Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 12

আযলান ঐশীর ঠোঁট ছেড়ে দিলো, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি এক বিন্দুও নড়লো না। সেই দৃষ্টি এতটাই তীব্র, যেন আগুনের শিখা ভেদ করে বেরোচ্ছে, অথচ ভেতরে লুকিয়ে আছে অসহনীয় এক ব্যথা। যেন সে হাজারো ঝড় থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেবল ঐশীর দিকে তাকিয়ে।


ঐশী শ্বাস নিতে গিয়ে কেঁপে উঠলো। বুকটা ভারী পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেছে যেন। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে, শরীরও কাঁপছে—কিন্তু সেটা বৃষ্টির ঠাণ্ডায় নয়, বরং আযলানের বেপরোয়া, অনিয়ন্ত্রিত আআচরণে কারণে। 


এক মুহূর্তের জন্য সে যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চারপাশ থেমে আছে, শুধু বৃষ্টির ফোঁটা দু’জনের গায়ে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু যখন আযলানের চোখ আবার তাঁর ঠোঁটে নেমে এলো, তখনই ঐশী ভয়ে আর অস্থিরতায় পিছিয়ে গেল—এক ঝটকায়।


—“কি… কি করছেন আপনি?” ঐশীর গলা কাঁপছিল।

শব্দ যেন বুক থেকে বেরোতে চাইছে না, অথচ বাধ্য হয়ে বেরিয়ে এলো হালকা কাঁপন নিয়ে।


আযলান গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর গলা ভারী, কণ্ঠে উন্মাদনার ঝড়।

—“তুমি বুঝতে পারছো না ঐশী… আমি… আমি আর পারছি না।”

শব্দগুলো কেবল স্বীকারোক্তি নয়, যেন তাঁর অন্তরের গভীরতম আর্তনাদ।


ঐশী ভিজে চুল কপাল থেকে সরিয়ে নিল কাঁপা হাতে। চোখ লাল হয়ে উঠেছে।

—“আপনি… এভাবে করতে পারেন না। এটা ঠিক না…”


বাক্যগুলো মুখ থেকে বেরোলো ঠিকই, কিন্তু ভেতরে দৃঢ়তা নেই। প্রতিটি শব্দ কাঁপছিল ভয়ের সাথে অদ্ভুত এক কম্পনে। সে জানে, আযলানকে এভাবে থামানো সহজ নয়।


আযলান এক পা সামনে এগিয়ে এলেন। ভেজা শার্ট বৃষ্টিতে গাঢ় হয়ে শরীরে লেপ্টে গেছে। তাঁর দৃষ্টি এখন আর কেবল রাগী নয়—তীব্র আকাঙ্ক্ষা জ্বলছে সেখানে।


—“ঠিক-ভুলের হিসাব রাখার সময় আমার নেই ঐশী। আমি শুধু জানি… তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।”


ঐশী হতবাক হয়ে গেল। বুকের ভেতর শিরশির করে উঠলো। তাঁর চোখ আটকে গেল আযলানের চোখে, কিন্তু সরাতে পারলো না। বৃষ্টির ফোঁটা দুজনের শরীরে পড়ছে সমান ছন্দে। মনে হলো, প্রকৃতিও এই মুহূর্তে নীরব সাক্ষী।


ঐশী ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগলো। ভেজা পানিতে তাঁর পা ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু খেয়াল নেই। তাঁর মনে শুধু একটাই ইচ্ছে—আযলান যেন আর কাছে না আসে। কিন্তু আযলান থামলো না।


আযলান ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে আবারও ঐশীর হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।


ঐশীর কণ্ঠ কেঁপে উঠলো—

—“দয়া করে ছাড়ুন আমাকে … প্লিজ, ছেড়ে দিন!”


