সকাল ৯:৩০
রুমের জানালাটা খোলা। বাইরে পাখিগুলো কিচিরমিচির করছে। সূর্য যেন নিজের তেজ দেখাতে ব্যস্ত। চারদিকে গরম হাওয়া বইছে; গ্রামাঞ্চল হওয়ায় গরমটা যেন আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
কাঁচের দেয়ালের পর্দাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরে গেল। পর্দা সরতেই সূর্যের আলো এসে পড়ল সেরাফিনার মুখে। বিরক্তিতে সে কয়েকবার চোখ পিটপিট করল। ঘুমের ঘোরে সালোয়ার-কামিজটা পেট থেকে খানিকটা সরে গিয়েছে, উন্মুক্ত হয়ে আছে তার ফর্সা পেট। কালো কুচকুচে চুলগুলো ছড়িয়ে আছে বিছানাজুড়ে।
মনে মনে পাখিগুলোকে বকতে বকতে বিড়বিড় করে বলল,
"একদিন না একদিন তোদের জবাই করে খেয়ে ফেলব। সকাল সকাল মুডটাই খারাপ করে দিলি! কোন দুঃখে যে তোদের খাবার দিতে গিয়েছিলাম, উফ!"
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে বসল সে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে গেল। সকাল ৯টা ৪২ বাজে! সাধারণত সে এত দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে না। গত রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় আজ দেরি হয়ে গেছে।
সেরাফিনা দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ফজরের কাজা নামাজ আদায় করল। তারপর আবার সব বিরক্তি ভুলে পাখিগুলোর জন্য খাবার দিয়ে নিজের মতো বকবক করতে করতে নিচে নেমে গেল।
কেন জানি আজ তার মুডটা ভীষণ ভালো। আশপাশের কোনো কিছুতেই মনোযোগ না দিয়ে গুনগুন করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।তার মনে হয় আগের রাতের কোনো কথা মনে নেই।
সেরাফিনা সামনে তাকাতেই থমকে গেল। বাড়িতে এত লোকজন কেন? পুরো ড্রয়িংরুমটা মানুষে গিজগিজ করছে। তবে সেদিকে বেশি মন দেয় না, তা তে তার কি ভিড় ঠেলে নিজের মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে।
"আম্মু, ভীষণ খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দাও না।"
কথাটা বলেই সে আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। আজ বাড়িতে এত মানুষের সমাগমের কারণটা এখনও তার মাথায় ঢুকছে না।সালমা বিবি দিকে তাকা তেই সেরাফিনার বুক কেঁপে উঠে"আম্মু কি হয়েছে তোমার চোখে পানি কেন তোমার আমাকে বলো, ও আম্মু, কেউ কিছু বলেছে আম্মু"
সালমা বিবি কাঁপা কন্ঠে বললো"সি.. সিফান আর নেই"
মায়ের কথা শুনে সেরাফিনার আগের রাতের সব কথা মনে পড়ে যাই"হাই আল্লাহ সিফান যে মারা গিয়েছে আমি কি ভাবে ভুলতে পাড়ি এটা ঠিক না ডাঃ নোভা এটা ঠিক নাহ, এই আনন্দ টা তো সেলিব্রেট করা উচিত"মনে মনে বলেই আবার হেসে ফেলে।
হাসির মাঝেই যেন চিরচেনা একটা মেয়েলি কণ্ঠ তার কানে ভেসে এল।
"সেরু বেবি!"
কণ্ঠটা শুনেই সেরাফিনা চমকে উঠল। পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখল, জেনিফা ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
"তুই এখানে,কখন এলি কি বললি নাহ"সেরাফিনা হেসে হেসেই বললো।
সেরাফিনা আর কিছু বলার আগেই জেনিফা তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। তারপর প্রায় টেনেহিঁচড়ে তাকে বাড়ির পেছনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
"এই! এই! কী হয়েছে তোর?"
সেরাফিনা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
"আরে শালী, কী হলো তোর? এইভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিস কেন? আমি কি গরু নাকি, যে হাল চাষ করব?গরুর মতোন নিয়ে যাচ্ছিস কেন মেয়ে"
কিন্তু জেনিফা যেন কিছুই শুনল না। তার মুখ গম্ভীর, চোখে-মুখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার ছাপ।
"চুপ করে আমার সঙ্গে আয়। জরুরি কথা আছে।"
"জরুরি কথা থাকলেই কি হাত ভেঙে ফেলতে হবে? আস্তে ধর, ব্যথা লাগছে!"
তবুও জেনিফা থামল না। বরং হাতের চাপ আরও শক্ত হয়ে গেল।তখনই সেরাফিনার মনে হলো, কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। না হলে জেনিফা কখনো এমন আচরণ করত না।
"তুই... সিফানকে মেরেছিস?"
