“চির শান্তি কামনা করি” - এই শেষ কথাটা লেখার পর ডায়েরির কালি যেন নিজে থেকেই শুকিয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এত পুরোনো একটা ডায়েরি, তবুও কালি একদম টাটকা মনে হচ্ছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম, কালিটা এখনও একটু ভেজা।
ঘড়িতে তখন রাত ৩:০৭। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। শুধু আমি আর এই ডায়েরি জেগে আছে। দাদুর পুরোনো সিন্দুক থেকে ডায়েরিটা পেয়েছি তিনদিন আগে। প্রথম দুটো পাতা পড়ে কিছুই বুঝিনি। এলোমেলো লেখা, তারিখ নেই, নাম নেই। কিন্তু শেষ পাতায় এসে সব যেন বদলে গেল।
“চির শান্তি কামনা করি” - লেখাটার নিচে একটা ছোট্ট দাগ ছিল। মনে হল কেউ কলমটা শেষবারের মতো চেপে ধরেছিল। আমি ডায়েরিটা উল্টে আবার প্রথম থেকে পড়তে লাগলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, প্রথম পাতার লেখাগুলো এখন বদলে গেছে। আগে যেখানে “আজ খুব গরম” লেখা ছিল, সেখানে এখন লেখা “আজ খুব অন্ধকার”।
আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ঘরের টিউবলাইটটা হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠলো, তারপর আবার নিভে গেল। অন্ধকারে শুধু ডায়েরির হলুদ পাতাগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে।
আমি মোবাইলের টর্চ জ্বালাম। আলোটা ডায়েরির ওপর ফেলতেই দেখলাম, শেষ পাতায় নতুন করে কিছু লেখা উঠছে। কালি যেন মাটির ভেতর থেকে ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। অক্ষরগুলো কাঁপছে, টলছে।
প্রথমে লেখা উঠলো - “আমি”
তারপর - “আমি রাধা”
তারপর - “আমি ফিরে এসেছি”
আমি টর্চটা ফেলে দিলাম। হাত কাঁপছে এত জোরে যে টর্চটা গড়িয়ে খাটের নিচে চলে গেল। ঘর আবার অন্ধকার। কিন্তু ডায়েরিটা এখন নিজে থেকেই হালকা আলো দিচ্ছে। সেই আলোয় দেখলাম, ডায়েরির পাতা নিজে নিজে উল্টে যাচ্ছে। পেছনের দিক থেকে সামনের দিকে।
একটা হাওয়া এলো কোথা থেকে। জানলা বন্ধ, দরজা বন্ধ। তবুও হাওয়া। আর সেই হাওয়ার সঙ্গে একটা গন্ধ - পচা গোলাপ আর ভিজে মাটির গন্ধ। আমার ছোটবেলায় ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর ওনার ঘর থেকে ঠিক এইরকম গন্ধ পেতাম।
ডায়েরিটা খুলে গেল একদম মাঝখানে। একটা নতুন পাতা। সাদা ধবধবে পাতা। আর সেই পাতায় ধীরে ধীরে লেখা ফুটে উঠছে:
“১৫ই জুন, ১৯৭২
আজ আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওরা মানলো না। বললো, আমি নিচু জাত। ওর বাবা বললো, এই মেয়েকে ঘরে তুললে বংশ নষ্ট হয়ে যাবে।
রাত ৩:১৫-তে আমি পুকুরে ঝাঁপ দিলাম।
শেষ ইচ্ছা - চির শান্তি কামনা করি।
কিন্তু শান্তি পেলাম না।
কারণ আমার ডায়েরিটা কেউ ছুঁয়েছে।
আজ রাত ৩:১৫… আমি আসব।”
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। ৩:১২ বাজে। মাত্র তিন মিনিট বাকি।
হঠাৎ আয়নার দিকে চোখ গেল। অন্ধকার ঘরে আয়নাটা কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে। আর সেই ধোঁয়ার মধ্যে দেখলাম, আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শাড়ি। ভেজা চুল। মুখটা দেখা যাচ্ছে না, কারণ চুল দিয়ে ঢাকা।
আমি চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। শুধু ফ্যাঁসফ্যাঁস শব্দ হলো।
ডায়েরিটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আর বন্ধ হওয়ার সঙ্গে ঘরের টিউবলাইটটা জ্বলে উঠলো। চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলোয়। চোখ কচলে যখন আবার তাকালাম, আয়নায় কেউ নেই। ঘর ফাঁকা। শুধু ডায়েরিটা টেবিলের ওপর পড়ে আছে। বন্ধ।
আমি সাহস করে ডায়েরিটা আবার খুললাম। শেষ পাতায় এখন নতুন একটা লাইন লেখা আছে:
“৩:১৫ পেরিয়ে গেছে। তুই বেঁচে গেলি।
কিন্তু পরের অমাবস্যায় আবার আসব।
তদিন ডায়েরিটা আগলে রাখিস।
কারণ ওটা ছাড়া আমি যেতে পারব না।”
আমি ডায়েরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। হাত যেন আটকে গেছে। ডায়েরিটা গরম হয়ে আছে। পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।
বাইরে কাক ডাকছে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। আমি ডায়েরিটা বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখলাম। ঘুম আসবে না জানি। শুধু ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আজ ১৪ই জুন। কাল অমাবস্যা।
ডায়েরির ভেতর থেকে খুব আস্তে, খুব ক্ষীণ স্বরে কেউ যেন বললো -
“চির শান্তি… চির শান্তি…”