চৌধুরী বাড়ির বিশাল প্রাসাদে সন্ধ্যার আবহ যেন অন্যরকম। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবতেই চারপাশ ঘন অন্ধকারে ভরে গেল। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে উঠোন, ছাদ, টিনের চাল সব যেন সুরে সুরে বাজছে। ভারী মেঘের ভেতর দিয়ে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি এসে মুহূর্তে বাড়িটাকে আলোকিত করে তোলে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়।
এক এক করে বাড়ির পুরুষেরা ফিরতে শুরু করেছে—ভেজা জামা, কাদায় মাখামাখি প্যান্ট, আর চুল থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। কারও হাতে ছাতা, কারও হাতে বাজারের ব্যাগ। ছোট বড় সবাইকে একসাথে দেখলে মনে হয় নদী ভাঙা মানুষরা আশ্রয় পেয়েছে বড় এক গৃহে। তবুও তাদের চোখে-মুখে ঘরের উষ্ণতার এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সবাই আসন গ্রহণ করেছে। ভেজা জামা গায়ে গন্ধ ছড়াচ্ছে, তবু কারও চোখে বিরক্তি নেই—কারণ টেবিলে খাবারের টানেই যেন সব ক্লান্তি ভুলে যাচ্ছে। কেবল ঐশী অনুপস্থিত। সে এখন নিজের ঘরের বারান্দায় এক ধারে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটায় আঁকা স্বপ্ন দেখছে। কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গেছে সে, যেন এই বৃষ্টি তার কানে গোপন কোনো গান শোনাচ্ছে।
অন্যদিকে বাড়ির মহিলারা রান্নাঘরে ব্যস্ত। চুলার আগুনে বারবার শোঁ শোঁ করে বাষ্প উঠছে। বড় বড় পাতিলে ফুটছে গরম গরম খিচুড়ি—হলুদ-লঙ্কার গন্ধে রান্নাঘর মাতোয়ারা। পাশে ইলিশ মাছ তেলে ভাজা হচ্ছে—“চ্যাঁচচ্যাঁচ” শব্দে গোটা ঘর ভরে উঠছে সোনালি ভাজা মাছের সুগন্ধে। তার সঙ্গে বেগুন ভাজা, আলু ভাজা আর গোল গোল ডিম ভাজা, সবই সাজানো হচ্ছে।
এর আগেই নীলিমা চৌধুরী হাতে ট্রে করে চা আর কাগজে মোড়ানো পকোড়া দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই টেবিলে বসেই সবার গল্প জমে উঠেছে। কেউ অফিসের ঝামেলার কথা বলছে, কেউ বৃষ্টির ভোগান্তির কথা, কেউ আবার মজা করে ছোটদের খোঁচা দিচ্ছে। হাসাহাসি, খাওয়া-দাওয়া আর বৃষ্টির শব্দ মিলে চৌধুরী বাড়ির সন্ধ্যা যেন উৎসবে ভরে উঠেছে।
ঐশী যদিও এখনও কল্পনার জগতে, সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির স্পর্শ নিতে নিতে শুধু হেসে ওঠে। তার মনে হয়—এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে অমূল্য সময়। সে চোখ বন্ধ করে।হঠাৎই মনে হয়— প্রতিটি বৃষ্টিকণা যেন সেই অচেনা যুবকের রূপ ধারণ করছে। কোথাও বাইকের শব্দ কানে বাজে, কোথাও ভিজে চুলে গড়িয়ে পড়া পানির রেখা যেন ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। মনে পড়ে সকালের সেই দৃশ্য— স্কুল গেটের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা নিজেকে, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে।
ঐশীর মন হঠাৎই অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে ডুবে যায়।
সে ভাবে—
“কে এই ছেলে? কেন তার উপস্থিতি এত বড় করে মনে গেঁথে গেল? আমি তো চিনি না… অথচ মনে হচ্ছে অনেক আপন। যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতোই স্বাভাবিক, অথচ প্রতিটি ফোঁটা আলাদা করে আমার কাছে গল্প লিখে দিচ্ছে।”
তার চারপাশে যেন বৃষ্টির স্রোত নয়, বরং সেই যুবকের উপস্থিতি ঘিরে ধরেছে। মেঘের গর্জনেও সে শুনতে পায় কালো বাইকের শব্দ। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া ফোঁটাগুলোকে সে অনুভব করে— যেন ছেলেটির হাতের স্পর্শ, ছেলেটির চোখের দৃষ্টি।
চৌধুরী বাড়ির ভেতরে সবাই ব্যস্ত, কিন্তু ঐশীর মন একেবারে দূরে।
তার কল্পনার ভেতরে এক ভিন্ন জগৎ তৈরি হয়েছে। সেখানে শুধু বৃষ্টি, কালো বাইক, আর সেই রহস্যময় ছেলেটা। মনে হয়— ছেলেটা একবার যদি এসে দাঁড়াত এই জানালার নিচে, ভিজে কাপড়ে, রাগী চোখে— তবে হয়তো পুরো পৃথিবীটাই বদলে যেত ঐশীর কাছে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“এটা কি শুধুই কল্পনা? নাকি সত্যিই কিছু ঘটতে চলেছে?”