জেনিফা নিচু গলায়, কিন্তু স্পষ্ট উত্তেজনা নিয়ে প্রশ্নটা করল।
সেরাফিনা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"নাহ রে ভাই।"
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল সে।
"আমার সারা জীবনের একটা আফসোস থেকে যাবে জানিস?"
"কী আফসোস?"
"ওই শু***চ্চাটাকে আমি নিজের হাতে মারতে পারলাম না।"
কথাটা এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল যেন আবহাওয়ার খবর দিচ্ছে।
"আমি তো ওকে কথা দিয়েছিলাম, একদিন নিজের হাতেই মারব। কিন্তু দেখ, সেই সুযোগটাই পেলাম না।"
জেনিফা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার মনে হচ্ছিল সেরাফিনা মজা করছে, কিন্তু সেরাফিনার চোখ-মুখ দেখে সে নিশ্চিত হতে পারল না।
সেরাফিনার ঠোঁটে তখনও সেই অদ্ভুত হাসিটা লেগে আছে।
"যে-ই মেরে থাকুক, আমার কাজটা সহজ করে দিয়েছে।আমার থেকেও সিফান কে যে মেরেছে তার আরও বড় শত্রু হবে"
বলে সে আকাশের দিকে তাকাল, যেন বিষয়টা তার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সেরাফিনার কথা শুনে জেনিফা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে সেরাফিনার মুখে।
"তুই এটা এত স্বাভাবিকভাবে কীভাবে বলতে পারিস?"
সেরাফিনা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
"কী বলতে পারি?"
"একটা মানুষ মারা গেছে।"
"মানুষ?"
সেরাফিনা হঠাৎ হেসে উঠল।
"তুই কবে থেকে সিফানকে মানুষ বলা শুরু করলি?"
জেনিফা কোনো উত্তর দিল না।চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। দূরে গাছের পাতাগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। বাড়ির ভেতর থেকে মানুষের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
সেরাফিনা কিছুক্ষণ সেই শব্দ শুনল। তারপর বিরক্ত মুখে বলল,
"উফ! এত কান্নাকাটি করছে কেন সবাই?"
"কারণ একজন মারা গেছে, সেরুজান!"
"আর আমি কি বলেছি মারা যায়নি?"
জেনিফা এবার কপালে হাত দিল।
"তোর মধ্যে কোনো অনুভূতি আছে?কেউ মারা গেলে মিছিমিছি কান্না করতে হয় ওটা ও জানিস নাহ"
"আমার মধ্যে অনুভূতি আছে তো।"
" তো কোথায়?আমি দেখতে পারছি নাহ কেন"
"খিদে পেয়েছে। খুব খিদে পেয়েছে।"
কথাটা বলেই সেরাফিনা গম্ভীর মুখে নিজের পেটের দিকে তাকাল।
জেনিফা হতভম্ব হয়ে গেল।
— "এই তুই কি সিরিয়াস আমি কিন্তু সিরিয়াস না!" বলে চোখ বাঁকিয়ে হেসে দিল।
" কিন্তু আমি সিরিয়াস। সকাল থেকে কিছু খাইনি।"
তারপর হঠাৎই সেরাফিনার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে উঠল।
"তবে একটা বিষয় আমাকে ভাবাচ্ছে।"
"কী?"
"সিফানকে যে মেরেছে, সে কাজটা খুব পরিষ্কারভাবে করেছে।"
"মানে?"
"মানে, কেউ না কেউ অনেক দিন ধরে ওকে দেখছিল। সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।"
জেনিফার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
"তুই এসব কীভাবে জানিস?"
সেরাফিনা হালকা হেসে আকাশের দিকে তাকাল।
"খুব শিগগিরই তার সাথে দেখা হবে আমার।"
"কার সাথে?"
"যে সিফানকে মেরেছে তার সাথে।"
জেনিফা বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুই তাকে চেনিস?"
"না।"
"তাহলে এত নিশ্চিত হয়ে বলছিস কীভাবে?"
সেরাফিনা মুচকি হাসল।
"কারণ আমরা একই উদ্দেশ্যের চরিত্র, জেনি।"
"কী বলতে চাইছিস?"
"যে কারণটা আমাকে সিফানকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছিল, হয়তো সেই একই কারণ তাকে সিফানকে মেরে ফেলতে বাধ্য করেছে।"
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবার বলল,
"কিছু মানুষ রক্তের সম্পর্কে আপন হয়, আর কিছু মানুষ একই শত্রুর কারণে।"
কথাটা বলেই সে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।আদব জেনিফার মাথায় কিছু ঢুকেছে চুপ করে ভাবছে সেরাফিনা ঠিক কি বললো"এই বেডি দাঁড়া আমি ও তো আছি আমি ও কিছু খাইনি দাঁড়া বলছি" বলে সেরাফিনার পিছনে ছুটতে থাকে।
Happy Reading ☺
To Be Continue 😅