*আমি অনির্বাণ। পুরোনো জিনিস কিনতে আমার খুব ভালো লাগে। গত মাসে শিয়ালদা ফুটপাত থেকে ২০ টাকা দিয়ে একটা ছেড়া ডায়েরি কিনলাম।ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা - “নাম: মালিনী, সাল: 1998”।কৌতূহল হল। পড়তে শুরু করলাম।“15ই জুলাই 1998 - আজ রাহুল আমাকে প্রপোজ করল। আমি হ্যাঁ বলেছি।” “20শে আগস্ট 1998 - মা বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে অন্য কারোর সাথে। আমি পালাব।” “1লা সেপ্টেম্বর 1998 - আজ রাতে আমরা পালাব। শেষবারের মতো ডায়েরিতে লিখছি।”এরপর আর কিছু লেখা নেই। শেষ পাতাটা ছেঁড়া।আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল। রাতে ঘুমোতে গিয়ে মনে হল কেউ আমার পাশে শুয়ে ফিসফিস করছে।পরদিন আবার ডায়েরিটা খুললাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড! নতুন লেখা উঠেছে শেষ পাতায়।“অনির্বাণ, তুমি আমার ডায়েরি পড়েছ। ধন্যবাদ। আমি মালিনী। 1998 সালে আমি পালাতে পারিনি। রাহুল আসেনি। মা আমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল। তারপর… আমি আর নেই।”আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। এটা কে লিখল?সেই রাতেই স্বপ্ন দেখলাম। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল। বলল, “আমার ডায়েরিটা রাহুলকে দিয়ে দাও। ওর ঠিকানা - 12/4, শ্যামবাজার।”ঘুম ভেঙে গেল। সারা গা ঘেমে গেছে।পরদিন আমি শ্যামবাজার গেলাম। 12/4 বাড়িটা খুঁজে পেলাম। দরজায় নেমপ্লেট - “রাহুল সেন”।বেল বাজালাম। একজন বয়স্ক লোক দরজা খুলল। বয়স 60 এর মতো।“আপনি?” - উনি জিজ্ঞেস করলেন।আমি ডায়েরিটা এগিয়ে দিলাম। “এটা মালিনীর। ও আপনাকে দিতে বলেছে।”লোকটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ওনার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।“মালিনী… তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?” - উনি ফিসফিস করে বললেন।“আপনি কি মালিনীকে চেন?” - আমি জিজ্ঞেস করলাম।উনি মাথা নাড়লেন। “চিনতাম। ও আমার হওয়ার কথা ছিল। 1998 সালে আমি আসতে পারিনি। একটা Accident এ আটকে গেছিলাম। পরে জানলাম, ও… ও আত্মহত্যা করেছে।”আমি আর দাঁড়ালাম না। বাড়ি ফিরে এলাম।সেই রাত থেকে আর কোনো স্বপ্ন দেখিনি। ডায়েরিটাও কোথায় হারিয়ে গেল।আজও মাঝে মাঝে মনে হয়, মালিনী কি শান্তি পেয়েছে ? রাহুল এর বাড়ি থেকে ফেরার পর এক সপ্তাহ কেটে গেল। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা ওখানেই শেষ।কিন্তু গতকাল রাতে আবার হল।রাত ৩টে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরের মধ্যে ঠান্ডা হাওয়া। আমার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা নিজে থেকেই খুলে গেল।আমি ভয়ে ভয়ে উঠে গেলাম। ডায়েরির পাতায় নতুন লেখা।“ধন্যবাদ অনির্বাণ। রাহুলের সাথে আমার শেষ দেখা হল। ও এখনও আমাকে মনে রেখেছে। আমি এবার শান্তিতে যেতে পারব।”আমি পিছন ফিরলাম। ঘরের কোণে সাদা শাড়ি পরা একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না।ছায়াটা হাত তুলে নমস্কার করল। তারপর জানলার দিকে এগিয়ে গেল। জানলাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে ঘর ভরে দিল। আর ছায়াটা মিলিয়ে গেল।পরদিন সকালে উঠে দেখি, ডায়েরিটা নেই। টেবিলের ওপর শুধু একটা শুকনো বেল ফুল পড়ে আছে।মালিনীর খুব প্রিয় ফুল ছিল বেল ফুল। ডায়েরিতে লেখা ছিল।আজ ১০ দিন হয়ে গেল। আর কিছু হয়নি। রাতে শান্তিতে ঘুমাই।মাঝে মাঝে মনে হয়, মালিনী বোধহয় সত্যিই শান্তি পেয়েছে।কখনও কখনও বেল ফুলের গন্ধ পাই। জানি না, এটা কি মালিনীর আসার সংকেত?আজ রাতে আবার জানলার দিকে তাকালাম। বাইরে জ্যোৎস্না। মনে হল দূর থেকে কেউ হাসছে। খুব হালকা, খুব মিষ্টি হাসি।আমি জানলাটা খুলে দিলাম। ঠান্ডা হাওয়ার সাথে বেল ফুলের গন্ধ ভেসে এল।আমি চোখ বন্ধ করে বললাম, "ভালো থেকো মালিনী।"উত্তর এল না। শুধু হাওয়াটা একটু জোরে বয়ে গেল।হয়তো এটাই ওর বিদায়। কাল থেকে আমি আবার নতুন ডায়েরি লেখা শুরু করব। আশা করি এইবার শান্তিতে থাকতে পারব। নতুন দিনের অপেক্ষায় রইলাম। আমি শান্তিতে থাকতে চাই। চির শান্তি কামনা।