বাইরে বৃষ্টি আরো জোরে নেমে আসে।
আর ঐশীর মনে হয়— প্রতিটি ফোঁটার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অচেনা গল্প, যে গল্প তার জীবনকে এক নতুন পথে নিয়ে যাবে। হঠাৎ করেই ঐশীর চোখ থমকে গেল। রাস্তার ধারে উঁচু একটা ল্যাম্পপোস্ট থেকে ঝরে পড়া সোডিয়াম লাইটের হলুদ আভায় চারপাশটা যেন ভিন্ন জগতে রূপ নিয়েছে। চারিদিক অন্ধকারে ডুবে থাকলেও ওই আলোটা ঠিক যেন একাকী কোনো মঞ্চের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেই মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। অচেনা অথচ ভীষণ পরিচিত লাগছে তাকে।
ছেলেটার চোখ যেন সরাসরি ঐশীর দিকে নিবদ্ধ। ঐশী প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু মুহূর্তের ভেতরেই বুঝলো—না, এ চোখ ফাঁকি দেয় না। ঐ দৃষ্টি যেন হাজারো অজানা প্রশ্নে ভরা, আবার অদ্ভুত এক টানও আছে। দুজনের দৃষ্টি ঠিক যেভাবে মিললো, চারপাশের সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গেল। দূরে কোনো কুকুর ডাকছে, বৃষ্টির পানিতে রাস্তার জমে থাকা জল চকচক করছে, গাড়ির হর্ন ভেসে আসছে—কিন্তু ঐশী কিছুই আর শুনতে বা দেখতে পাচ্ছে না। শুধু সেই চোখ।
ঐশীর বুকের ভেতর হঠাৎ করে অদ্ভুত এক ধাক্কা লাগলো। মনে হলো কেউ বুকের ভেতরে ঢোল বাজাচ্ছে, প্রতিটা শব্দ যেন কানে নয়, সরাসরি রক্তে গিয়ে আঘাত করছে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে। যেন পুরো শরীরের রক্ত একসাথে দৌড়ে গিয়ে বুকের ভেতরে জমাট বাঁধছে।
শিরদাঁড়া বরাবর একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল, যেন কারও বরফের হাত আলতো ছুঁয়ে দিয়ে গেল তাকে। ঐশীর মনে হলো সময় থেমে গেছে। মুহূর্তের ভেতরে মনের ভেতর কত স্মৃতি, কত অদেখা ছবি উঁকি দিতে শুরু করলো। ছেলেটার ভেজা চুল কপালে লেগে আছে, চোখদুটো অদ্ভুত রকমের তীক্ষ্ণ অথচ কোমল। আলো-ছায়ার খেলায় তার মুখমণ্ডলটা যেন স্বপ্নের মতো ঝলমল করছে।
