~প্রিয় ডিম পাড়া মুরগি ঐশী~
প্রথমেই তোমাকে জানাই আমার অপরিসীম ভালোবাসা — সেই মিষ্টি, একটু নীচু স্বরে বলা 'প্রিয় ডিমপাড়া মুরগি'—এই নামেই তোমাকে ভেবেই হৃদয়টা মোর হাসে। আমার চিঠি গ্রহণ করার জন্য অসীম ধন্যবাদ। বহুদিন ধরে তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা খুলে বলার সাহস জমাতে চেষ্টা করেছি; ভয়, লজ্জা, আর তোমার কাছে অপমানিত হওয়ার সম্ভাবনা—এসবের মাঝেই আজ কাগজপত্রে সব ছাপিয়ে রেখে বসেছি লিখতে, কারণ তুমি জানো — ভালোবাসা কখনও চুপচাপই বেড়ে ওঠে না, তাকে উচ্চস্বরে গান করে ঘোষণা করতেই হয়।
প্রথমবার তোমায় দেখাইলে আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল; সেই কেঁপুনি ছিল এতটাই তীব্র যে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ- মায়ানমারের অর্ধেকটা কেঁপে উঠল—লোকেরা বলল ভূমিকম্প, আমি জানতাম এটা আমার হৃদয়েরই ঝড়। ঐ দিন থেকেই তুমি আমার হৃদয়ের অচেনা ম্যাপ: যখন পথ হারাই, তুমি আমার গুগল ম্যাপ; তুমি ছাড়া আমি বিশ্রামহীন এক আবর্তে ভাসি। তুমি আমার ডেস্টিনেশন — প্রতিটি পদক্ষেপ তোমার দিকে টানতেছে।
তুমি আমার আলু—সকল তরকারিতেই মানানসই, কখনো তাকত, কখনো মিষ্টি; তুমি আমার চাগুন—একদিনও না পেলে মাথা-চলছে না; তুমি আমার জীবনের ওয়াইফাই—তুমি না থাকলে আমার কানেকশন কেটে যায়, আমার মন লোডশেডিং-এ চলে যায়। তুমি আমার নীরব হাওয়া, আমার বিকেলের চায়ের কাপ, তোমার হাসি যখন ফোটে তখন চারপাশ ফুলে ওঠে; তোমার রাগ যখন আসে, আমি তার ভেতরকেই মিষ্টি নাচ দেখতেছি।
তুমি যদি কখনো পৃথিবীটা উল্টো করে দাও—সব উচিত উল্টে মাথায় দাঁড়ায়—আমি প্রথম তোমার হাত ধরব। তোমার হাত ধরলেই আমার জগত ঠিক হয়ে যায়; তোমার হাতে আছে একরকম জাদু, যা স্তব্ধ হৃদয়কেও আবার গান গাইতে শেখায়। তুমি আমার সাহস, তুমি আমার বোকামি, তুমি আমার প্রতিদিনের ছোট্ট নাচনীর মতো, যে সব অযথা মুহূর্তকেও আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
আমি হয়তো আজব, মাঝে মাঝে পাগল, আর অহরহ নিজের জন্য লজ্জা পেয়েও তোমার কাছে বার বার ফিরে আসি—কারণ তুমি আমার ভবিষ্যত, আমার পরিকল্পনা, আমার অসংখ্য দিন এবং রাত। তোমার জন্য আমি আইনস্টাইন হতাম যদি গণিত শিখতে পারতাম; কিন্তু তোমার জন্যই সমস্ত নোবেল আমার পকেটে ভরে রাখতাম — তোমার হাসির বদলে সেগুলোও কম বোধহয়।
অতি মধুর ভালোবাসা দিয়ে এই চিঠি শেষ করছি — আশা করি তুমি আমার অদ্ভুত কথাগুলো কষ্ট করে না নেবে; বরং হাসবে, লাজুক হয়ে যাবে, আর একটু ঘুরে এসে আমার দিকে চকচক করে তাকাবে।
ইতি,
তোমার আজব, কিছুটা পাগল তোমার হবু বড়।
ঐশীর হাতে সেই চিঠি সে ধীরে ধীরে খুলল, কিন্তু প্রথম লাইন পড়তেই চোখ বড় হয়ে গেল, মুখ লাল না হয়ে বরং ভ্রু কুঁচকে রেগে উঠল। হঠাৎ চিৎকার করে বলল: “আমি আবার কবে থেকে ডিম পাড়ে শুরু করলাম!”
