শিবপুর গ্রামে ঢোকার পর থেকেই মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের দেখছে।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো খুব স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের চোখের দৃষ্টি বারবার আমাদের গাড়ির ওপর এসে পড়ছিল। কেউ এগিয়ে আসছিল না। তবু এক ধরনের অস্বস্তি পুরো গ্রামটাকে ঘিরে রেখেছিল।
অরিন্দম গাড়ি থামিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
— এখানকার মানুষ ভয়ে ভয়
ভয়ে আছে কেন?— সে ধীরে বলল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— কাকে ভয় পাচ্ছে এরা।
— হয়তো আমাদের। কারণ আমরা সত্যের খোঁজে এসেছি।
গাড়ি থেকে নেমে আমরা ধুলোভরা সরু রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম। সামনে গ্রামের শেষ প্রান্তে দেখা যাচ্ছিল সেই জমিদারবাড়ির ভাঙা ছাদ। দূর থেকে বাড়িটা দেখতে একটা মৃত দানবের মতো লাগছিল—চুপচাপ, নিশ্চল, অথচ ভেতরে যেন কিছু এখনো বেঁচে আছে।
একজন বৃদ্ধ আমাদের পথ আটকালেন। শুকনো মুখ, কাঁপা কাঁধ, হাতে লাঠি।
— আপনারা ওই বাড়ির দিকে যাচ্ছেন? — তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
অরিন্দম মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যাঁ। কেনো ,আপনি কি কিছু বলবেন?
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বললেন,
— জানি বলেই তো ভয় পাই। ওই বাড়ির পশ্চিম দিকের দরজা কখনো খুলবেন না।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— এই কথাটা আমরা আগেও শুনেছি।
বৃদ্ধের চোখ সরু হয়ে গেল।
— তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের কেউ আগেই সাবধান করেছে। কিন্তু সাবধান করলেই তো হয় না বাবা। মানুষ লোভে অন্ধ হলে নিষিদ্ধ দরজাও খুলে ফেলে।
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,
— ১৮২৩ সালের সেই রাতের কথা কিছু জানেন।
বৃদ্ধ হঠাৎ থমকে গেলেন। যেন নামটা শুনেই তাঁর গলা শুকিয়ে গেছে।
— ওই রাতের পর থেকে বাড়ির ভেতর সব পাল্টে যায়, — তিনি বললেন। — জমিদার আর তাঁর পরিবারের সবাই নাকি একসঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যারা তখন ছিলাম, তারা জানতাম… সেটা নিখোঁজ হওয়া ছিল না। কিছু একটা হয়েছিল। ভয়ংকর কিছু।
আমি বললাম,
— কী হয়েছিল?
বৃদ্ধ চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,
— লোকজন বলত, বাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার শোনা গিয়েছিল। তারপর পশ্চিম দিকের দরজাটা খুলে যায়। আর তার পরেই… আর কেউ ভিতরে ঢুকতে সাহস করেনি।
অরিন্দম বৃদ্ধের দিকে একটু ঝুঁকে বলল,
— দরজাটা এখনো আছে?
— আছে। কিন্তু সাবধান। কেউ যদি ওটা খুলে ফেলে, তাহলে তার ফিরে আসা কঠিন।
বৃদ্ধ চলে গেলেন। আমি আর অরিন্দম পরস্পরের দিকে তাকালাম। আর কিছু বলার ছিল না। আমাদের দুজনেরই একই অনুভূতি—এবার আর পেছনে ফেরার কোনো উপায় নেই।
জমিদারবাড়ির সামনে দাঁড়াতেই বুকটা ধক করে উঠল।
বড় লোহার ফটক, মরচে পড়া তালা, ভাঙা ইটের দেয়াল, আর লতাপাতা জড়িয়ে থাকা উঁচু বারান্দা—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন জীবিত মানুষের নয়, কোনো পুরোনো অভিশাপের ঠিকানা।
অরিন্দম পকেট থেকে সেই মরচে ধরা চাবি বের করল।
— এটিই মূল চাবি হলে অবাক হব না, — সে বলল।
আমি চারপাশে তাকালাম।
— কিন্তু গেট তো তালা দেওয়া।
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,
— তালা থাকলেই কি সত্যি কেউ থামে?