ঐশী চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইলেও পারছে না। যতক্ষণ দৃষ্টি মিলিয়ে থাকছে, ততক্ষণ মনে হচ্ছে ওর বুকের ভেতরটা কেউ উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে। সে বোঝে না কেন এই অনুভূতি, বোঝে না কেন একজন অপরিচিত এতটা কাছের মনে হচ্ছে। অথচ অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছে, এ ছেলেটাকে সে আগে কোথাও দেখেছে। হয়তো কোনো স্বপ্নে, হয়তো কোনো অচেনা কল্পনায়।
হাওয়ার হালকা ঝাপটায় ঐশীর ওড়না কেঁপে উঠলো, আর একই সঙ্গে ছেলেটার চোখে এক মৃদু ঝিলিক ফুটে উঠলো—যেন সে-ও বুঝতে পারলো এই অদ্ভুত সংযোগ। ঐশীর কান লাল হয়ে গেছে, হাত কাঁপছে, গলা শুকিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যদি আর এক মুহূর্তও তাকিয়ে থাকে, তবে তার ভেতরের সব গোপন কথা চোখ দিয়েই বেরিয়ে পড়বে।
আলো-আঁধারির সেই ছোট্ট গণ্ডির ভেতর, সোডিয়াম লাইটের ম্লান আভায়, দুই জোড়া চোখের এই নীরব কথোপকথনই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আওয়াজ হয়ে উঠলো ঐশীর ভেতরে। বৃষ্টি এখন একেবারে ঝমঝমিয়ে পড়ছে। চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে ফোঁটার শব্দ। ঐশী ভিজে জবুথুবু অবস্থায় বাইরে এসে দাঁড়াতেই ছেলেটার চোখ রাগে জ্বলে উঠলো। মুখটা ভিজে চুলে ঢাকা, কিন্তু সেই ভেজা চোখদুটোতে এখন শুধু আগুন।
সে দ্রুত এগিয়ে এসে ঝট করে ঐশীর বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো। এতটাই শক্ত যে ঐশীর মনে হলো, তার শিরা-উপশিরা যেন থেমে গেছে।
—“তুমি কি একদমই বুঝো না?!” ছেলেটার গলা বজ্রের মতো কাঁপলো।
—“কে বলেছে তোমাকে বাইরে আসতে? বলো তো—কে বলেছে?! ভিজে একেবারে অসুস্থ হয়ে যাবে তুমি! এত অবুঝ হলে কিভাবে?”
রাগ এতটাই তীব্র যে, যেন তার ভেতরের সব দমিয়ে রাখা আবেগ একসাথে ফেটে বেরিয়ে আসছে। বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার চোখ বেয়ে, তবু বোঝা যাচ্ছে চোখগুলো লাল হয়ে উঠেছে।
সে আরও ঝুঁকে এসে চাপা গলায়, কিন্তু আরও প্রবল রাগে বললো—
—“তুমি কি ভাবছো এটা কোনো খেলা? বাইরে বৃষ্টি নামছে, ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, আর তুমি দাঁড়িয়ে ভিজে যাচ্ছো! শরীরটা একবার অসুস্থ হলে জানো কেমন কষ্ট হবে? তুমি কি একবারও ভেবেছো সেটা, তুমি এতো কেয়ার লেস কিভাবে হতে পাড়ো?”
