Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পুরোনো চাবির গল্প - 2

পাঁচ বছর কেটে গেছে। রায়বাড়ির সেই ভাঙা ঘরটা আর নেই। তার জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে “মালতী স্মৃতি স্বাস্থ্যকেন্দ্র”। সাদা রঙের ছোট্ট বিল্ডিং, সামনে একটা নিমগাছ, আর গেটের মাথায় লেখা - “সবার জন্য চিকিৎসা, টাকার জন্য না”।আমি এখন এখানকার জুনিয়র নার্স। সকাল ৭টায় ডিউটি শুরু হয়। প্রথম কাজটাই হলো রিসেপশনের টেবিলটা মুছে, তার ওপর রাখা সেই পুরোনো চাবিটা একবার হাতে নেওয়া।চাবিটায় এখনো মরচে পড়েনি। ঠাকুমা মারা যাওয়ার আগে যেমন চকচকে করে দিয়েছিল, তেমনই আছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি হেসে বলি, “এটা একটা মেয়ের স্বপ্নের চাবি। যে স্বপ্ন কোনোদিন মরে না।”মালতী দিদির কথা মনে পড়লে এখনো বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সেদিন রাতে যখন রায়বাড়ির মেঝেতে চাবিটা রেখে বলেছিলাম, “তোমার দরজাটা আমি খুলেছি”, তখন সত্যি একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল কেউ ফিসফিস করে বলল, “ধন্যবাদ।”পরদিন সকালে গ্রামের লোকজন জড়ো হলো রায়বাড়ির সামনে। সবাই বলল, রাতে নাকি মালতী দিদিকে স্বপ্নে দেখেছে। সাদা শাড়ি পরে, হাতে একটা চাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। বলেছে, “আমার কষ্ট শেষ। এবার গ্রামের মেয়েদের কষ্ট শেষ করো।”গ্রামের মোড়ল প্রথমে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু যখন দেখল, রায়বাড়ির ভেতর থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেছে, তখন সবাই চুপ করে গেল।ডায়েরিটা ছিল মালতী দিদির। তাতে লেখা ছিল কীভাবে জমিদারের ছেলে তাকে ফাঁসিয়েছিল, কীভাবে বিয়ের লোভ দেখিয়ে সর্বনাশ করেছিল, আর কীভাবে সেই লজ্জায় সে আত্মহত্যা করেছিল। শেষ পাতায় লেখা ছিল, “আমি মরে গেলেও আমার স্বপ্নটা মরবে না। একদিন এই বাড়িতে গরিব মেয়েদের চিকিৎসা হবে।”ডায়েরিটা পড়ে গ্রামের লোকের চোখ খুলে গেল। রায়বাড়ির বর্তমান মালিক, জমিদারের নাতি শুভঙ্কর বাবু, নিজেই এগিয়ে এলেন। বললেন, “এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এই বাড়ি আমি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানিয়ে দেব।”আমার ঠাকুমা তখনো বেঁচে ছিল। সে শুভঙ্কর বাবুকে বলেছিল, “শুধু বিল্ডিং বানালেই হবে না। এখানে কাজ করতে হবে এমন মেয়েদের, যারা মালতীর মতো স্বপ্ন দেখে।”তাই হলো। শুভঙ্কর বাবু টাকা দিলেন, গ্রামের লোকজন খাটল, আর আমি নার্সিং পড়তে চলে গেলাম শহরে। ঠাকুমা বলেছিল, “তুই ফিরে আসবি তো?” আমি বলেছিলাম, “ফিরব ঠাকুমা। মালতী দিদির চাবিটা নিয়ে ফিরব।”আজ আমি ফিরেছি। আর আমার সঙ্গে ফিরেছে আরও পাঁচটা মেয়ে। সবাই গ্রামের। সবাই নার্সিং পড়েছে স্কলারশিপ নিয়ে।গত মাসে একটা ঘটনা ঘটল। রাত ২টোর সময় একটা গর্ভবতী মেয়েকে নিয়ে এলো তার শাশুড়ি। মেয়েটার অবস্থা খুব খারাপ। পয়সা নেই, হাসপাতালে নেওয়ার গাড়ি নেই।