পর্ব - ২১
দুজনেরই খাওয়া শেষ হয়। বুবুন বলে, "তাহলে কি ঠিক করলে?" নিজের কাছে ধরা পড়ে যায়, ওর বুক ঢিপঢিপ করছে উত্তরের অপেক্ষায়।
--"বিয়ে করব। কিন্তু মাম্মাম ঠিক হয়ে গেলে আমি মাম্মামের কাছে চলে যাব। আর তোমাদের বাড়িতে থাকব না। মাম্মামের সঙ্গেই গিয়ে থাকব।"
বুবুন অবাক, একটু কি চিনচিন করছে বুকের মধ্যে? তবুও ওর ভিতরের সায়েন্টিস্ট ডঃ অনীশ মুখার্জী বলে, "বেশ তো। তাই হবে। তবে নিজের স্বপ্নপূরণ করতে চাইলে তোমাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। তুমি মায়ের অপারেশন হয়ে গেলেই এখানে ইউনিভার্সিটিতে এ্যাডমিশন নিয়ে নাও। পড়াশোনার ব্যাপারে যা হেল্প লাগে আমাকে বোলো, আমি করব। এমনভাবে নিজেকে তৈরি করো, যাতে জীবনে কারও হেল্প না লাগে। যখন আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবে, তখন যেন নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পার। তোমাকে নিয়ে তোমার মাম্মামের আর কোনো চিন্তা না থাকে।"
--"আমিও তাই চেয়েছিলাম জানো। আমি এত বড় হব, এত পপুলার পারসন হব, আমার নাম নিউজপেপারে আসবে, টিভিতে, মিডিয়াতে, আমার ব্লগের জন্য লোকে পাগল হয়ে যাবে। তাহলে আমার বাপি যেখানেই থাক, ঠিক জানতে পারবে। আমি বাপিকে দেখিয়ে দিতে পারব, আমি রুইনড হয়ে যাইনি, আমার মাম্মাম হেরে যায়নি।"
যা কোনদিন কাউকে বলেনি রুমু, আজ কি করে সেই গভীর গোপন ইচ্ছে মুখে ফুটে উঠল। আর বলে ফেলার প্রথম ঝোঁক কেটে যেতেই রুমু কাঠ হয়ে গেল।
বুবুন বুঝতে পারে রুমুর দ্বিধা। মুহূর্তের মধ্যে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখের তারা থেকে কিশোরীর স্বপ্নের ঔজ্জ্বল্য উধাও। মুখ নিচু করে ওর সঙ্গে চোখাচোখি এড়াতে চাইছে।
কিচ্ছু বোঝেনি ভাব করে বুবুন বলে, "তুমি একদিন অনেক বড় হবে। তার জন্য যা চাই আমাকে বোলো, আমি ব্যবস্থা করব। এখন উঠি? নাকি তুমি আর কিছু খাবে? লজ্জা পেও না। আমাকে বলতে পার। বললাম না, আমি তোমার বন্ধু।"
রুমু মাথা নাড়ে, খাবে না।
--"তাহলে চল। ওরা আসতে এখনও একঘন্টার বেশি দেরি। আর তিন ঘন্টা বললেও কখন আসবে ঠিক নেই।" বুবুন ওয়েটারকে ডাকে বিল দিতে।
রুমু বলে, "আমি কিন্তু শেয়ার করব।"
--"উঁহু, তুমি না।"
--"কেন? আমি মেয়ে বলে?"
--"তুমি ছোট আর রোজগার করো না বলে। যেদিন চাকরি করবে, বা ব্লগার হয়ে রোজগার করবে, আমাকে খাওয়াবে। এখানে আসব খেতে। আমি কিন্তু তোমার মতো খুঁটে খুঁটে খাব না। বাড়ি থেকে একপেট খেয়েও আসব না। বুঝেছ?"
রুমু ফিক করে হেসে ফেলে। বুবুন নিশ্চিন্ত হয়, সত্যিই বাচ্চা একটা মেয়ে।
পেমেন্ট করে বুবুন একপাশে সরে এসে ওয়েটার ছেলেটিকে বলে, "ভাই কিছু মনে করবেন না। ওর মন ভাল নেই। মায়ের খুব শরীর খারাপ। আজকেই সেটা জেনেছে।"
ছেলেটি জিভ কেটে বলে, "কি যে বলেন না স্যার। একদম বাচ্চা মেয়ে। ওনার কথায় আর কি মনে করব? বরং ওনার মা তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যাক, এই প্রার্থনা করি।"
-"থ্যাঙ্ক ইউ। নিশ্চয়ই আপনার প্রার্থনায় কাজ হবে।" বুবুন বেরিয়ে আসে।
🌿🌹🌿🌹🌿🌹🌿
রুমু বলে, "তুমি ঐ ছেলেটার সঙ্গে কি কথা বলছিলে?"
--"ওকে বললাম কিছু মনে না করতে। একটা কথা বলি রুমু, তুমি কিন্তু কাজটা সত্যিই ভাল করোনি। ওরা গরীব হতে পারে, কিন্তু মন দিয়ে নিজেদের কাজ করে, সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করে। আমাদের কি দেখে শেখা উচিত নয়?"
রুমু ওর দিকে ফিরে একটু কাছে এগিয়ে এসে বলে, "সরি, আর করব না। আর তোমাকেও সরি। তোমার সঙ্গেও মিসবিহেভ করেছি।"
রুমুর কাচুমাচু মুখটা দেখে আবার বুকের মধ্যে মুচড়ে ওঠে ওর। একটু ম্লান হাসার চেষ্টা করে বলে, "আমিও সরি। তোমাকে ওভাবে ধমকানো উচিত হয়নি বাইরের লোকের সামনে। আসলে তুমি আমার কথা শুনছিলে না, বুঝতে চাইছিলে না। তার মধ্যে ঐ ছেলেটাকে ধমকাতে গেলে। সরি রুমঝুম।"
রুমুও একটু ফ্যাকাশে হাসে।
পাশের একটা দোকান থেকে বড় একটা চকলেট বক্স কেনে বুবুন, রাস্তায় নেমে বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে, "চল বন্ধুত্ব। কি হল নাও। তোমার জন্যই কিনেছি।"
চকলেট পেয়ে রুমুর মুখের হাসিটা সত্যিই মন ভাল করে দেয়।
ও বলে, "এবার একটা ক্যাব নিয়ে নিই। চল, বাড়ি যাই।"
ফোনটা হাতে নেয় এ্যাপক্যাব বুক করবে, রুমু হঠাৎ বলে, "আচ্ছা এদিকেই গঙ্গা না? আগের দিন সবার সঙ্গে এসেছিলাম। চল না গঙ্গার ধারে ঘুরে আসি। আমার খুব ভাল লেগেছিল।"
সত্যিই অল্প পথ গঙ্গার ধার। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে আসে, একটা বসার জায়গা খু্ঁজে রুমুকে বসতে বলে।
রুমু বসে ওকেও ডাকে, '"তুমি বোসো, হয়ে যাবে।"
বুবুন মাথা নাড়ে, "তুমি বোসো। তবে বেশিক্ষণ না। কেমন? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।"
চলবে