ঐশী থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সে এতটা রাগ আগে কখনো কারও চোখে দেখেনি—যেন পুরো পৃথিবীটা থেমে গেছে এই মুহূর্তে। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।
ছেলেটার হাতের চাপ আরও বাড়লো, তার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছিল রাগে—
—“আমি বলছি এক্ষুনি ভেতরে যাও! না হলে… আমি সত্যিই নিজেকে সামলাতে পারব না।”
রাগের তীব্রতায় ঐশীর বুকের ভেতর হঠাৎ শিরশির করে উঠলো, আবার একইসাথে মনে হলো এই রাগের আড়ালেই যেন সবচেয়ে বড় যত্ন লুকিয়ে আছে। চারপাশে অন্ধকার,সোডিয়াম লাইটের হলুদ আভায় সবকিছু অদ্ভুত স্বপ্নময় লাগছে। ঐশী ভিজে একেবারে কাঁপছে, ভেজা ওড়না গা থেকে সরে গেছে, চুলগুলো কপালে লেগে আছে। তার সাদা গালে লাল আভা ফুটে উঠেছে, ঠোঁটও ভিজে কাঁপছে—তিরতির করে, যেন ঠাণ্ডা আর ভেতরের অজানা অনুভূতির লড়াই চলছে শরীরের ভেতরে।
আযলান ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে, কিন্তু হঠাৎই তার দৃষ্টি আটকে গেল ঐশীর লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটে। সেই কাঁপা ঠোঁট যেন তাকে টেনে নিচ্ছে, যেন পুরো পৃথিবীটা মিলিয়ে গিয়ে একমাত্র ঐশীই সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির শব্দ, হাওয়ার শিস, গাড়ির হর্ন—সবকিছু মুহূর্তেই হারিয়ে গেল তার কাছে।
আযলানের চোখে তখন আগুন—রাগ, উন্মাদনা, আর দমিয়ে রাখা অনুভূতির বিস্ফোরণ।ঐশী বুঝে ওঠার আগেই আযলান আকস্মিক এক ঝড়ের মতো এগিয়ে এলো।এক ঝটকায় সে ঐশীকে নিজের কাছে টেনে নিলো। ঐশীর ভেজা শরীর ধাক্কা খেয়ে তার প্রশান্ত বুকে এসে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যে আযলানের ঠোঁট ঝড়ের মতো ভেঙে পড়লো ঐশীর ঠোঁটের উপর।
এটা ছিল না কোনো নরম স্পর্শ—এটা ছিল বেপরোয়া দাবি, উন্মাদ আবেগ। তার ঠোঁট আছড়ে পড়ছে ঐশীর কাঁপা ঠোঁটের উপর, বারবার, নির্দয় অথচ তীব্র। ঐশী স্তব্ধ হয়ে গেল। শ্বাস নিতে ভুলে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে উঠলো, হাতদুটো বাতাসে অস্থিরভাবে কেঁপে উঠলো, যেন মুক্তি চাইছে অথচ পারছে না।
আযলান থামলো না। বৃষ্টির মতোই সে উছলে উঠলো। তার ঠোঁটের স্পর্শ কখনও কামড়ে ধরা, কখনও ভিজে উষ্ণতায় ডুবিয়ে দেওয়া। মনে হচ্ছিল, সে যুদ্ধ করছে—ঐশীর ঠোঁটের সঙ্গে, তার স্তব্ধতার সঙ্গে, এমনকি পৃথিবীর সঙ্গেও।
ঐশীর মনে হলো, শিরদাঁড়া বেয়ে আগুন আর বরফ একসাথে নেমে যাচ্ছে। শরীর কাঁপছে, ঠোঁট তিরতির করছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করতে পারছে না। বুকের ভেতর ঝড় বইছে, তবুও তার শরীর পুরোপুরি স্তব্ধ।
আযলানের হাত এবার ঐশীর ভিজে গাল বেয়ে নামলো, জোরে তার মুখের কোণ চেপে ধরলো যেন তাকে আর এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়বে না। তার চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস উষ্ণ, ঠোঁটের স্পর্শে একরাশ বেপরোয়া উন্মাদনা।
এটা কোনো সাধারণ চুম্বন নয়—এটা ছিল এক ঝড়, যেখানে আযলান সব নিয়ম ভেঙে দিয়ে ঐশীকে ডুবিয়ে দিতে চাইছে।
আর ঐশী?
সে পুরোপুরি স্তব্ধ। শরীর জমে গেছে, চোখে আতঙ্ক আর অদ্ভুত শিহরণ একসাথে খেলে যাচ্ছে। ঠোঁট নড়াতে চাইছে, কিন্তু আযলানের বেপরোয়া তীব্রতা তাকে বন্দী করে রেখেছে।আযলান ঐশীর ঠোঁট ছেড়ে দেয়। আযলানের চোখ দুটো রাগে ঝলমল করছে। কপালের রগ ফেটে বেরিয়ে আসছে যেন মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হবে। ভেজা জামা শরীরে লেপ্টে আছে, আর ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা—তার ভেতরের ঝড় যেন বৃষ্টির ঝড়কেও হার মানাচ্ছে।
Happy Reading ☺
To be continue😅