চিঠির প্রতিটি লাইন যেন তার ধৈর্য পরীক্ষা করছে। “তুমি আমার আলু, তুমি আমার চা, তুমি আমার Wi-Fi”—এগুলো পড়ে সে মনে মনে ভাবছে, “এই কি ছেলেটার জন্য আমার সময় নষ্ট করা হলো? আমি কি এটা চাইছি?”। হাত অজান্তেই কাঁপছে, চোখে রাগের ঝলক। বুকের ভিতরে চাপ, আর মনে মনে সে লাজুক না হয়ে একেবারে বিরক্ত।
লাইবা পাশ থেকে হেসে ফেলল। চোখ চকচক করছে, আর ছোট্ট ঠোঁট কামড়ে বলে:
“ওরে বাবা! ঐশী, দেখছো না! তোমার প্রেমিক কি আজব চিঠি লিখেছে!”
ঐশী চোখ ঘষে বলল,
“হেসো না! আমি এটা পড়তেই চাই না!”
তবুও লাইবা থামল না। চিঠির লাইনগুলো বারবার পড়ে, খুনসুটি করে, আর হাসি ফোটাচ্ছে—“ওহ, দেখ! Wi-Fi! তোমাকে বেঁধে রাখবে!”
রাইশা dramatic pose নিয়ে চিঠি ধরে বলল:
“ওমায় গড! Wi-Fi, আলু, চা—ঐশী, তুমি কি এটা শুনছো না? প্রেমের মহাকাব্য!”
ঐশী চোখ বড় করে চিৎকার করল:
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বোঝেছি! এবার থামাও!”
নৌরিন তো একেবারে পাগল। চিঠি হাতে নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বলল:
“ওরে বাবা! ঐশী, তুমি Wi-Fi, আর আমরা তোমার subscribers! কানেকশন না পেলে blame আমাদের!”
ঐশী রেগে মুখ লাল করে চিৎকার করল:
“বেরিয়ে যাও! আমি বিরক্ত!”
তিন বন্ধু একসাথে হেসে খুনসুটি করছে। লাইবা ঠেলা মারছে, রাইশা dramatic pose নিয়ে চিঠি হাতে ঘুরছে, আর নৌরিন লাফিয়ে লাফিয়ে ঐশীর গালে হালকা ঠেলা মারছে। ঐশী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে রাগ, মুখ লাল, ভ্রু কুঁচকে, ভিতরে ভাবছে—“এই চারজন আমাকে পুরো পাগল করে দিচ্ছে।”
তখন লাইবা হঠাৎ চিৎকার করে বলল:
“ঐশী! তুমি কি ভাবছো? ও বলেছে তুমি তার চা, আলু আর Wi-Fi! হা হা হা!”
রাইশা dramatic ভাবে হাত নেড়ে বলল:
“এই তো পুরো নাটক! ঐশী, তুমি কি মনে করছো তোমার প্রেমিকের কল্পনা সীমাবদ্ধ?”
নৌরিন লাফিয়ে উঠল আর বলল:
“দেখছো? তোমার কানেকশন এখন পুরো স্কুলে রেকর্ড হচ্ছে!”
ঐশী চুপচাপ ব্যাগে চিঠি ঢুকিয়ে চিৎকার করল:
“আমি আর এটা পড়ব না! কেউ কাছে এলে—আমি চিৎকার করব!”
তিন বন্ধু তখন আরও বেশি খুনসুটি করছে। তাদের ঠেলা, লাফ, চিৎকার আর খিলখিল হাসি পুরো বারান্দাকে ঘিরে ফেলেছে। ঐশীর চোখে রাগ, মুখ লাল, ভ্রু কুঁচকে, কিন্তু ভেতরে ভিতরে সে হালকা হতাশায় হাসি গোপন করছে—যা কোনোভাবেই বন্ধ করা যায় না। পুরো দৃশ্য একেবারে ফানি, exaggeration আর নাটকীয়তার পিক পয়েন্টে পৌঁছেছে।
শেষে ঐশী মাথা ঝোঁকিয়ে বলে,
“এই তিনজন আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। আর কখনো এই চিঠি নিয়ে খুনসুটি দেখতে চাই না!”