আমি আর ডাক্তার দিদি সারা রাত জেগে ডেলিভারি করালাম। ভোরবেলা যখন ফুটফুটে একটা মেয়ে হলো, তখন মেয়েটার শাশুড়ি আমার পা জড়িয়ে কাঁদল। বলল, “মা গো, তোমরা না থাকলে আমার বউ-নাতনি দুজনেই মরে যেত।”আমি শুধু হাসলাম। রিসেপশনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, পুরোনো চাবিটা যেন একটু বেশি চকচক করছে।মাঝে মাঝে রাতে ডিউটি শেষে আমি একা রায়বাড়ির পুরোনো অংশটায় যাই। যেখানে মালতী দিদি থাকত। এখন সেটা স্টোর রুম। ভাঙা আসবাবপত্র, পুরোনো খাট, আর এক কোণে মালতী দিদির ছবি।ঠাকুমা মারা যাওয়ার আগে ছবিটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, “এটা টাঙিয়ে রাখিস। মালতী দেখুক, তার স্বপ্নটা বেঁচে আছে।”গতকাল রাতে ছবির দিকে তাকিয়ে বললাম, “মালতী দিদি, আজ ২০টা ডেলিভারি হলো এখানে। সব মেয়ে সুস্থ আছে। তোমার চাবি দিয়ে আমরা অনেক দরজা খুলেছি।”বিশ্বাস করো, সেদিনও একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। আর মনে হলো, কেউ বলছে, “আমি শান্তি পেয়েছি।”শুভঙ্কর বাবু গত সপ্তাহে এসেছিলেন। বললেন, “এবার আমরা একটা বড় হাসপাতাল বানাব। পাশের তিনটে গ্রামকেও কভার করবে।”আমি বললাম, “নাম কী দেবেন?”তিনি হেসে বললেন, “নাম তো আগেই ঠিক হয়ে আছে। মালতী স্মৃতি হাসপাতাল।”আজ সকালে রিসেপশনের টেবিল মুছতে মুছতে ভাবছিলাম, একটা পুরোনো চাবি কত কিছু বদলে দিতে পারে। একটা মেয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন, একটা গ্রামের লজ্জা, আর একটা পরিবারের পাপ - সব ধুয়ে মুছে দিল এই ছোট্ট চাবি।ঠাকুমা ঠিকই বলত, “প্রতিটা পুরোনো জিনিসের পেছনে একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা খুঁজে বের করাই আসল কাজ।”আমি গল্পটা খুঁজে পেয়েছি। আর এখন, আমি নিজেও একটা গল্পের অংশ হয়ে গেছি।সন্ধ্যাবেলা ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার সময় গেটের বাইরে দেখি, ছোট্ট একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা ময়লা পুতুল। আমাকে দেখে বলল, “দিদি, আমিও নার্স হব। মালতী দিদির মতো।”আমি হাঁটু গেড়ে বসে ওর হাত ধরলাম। পকেট থেকে পুরোনো চাবিটা বের করে ওর হাতে দিলাম এক মুহূর্তের জন্য। বললাম, “এই নাও। এটা স্বপ্নের চাবি। তুমি যে দরজাটা খুলতে চাও, সেটা খুলে ফেলো।”মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠল। চাবিটা হাতে নিয়ে বলল, “আমি পারব তো দিদি?”আমি মালতী দিদির ছবির দিকে তাকালাম। তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “পারবে। কারণ যে স্বপ্ন কোনোদিন মরে না, সেটা একদিন না একদিন ঠিক পূর্ণ হয়।”চাবিটা আবার টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। কাল আবার কেউ জিজ্ঞেস করবে, “এটা কিসের চাবি?”আমি আবার বলব, “এটা একটা মেয়ের স্বপ্নের চাবি। যে স্বপ্ন কোনোদিন মরে না।”