"আরে হ্যাকার, ড্রেসটা তো চেঞ্জ করে আসতে পারতেন!"
কথাটা কানে আসতেই সেরাফিনার হাত থেমে গেল। মুখে তোলা খাবার আর গিলতে পারল না সে। কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে পিছনে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল লোকটার উপর।
ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে আছে জেহেফিল। চোখে কালো সানগ্লাস, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। সাদা পোশাকে তাকে অস্বাভাবিক রকমের মানিয়েছে।
জেহেফিলকে দেখেই সেরাফিনার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। তবে পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে চারপাশে তাকাল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে লোকটা আসলেই তাকে বলেছে কি না।
সেরাফিনার এমন ভাবভঙ্গি দেখে জেহেফিল ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
"আপনাকেই বলছি, ম্যাডাম।"
সঙ্গে সঙ্গে সেরাফিনা নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল।
"কেন ভাইয়া, আমার ড্রেসিং সেন্সে আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে? আর যদি হয়েও থাকে, তাহলে আমার কিছু করার নেই। আপনি তো দেখছি শোক পালন করার জন্য সাদা কাপড় পরে চলে এসেছেন।"
সেরাফিনার মুখে 'ভাইয়া' ডাকটা শুনতেই জেহেফিলের ঠোঁটের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে জেনিফার কণ্ঠ ভেসে এল—
"এই! তুই কাকে ভাইয়া বলছিস? এটা আমার ভাই। তোর সঙ্গে কালকেই যার বিয়ে হয়েছে, সেটা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছিস?"
কথাটা শুনে সেরাফিনা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
"ওহ! তোর ভাইয়া তো খুব সুন্দর"
ছোট্ট একটা শব্দ বের হলো তার মুখ থেকে। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবার খাবারের প্লেটের দিকে মন দিল।
"কাল বিয়ে হয়েছে বলেই কি আমি তাকে ভাইয়া ডাকতে পারব না?আগে তো ছিল"
কথাটা বলেই এক টুকরো কাবাব মুখে পুরে দিল সে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আহাদ হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল।
জেহেফিলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
"নোভা।"
তার গলায় ছিল চাপা সতর্কবার্তা।
কিন্তু সেরাফিনা যেন কিছুই শুনতে পায়নি।
"কী? ভুল বলেছি নাকি? আপনি তো আমার থেকে বয়সে বড়ই হবেন। বড়দের ভাইয়া ডাকতেই হয়।"
এবার আহাদ সত্যিই হেসে ফেলল।
জেহেফিল ধীরে ধীরে সানগ্লাসটা খুলে হাতে নিল।
"আমাকে আর একবার ভাইয়া ডেকে দেখ।"
সেরাফিনা ভ্রু উঁচু করল।
"আচ্ছা ভাইয়া।"
দাঁতে দাঁত চেপে বললো
"তোমাকে ভাইয়া ডাকতে বারণ করেছি"
সেরাফিনা ও খাবার মুখে রেখেই বললো।
"আপনি তো বললেন 'আর একবার ভাইয়া বলে ডেকে দেখ'আপনার শুনতে খুব ভালো লাগছে মনে হয়"
জেহেফিল এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন পৃথিবীর সব হ্যাকারকে সে ক্ষমা করতে পারে, কিন্তু এই মেয়েটাকে না।
সেরাফিনা জেহেফিল এর কাছে এগিয়ে এলো"আমার রুমে পর্যন্ত ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছেন আপনি, আমার রুম ও কি আপনার কাজের জায়গা একটা মেয়ের রুমে ক্যামেরা লাগিয়ে ছেন"
জেহেফিল সেরাফিনার একদম কানের কাছে এগিয়ে এসে বলে"মেয়েটা যদি বিবাহিত স্ত্রী হয় তাহলে তো বাথরুম সহ জামাতেও ক্যামেরা লাগানো উচিত"
কথা টা শুনে সেরাফিনার জেহেফিল এর থেকে কয় একহাত সরে যাই"লজ্জা করে নাহ আপনার"
জেহেফিল মুচকি হাসি টেনে বলে"দেখো দু জোনের মধ্যে তো এক জন কে র্নিলজ্জ হতে হবে না হলে বাবু কি করে হবে"
সেরাফিনার ইচ্ছা হচ্ছে বন্দুক টা এনে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিতে মানুষ কতটা র্নিলজ্জ হলে এত মানুষের সামনে এই সব কথা বলতে পাড়ে।
সেরাফিনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"আপনি একটা অসহ্য মানুষ।"
"এটা নতুন কিছু না। আরও ভালো কোনো অভিযোগ থাকলে শুনতে পারি।"
আশপাশে থাকা কয়েকজন তাদের কথোপকথন কৌতূহল নিয়ে দেখছিল। আর সেরাফিনার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি পৃথিবী থেকে একজন মানুষকে উধাও করার ক্ষমতা তার থাকত, তাহলে সেই তালিকায় জেহেফিলের নামই সবার আগে।
"সিফান কে আপনিই মেরেছেন"
জেহেফিল এটা আশা করতে পারেনি যে সেরাফিনা এই কথাটা বলবে। সেরাফিনা জেহেফিল এর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
"তোমার কি মনে হয়" জেহেফিল সেরাফিনার একদম সামনে দাঁড়ায়।
সেরাফিনা একটু হেসে বললো "আমার তো তাই মনে হয় না হলে কি আমি আপনাকে বলতাম"
জেহেফিল ও কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞাসা করলো "তোমার কেন মনে হলো, যে খুন টা আমি করেছি"
"আপনি জানেন যে সিফান এর খুন হয়েছে?"
____________________________
শেখ বাড়ির বিশাল হলরুমজুড়ে আজ শোকের ভারী আবহ। চারদিকে মানুষের কোলাহল থাকলেও সেই শব্দগুলো যেন বিষাদের চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।
সিফানের মা, সাহিদা বিবি, বুকভাঙা কান্নায় বারবার ভেঙে পড়ছেন। উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সন্তানের শোক কি আর কয়েকটি কথায় মুছে যায়? তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে।
হলরুমের এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সেরাফিনা ও জেনিফা। দু'জনের চোখই স্থির সাহিদা বিবির দিকে। তাদের থেকে কিছুটা দূরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে জেহেফিল।
ঠিক তখনই চারদিক ভরে উঠল যোহরের আজানের সুরে। সেই সুর যেন শোকাহত পরিবেশটাকে আরও ভারী করে তুলল। লাশের জানাজার প্রস্তুতি চলছে। সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহটিকে ঘিরে মানুষের ব্যস্ততা, আর এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ।
সাহিদা বিবির কান্না দেখে সেরাফিনার বুকের ভেতরটাও কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করল সে। এই নারী তো কখনো তার কোনো ক্ষতি করেননি। বরং প্রতিবার দেখা হলে মমতার চোখেই তাকিয়েছেন। আজ সেই মমতাময়ী মাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে সেরাফিনার মন অকারণ ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু সাহিদা বিবি কি সিফানের কুকর্মের কথা জান তো? জানলে হইতো এই ভাবে ছেলের জন্য কান্না করতো নাহ।
Happy Reading ☺
To Be Continue 😅