তিন বন্ধু হেসে ফেলল, ঠেলা মারল, আর খুনসুটি চালিয়ে গেল—এবং ঐশীর বিরক্তি তাদের মজার জন্য perfect fuel হয়ে উঠল। পুরো বারান্দা এখন এক ফানি, হাস্যকর আর নাটকীয় অবস্থা।তারা এখন স্কুলের মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘণ্টা শেষ হওয়ার সাথে সাথে চারপাশে ভিড় জমে গেছে, সবাই যার যার গন্তব্যের দিকে ছুটছে। ঠিক তখনই চকচকে কালো রঙের চৌধুরী বাড়ির গাড়ি এসে ধীরে ধীরে ঐশী, লাইবা আর রাইশার সামনে থামল।
ড্রাইভার নেমে দরজা খুলতেই নৌরিন ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে বলল—
“আচ্ছা, তাহলে কাল দেখা হবে। আজ তোমরা আবার রাজকীয় ভঙ্গিতে বাড়ি যাচ্ছো!”
ঐশী হেসে বলল,
“আরে নৌরিন, তুইও একদিন আমাদের সাথেই উঠবি, শুধু একটু প্র্যাকটিস করা লাগবে রাজকীয় স্টাইলে হাঁটা-চলার।”
লাইবা দুষ্টুমি করে যোগ করল,
“হ্যাঁ, বিশেষ করে মাথা উঁচু করে এমনভাবে, যেন চারপাশের বাতাসও আমাদের অনুমতি নিয়ে আসে।”
রাইশা হেসে হাত নাড়ল,
“চল, পরশু দেখা হবে। পরীক্ষা আছে ভুলবি না আবার!”
নৌরিন মজা করে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল,
“হুহ, তোমাদের মতো বইয়ের দুনিয়ার রাজকন্যা না আমি। পরশু তাহলে আবার স্কুলে দেখা হবে।”
তিনজন একসাথে তাকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠল। দরজা বন্ধ হতেই গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল চৌধুরী বাড়ির দিকে। জানালার বাইরে দিয়ে নৌরিনকে হাত নেড়ে তারা বিদায় জানাল, আর নৌরিন দাঁড়িয়ে থাকল গেটের সামনে, ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে।
গাড়ির ভেতরে বসে ঐশীরা গল্পে মেতে উঠল, আর চারপাশের ভিড় ক্রমশ মিলিয়ে গেল দূরে।
গাড়ি চৌধুরী বাড়ির বড়ো ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত সেই রাজকীয় পরিবেশ চোখে পড়ল। বিশাল উঠান, সারি সারি ফুলের টব, আর চারপাশে ছায়াঘেরা গাছপালা। তিনজনই নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। ঐশী দের বাড়ি থেকে লাইবা আর রাইশা দের বাড়ি ২ কি ৩ মিনিটের।
ঐশী ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে টানটান গলায় বলল,
“উফফ! অবশেষে বাড়ি এসে শান্তি পেলাম। আজ স্কুলটা না, মাথাই খারাপ করে দিল।”
লাইবা হাঁফ ছেড়ে বলল,
“ঠিকই বলেছিস। পরীক্ষা হলে টিচারের সেই লম্বা লেকচার! মনে হচ্ছিল আর সহ্য হবে না।”
রাইশা মুচকি হেসে দুষ্টুমি করে বলল,
“কিন্তু ঐশী, তোর তো বেশ মজা হচ্ছিল। লেকচারের মাঝেই তুই বারবার চুপিচুপি জানালার বাইরে তাকাচ্ছিলি। বল তো, কাকে খুঁজছিলি?”
ঐশীর মুখ সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে গেল। সে রাগী ভঙ্গিতে ব্যাগটা জোরে ঝুলিয়ে বলল,
“চুপ কর, বকবকানি বন্ধ করবি? আমি কারো দিকে তাকাচ্ছিলাম না।”
লাইবা আর রাইশা একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।
Happy Reading ☺
To be continue😅