Read I gave my heart to you. by L Anjum Author in Bengali থ্রিলার | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মন_তোকে_দিলাম - 9

"সিফান...! বাবা সিফান!"

দরজার বাইরে থেকে ভেসে আসা সাহিদা বিবির কণ্ঠস্বর শুনে সেরাফিনার ভাবনার জগৎ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে সে নিজের চিন্তায় ডুবে ছিল। কখনো রাগে, কখনো ঘৃণায়, আবার কখনো অদ্ভুত এক উন্মাদ হাসিতে নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ সেই ডাক কানে আসতেই তার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল।মুহূর্তের মধ্যে বাস্তবতায় ফিরে এল সে।তার বুক ধক করে উঠল।

এখন যদি সে রুম থেকে বের হয়, তাহলে সবাই তাকে এখানে দেখতে পাবে। আর যদি সিফান কে এই অবস্থায় দেখে, তাহলে প্রথম সন্দেহটা তার ওপরই আসবে। বিষয়টা ভাবতেই কপালে চিকচিক করে ঘাম জমল।

কী করবে সে?দরজার দিকে তাকাল, আবার জানালার দিকে।

বাইরে থেকে সাহিদা বিবির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর বারবার ভেসে আসছে।
"সিফান! দরজা খোল বাবা!"

সেরাফিনা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল।রুমের জানালাটা আস্তে করে খুলে বাইরে তাকাল। চারপাশ নিস্তব্ধ। অন্ধকারে কেউ নেই।

গভীর শ্বাস নিয়ে সে সাবধানে জানালা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর পা আস্তে করে কার্নিশ ধরে রাখলো। সামান্য ভুল হলেই নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা, তবু সে থামল না।

পা টিপে টিপে কার্নিশ ধরে এগোতে লাগল সেরাফিনা। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল সতর্কতা, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল দৃঢ়তা। সামান্য ভুল মানেই কয়েক তলা নিচে পড়ে যাওয়া, তবুও তার পা একবারের জন্যও কাঁপল না।

রাতের ঠান্ডা বাতাস বারবার তার মুখে এসে আঘাত করছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন সামনে।

হঠাৎ কার্নিশের একপাশে বেরিয়ে থাকা মরিচা ধরা একটি পেরেকের সঙ্গে তার বাহু ঘষা খেল।

ক্ষীণ একটা শব্দ হলো।সেরাফিনা থমকে দাঁড়াল।

বাহুর কাছে জামার কাপড়টা সামান্য ছিঁড়ে গেছে। ধারালো পেরেকটা কাপড়ে আঁচড় কেটে দিয়েছে। ছেঁড়া অংশের নিচে ত্বকেও হালকা একটা দাগ পড়েছে, সেখান থেকে সূক্ষ্ম জ্বালাপোড়া অনুভূত হচ্ছে।

একবার নিচে তাকিয়ে ছেঁড়া জায়গাটা দেখল সে।অন্য সময় হলে হয়তো বিরক্ত হতো। কিন্তু এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।

ঠোঁট কামড়ে আবার সামনে তাকাল সে।
"ধুর..."মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলেই এগিয়ে গেল।

যেন জামা ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা হাতে আঁচড় লাগা কোনো ব্যাপারই না। তার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কারও নজরে না পড়ে নিজের ছাদে পৌঁছানো।

আরও কয়েক কদম এগিয়ে অবশেষে শেষ অংশে পৌঁছে গেল সে। তারপর সাবধানে দেয়াল ধরে শরীরটাকে ওপরে তুলল।

কয়েক সেকেন্ডের চেষ্টার পর নিজের রুমের সাথে থাকা ছোট্টো ছাদে উঠে এল সেরাফিনা।মেঝেতে পা রাখতেই গভীর একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।কিন্তু স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।বাহুর কাছে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়টা বাতাসে দুলছে। 

সেরাফিনা আর বেশি কিছু ভাবল না। ধীরে ধীরে রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। তারপর বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে ক্লান্ত শরীরটা গদির ওপর এলিয়ে দিল।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার চোখে-মুখে কোনো অস্থিরতা নেই। যেন কিছুই ঘটেনি।

