঁজ করেন ।

— আর যারা যায় তারা কি ফিরে আসে?

বৃদ্ধের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।

— কেউ কেউ ফিরে আসে...

— আর বাকিরা?

বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকালেন।

— তারা এখনও ওই বাড়িতেই আছে ।

তার কথায় আমার বুকের ভেতর হিমশীতল একটা অনুভূতি তৈরি হলো।কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না—

জমিদারবাড়ির দরজা খুললেই আমাদের সামনে আসবে এমন একটা সত্য, যা শুধু ১৮২৩ সালের রহস্য নয়, "ছায়া" সংগঠনের আসল মুখও প্রকাশ করবে।

চলবে...




❤️ গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করুন।
💬 কমেন্ট করে জানান—আপনার মতে "ছায়া" আসলে একজন মানুষ, নাকি একটি গোপন সংগঠন?
📌 ফলো করুন, কারণ পরবর্তী অংশে শুরু হবে জমিদারবাড়ির ভয়ংকর অনুসন্ধান।