সে চাবিটা পুরোনো তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাল।
ক্লিক!
মৃদু শব্দে তালাটা খুলে গেল।
আমি শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলাম। যেন এত বছর ধরে কেউ এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিল।
গেট ঠেলে আমরা ভিতরে ঢুকলাম।
ভেতরের উঠোন জুড়ে আগাছা। মাঝখানে শুকনো কুয়ো। একদিকের জানালা ভাঙা। কিছু ঘরে দরজা নেই, কোথাও মেঝে বসে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল—এত পুরোনো বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোথাও ধুলো কম জমে আছে। মানে, কেউ হয়তো সম্প্রতি এখানে এসেছে।
অরিন্দম মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
— দেখেছ?
আমি নিচু হয়ে তাকালাম।
পায়ের ছাপ।
কাঁচা মাটির ওপর তাজা পায়ের ছাপ। একজোড়া নয়। তিন জোড়া।
— সেই ছায়ার লোক? — আমি ফিসফিস করে বললাম।
অরিন্দম মাথা নেড়ে বলল,
— সম্ভবত। এবং তারা আমাদের আগে থেকেই জানত।
আমরা ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। প্রধান হলঘরে ঢুকতেই একটা পুরোনো দেয়ালঘড়ি চোখে পড়ল। কাঁচ ভাঙা, পেন্ডুলাম থেমে আছে, তবুও সেই বন্ধ ঘরে একটি অস্বস্তিকর শব্দ যেন শোনা যাচ্ছিল—টিক… টিক… টিক… যদিও ঘড়ি চলছে না।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
— এটা কীভাবে সম্ভব?
অরিন্দম দেয়ালের দিকে ইশারা করল।
একটা বড় চিত্রের ফ্রেম। ভেতরে একজন রাজকীয় পোশাকের মানুষ—রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। ছবিটার নিচে ধুলোর ওপর অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার আঙুলের দাগ।
অরিন্দম বলল,
— কেউ আজ এই ছবিটা ছুঁয়েছে।
হঠাৎ ওপরের তলায় পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ঠক… ঠক… ঠক…
আমার শরীরের রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি বললাম-- এখানে কেউ আছে।
অরিন্দম টর্চ জ্বালাল।
— থাকুক। লুকোচুরি আর কতক্ষণ চলবে?
আমরা সিঁড়ির দিকে এগোলাম। প্রতিটা সিঁড়িতে পা রাখতেই কাঁদা কাঠের শব্দ হচ্ছিল। ওপরতলায় পৌঁছে একটি লম্বা করিডোর। দুপাশে বন্ধ দরজা। করিডোরের শেষ দিকে পশ্চিম দিকের একটা দরজা। ঠিক বৃদ্ধ যে দরজার কথা বলেছিলেন, সেটাই।
কিন্তু দরজাটার কাছে পৌঁছোতেই আমার শ্বাস আটকে গেল।
দরজার ওপর কালি দিয়ে লেখা—
“যারা সত্য খুঁজতে এসেছে, তারা আর কোনোদিন ফিরে যাবে না।”
অরিন্দম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। তারপর মেঝের দিকে ঝুঁকে বলল,
— এই জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে কেউ দাঁড়িয়েছে।
— কতজন?
— অন্তত দুজন। একজন ডান হাতে ভারী কিছু নিয়ে ছিল।
আমি বললাম,
— মানে ওরা এখানেই আছে।
— বা হয়তো ছিল।
অরিন্দম দরজার হাতলে হাত রাখল, কিন্তু খুলল না। বরং কান লাগিয়ে শুনল।
কয়েক সেকেন্ড পরে সে হঠাৎ পিছিয়ে এল।
— কী হলো?