অনেক মানুষের কাছে এমন পরিস্থিতি আতঙ্কের কারণ হতে পারে। কিন্তু সেরাফিনার জীবনটা কখনো সাধারণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই সে এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছে, যেখানে ক্ষমতা, ষড়যন্ত্র, প্রতিশোধ আর সহিংসতার গল্প ছিল নিত্যদিনের বিষয়। তাই অন্যদের কাছে যা ভয়ংকর, তার কাছে তা নতুন কিছু নয়।

ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

ঘরের সিলিং ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে। বাতাসে পর্দাগুলো হালকা দুলছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।

বাহুর কাছে ছিঁড়ে যাওয়া জামাটার দিকে একবার তাকাল সেরাফিনা। পেরেকের আঁচড়ে হালকা জ্বালাপোড়া করছে। কিন্তু সে গুরুত্ব দিল না।

তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

আজকের রাতটা যেন স্বাভাবিক নয়। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝেও সে অনুভব করছে, অট্টালিকার ভেতরে কোথাও একটা অদৃশ্য ঝড় তৈরি হচ্ছে।

তবুও চোখ বন্ধ করল সে।

কারণ সে জানে, এই বাড়িতে ঝড় নতুন কিছু নয়। এখানে মানুষ হাসে, কাঁদে, বিশ্বাসঘাতকতা করে, আবার পরদিন এমনভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায় যেন কিছুই ঘটেনি।

আর সেরাফিনা?
সেও ধীরে ধীরে সেই নিয়মের অংশ হয়ে গেছে।

সেরাফিনা একবার টেবিলের উপড়ে থাকা ল্যাপ্টপ এর দিকে তাকালো কিছু মনে পড়তেই হাতে তুলে নিয়ে কিছু ডিলিট করতে লাগলো। 

__________________________

ব্যালকনির পর্দাগুলো অসম্ভব জোরে দুলছে। গভীর রাতের ঠান্ডা বাতাস খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতার আবহ তৈরি করেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক শোনা যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে গাছের ডালপালা নড়ে উঠে খসখসে শব্দ তুলছে।

ঘরের মাঝখানে বসে আছে জেহেফিল।

তার সামনে খোলা ল্যাপটপ। স্ক্রিনের আলো অন্ধকার ঘরে তার মুখটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে।

কিন্তু তার দৃষ্টি যতটা না স্ক্রিনে, তার চেয়েও বেশি আটকে আছে সেখানে দেখা দৃশ্যটায়।

কয়েক মিনিট আগেও সে ভেবেছিল নিজের চোখ তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। তাই বারবার ভিডিওটা রিওয়াইন্ড করে দেখেছে। একবার, দু'বার, তিনবার...
কিন্তু ফল একই।সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে— মেয়েটা সেখানে গিয়েছিল।

জেহেফিল চোয়াল শক্ত করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে"অসম্ভব..."

ফিসফিস করে বলল সে।যতই অস্বীকার করতে চাক, ফুটেজ মিথ্যা বলছে না।

মেয়েটা সেখানে গিয়েছিল, আবার সেখান থেকে বেরিয়েও এসেছে।হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমতে শুরু করল।

কাল যদি কেউ ফুটেজ যাচাই করেতো? যদি পুরো বিষয়টা তদন্তের পর্যায়ে যায়?
তাহলে?

মুহূর্তেই তার মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।জেহেফিল বিরক্ত হয়ে এক হাত দিয়ে চুলে আঙুল চালাল।
তারপর মনে মনে নিজেকেই গালি দিল।

এত বড় ভুল মেয়েটা কীভাবে করল?এত সাহস মেয়েটার। 
মেয়েটার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা উচিত ছিল। অন্তত গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সুরক্ষিত রাখা বা পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।কিন্তু সে সেটা করেনি।

আর এখন ফুটেজে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে যে কেউ ভুল ধারণা করতে পারে।জেহেফিল আবার ভিডিওটা চালাল।

স্ক্রিনে ছায়ামূর্তির মতো একটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে চারপাশ দেখল, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।ভিডিও থামিয়ে দিল সে।তার চোখে তখন উদ্বেগ স্পষ্ট।

বাইরে বাতাসের গতি আরও বেড়ে গেছে। পর্দাগুলো বারবার উড়ে উঠছে।

কিন্তু জেহেফিল সেদিকে খেয়াল করল না।তার সমস্ত মনোযোগ এখন একটাই বিষয়ে

Happy Reading ☺
To Be Continue 😅