আযলান ঝুঁকে এলেন তাঁর কানের কাছে। ভেজা নিঃশ্বাস আগুনের মতো স্পর্শ করলো ঐশীর গালে।

—“ছাড়তে পারবো না যে sweet honey। এক মুহূর্তের জন্যও না।”


চোখে তাঁর ঝড়ো সমুদ্রের ঢেউ। ঐশী বুকের ভেতর ধাক্কা খেতে খেতে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সে বুঝলো, এ রাগ, এ উন্মাদনা, আসলে ভালোবাসারই অন্য রূপ।


তবুও… এ ভালোবাসা তাকে আতঙ্কিত করে তুলছে,কলঙ্কিত করে তুলছে।


ঠিক সেই সময় চৌধুরী বাড়ির ভেতর থেকে ডাকার শব্দ এলো—

—“ঐশী… কোথায় তুমি? ভেতরে এসো!”


শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়লো দুজনের ওপর।


ঐশী ঝট করে আযলানের হাত সরিয়ে নিল। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, চোখ কাঁপছে।

সে এক মুহূর্তও না তাকিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।


আযলান স্থির দাঁড়িয়ে রইলো ল্যাম্পপোস্টের নিচে। বৃষ্টির ফোঁটা তাঁর মুখ বেয়ে নামছে, কিন্তু চোখে জমে আছে আরও ভারী জল। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরা, যেন নিজেকেই আটকাতে চাইছেন।


আযলান ফিসফিস করে বললো—

—“তুমি যতই এড়িয়ে যাও ঐশী… আমি তোমাকে আমার কাছ থেকে পালাতে দেবো না।”


---------


ঐশী ভেতরে ঢুকেই শুনতে পেলেন ঘরের নিস্তব্ধতা। ডাইনিং টেবিলে বসা সবাই  খাওয়া শেষ করে চুপচাপ। কেউ কথা বলছে না, কিন্তু হঠাৎ এই নীরবতায় যেন শব্দেরও ভয় থাকে। ঐশীর মনে হলো, বৃষ্টির মতোই ঘরে অদৃশ্য এক অশ্রুত চাপ নেমে এসেছে।ঐশী  সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে উঠে গেল। ডাইনিং টেবিলে বসা কারও দিকে তাকালোও না। বড়রা ভেবেছিল, হয়তো বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছে, তাই সে চুপচাপ চলে গেল।


তাঁর বুকটা ধাক্কা খাচ্ছে—একই সঙ্গে উত্তেজনা আর ভয়। আযলানের সেই ঝড়ো দৃষ্টি, উন্মাদ স্পর্শ এখনও চোখের সামনে ভাসছে। ঐশী নিজেকে ধমক দিলেন, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন, এই ঝড় থেমে যাবে না। কিন্তু আমি কি পারবো?”


ঐশী জানালার দিকে এগিয়ে গেলো। বাইরে ঝড় থেমেছে, কিন্তু বৃষ্টি এখনো মৃদু টুপটুপ করছে। মনে হলো, প্রকৃতিও তার দ্বন্দ্বকে বুঝে। হাত দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে বললেন—“আপনি… আপনি কি সত্যিই আমার কাছে এমনভাবে…?” শব্দ থেমে গেল, চোখ বন্ধ করে।


ভেতরের টানাপোড়েন আর বৃষ্টির ছোঁয়া মিলে এক অদ্ভুত কোমল ব্যথা তৈরি করছে। ঐশী বুঝলেন—যে উত্তেজনা, যে রোমান্টিক ভয়, তা শুধু আজকের নয়, ভবিষ্যতেরও ছায়া।


তার মন নীরবভাবে এক সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে হবে, কিন্তু আযলানের প্রভাব থেকে নিজেকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই দ্বন্দ্ব—ভয় আর আকর্ষণ, নীরবতা আর আগুন—সব মিলিয়ে ঐশীর ভেতরে এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করছে।


ঐশী একটি গহীন নিশ্বাস নিলেন, জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে। বললো —“আপনি… আপনি যেখানেই থাকুন, আমি যেন আপনার দিকে তাকাতে থাকি, কিন্তু এই পরিবারও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”