— ভেতরে কারোর শ্বাস- প্ৰশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
আমি ভয়ে দরজার দিকে তাকালাম।
— তাহলে কি, ছায়ার লোক?
অরিন্দম চোখ সরু করে বলল,
— নিশ্চিত নই।
এরপর সে চাবিটা বের করল। হাত কাঁপছিল না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, ওর মনও সতর্ক।
চাবিটা তালায় ঢোকাতেই একটা মৃদু কাঁপুনি হল।
ক্লিক।
দরজা খুলে গেল।ভেতরে অন্ধকার।
টর্চের আলো পড়তেই আমরা দেখলাম—ঘরটা খুব ছোট। দেয়ালে পুরোনো তাক, ভাঙা চেয়ার, আর মাঝখানে একটা মেহগনি টেবিল। টেবিলের ওপর একটি কাগজ, আর তার পাশেই একটা কালো খাম।
অরিন্দম প্রথমে খামটা খুলল।
ভেতরে শুধু একটা লাইন।
“চৌধুরী পরিবারের সত্য গোপন কক্ষে।”
তারপর সে টেবিলের কাগজটা খুলল। সেটা একটা অর্ধেক পোড়ানো নথি। তাতে হাতের লেখা অস্পষ্ট, তবে একটা বাক্য স্পষ্ট পড়া গেল—
“১৮২৩ সালের ১৪ই ভাদ্র, সত্য ঢাকতে অনেক রক্ত ঝরেছিল।”
আমি কাগজটা দেখে থমকে গেলাম।
— তাহলে নিখোঁজ হওয়া নয়… এটা খুন?
অরিন্দম ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যাঁ। আর এটাই হয়তো “ছায়া”-র গোপন রক্ষিত সত্য।
ঠিক তখনই—
ধাপ… ধাপ… ধাপ…
কোনো একজন নিচতলায় হাঁটছে।তারপর থেমে গেল।
আবার শব্দ।
এবার আমাদের খুব কাছে আসছে।আমি ফিসফিস করে বললাম,
— অরিন্দম…
অরিন্দম টর্চ নিভিয়ে দিল।
— একদম, নড়বে না।
কেউ দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল।একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।
— অরিন্দম সেন… তুমি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমের দরজা খুলেই ফেললে।
আমার বুক ধক করে উঠল।
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,
— তুমি কে?
ওপাশের লোকটা একটু হাসল।
— যে লোকটা দুইশো বছর ধরে এই বাড়ির সত্য পাহারা দিচ্ছে।
আমি আর অরিন্দম অবাক হয়ে গেলাম।
দুইশো বছর? একজন সাধারন মানুষ কীভাবে?
আর সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মানুষটা আবার বলল—
— তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও ১৮২৩ সালে কী হয়েছিল, তাহলে নিচে নামো। কিন্তু সাবধান… নিচের ঘরে যে আছে, সে তোমাদের মতো মানুষ নয়।
আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।অরিন্দম আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভয় ছিল না। ছিল আরও ভয়ের কিছু—নিঃশব্দ প্রস্তুতি।
সে টর্চ তুলে নিল।
— রুদ্র, এবার আমরা নিচে যাব।
আর আমি বুঝতে পারলাম, এই পর্ব এখানেই শেষ হলেও, আসল আতঙ্ক এখনও শুরুই হয়নি।
চলবে...
💬 কমেন্ট করুন:
আপনাদের কী মনে হয়? ১৮২৩ সালে আসলে কী ঘটেছিল? 🤔
👁️ "ছায়া" কি একজন মানুষ, নাকি শতাব্দীপ্রাচীন কোনো গোপন সংগঠন?
নিচে কমেন্টে নিজের তত্ত্ব লিখুন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় মতামত পরবর্তী পর্বে উল্লেখ করা হতে পারে!
❤️ গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করুন।
📌 রহস্যের শেষ পর্যন্ত সঙ্গে থাকতে এখনই ফলো করুন।
🔥 পরবর্তী পর্বে উন্মোচিত হবে জমিদারবাড়ির নিচের গোপন কক্ষের প্রথম রহস্য!