এই ছোট্ট মুহূর্তেই বৃষ্টি, পরিবারের টানাপোড়েন এবং আযলানের আগুন এক অদ্ভুত সিম্ফোনিতে মিললো, যা ঐশীর হৃদয়কে অচেনা এক আবহে ডুবিয়ে দিল।



কিন্তু আসল কারণ লুকিয়ে রইলো ঐশীর বুকের ভেতরে।ভেজা কাপড়ে শরীর কাঁপছে, কিন্তু এ কাঁপুনি ঠাণ্ডার জন্য নয়। বুকের ভেতর এখনও কাঁপছে আযলানের অগ্নিদৃষ্টি, তাঁর বেপরোয়া স্পর্শ।


ঐশী বিছানায় বসে পড়লো, দু’হাত মুখে চেপে ধরলো। চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো—কে জানে সেটা বৃষ্টির ভিজে যাওয়া, নাকি অশ্রু।


মনে মনে বলতে লাগলো—

“কেন… কেন আপনি আমাকে এভাবে বন্দী করলেন ? কেন আমার জগৎ উলটপালট করে দিলেন?”



--------------


আযলানের একাকিত্ব


অন্যদিকে আযলান তখনও বাড়ির বাইরে। তাঁর চোখ লাল, শরীর কাঁপছে। বৃষ্টি ধীরে থেমে আসছে, কিন্তু ভেতরের ঝড় থামছে না।


তিনি বাইকের কাছে গেলেন। কালো বাইকের সিট ভিজে আছে পুরোপুরি। আযলান হাত বুলিয়ে দিলেন সেটার ওপর, যেন বাইকের ভেতরও তাঁর রাগ জমে আছে।


ইঞ্জিন চালালেন না। হেলমেট হাতে নিয়ে শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন। ফিসফিস করে বললেন—

—“আজ থেমে গেলাম… কিন্তু সারাজীবন থামবো না।”



-----------------


রাতের নিরবতা


রাত নামলো চৌধুরী বাড়িতে। সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমের প্রস্তুতি নিলো। শুধু দুটি মন অস্থির—ঐশী আর আযলান।


ঐশী জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখে ভয়, অস্থিরতা, আর কোথাও যেন এক অদ্ভুত কৌতূহল। হাত দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দেখলো—সেখানে এখনও আযলানের আগুনের ছাপ লেগে আছে।


সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো, কিন্তু ঘুম এলো না। কানে বারবার বাজতে থাকলো আযলানের বজ্রকণ্ঠ—

“তুমি কি একদমই বুঝছো না?!”


শুয়েও যেন সে অনুভব করছে তাঁর উষ্ণ নিঃশ্বাস, রাগী দৃষ্টি, আর অদ্ভুত যত্ন।


অন্যদিকে আযলানও ঘরে ফিরে শুয়েছেন, কিন্তু ঘুম তাঁর চোখে নেই। সিগারেট ধরিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—

—“ঐশী… তুমি যতই ভয় পান না কেন, একদিন তুমি ঠিক বুঝবে—এই রাগ, এই উন্মাদনা, সবটাই শুধু তোমার জন্য।”


চোখে তখন অদ্ভুত এক শপথ জ্বলছে।



------------


সেই রাতে দুজনের মনেই একই ঝড় বয়ে গেল—একজন পালাতে চাইছে, অন্যজন কাছে টানতে চাইছে। তবুও দুজনেই জানে—এই বৃষ্টির মতোই তাদের সংযোগ থামানো যাবে না।


যে আগুন আজ আযলানের চোখে জ্বলে উঠেছে, আর যে শিহরণ ঐশীর ঠোঁটে কাঁপন তুলেছে—সেটা কেবল শুরুর আগুন।


এরপরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি বৃষ্টি, তাদের জীবনকে নিয়ে যাবে আরও গভীর অজানা পথে।


Happy Reading ☺

To be continue😅