Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 14

ঐশী তার চারপাশের পরিবেশ বোঝার চেষ্টা করছিল।
ডাইনিং টেবিলের ওপর তখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।
রাশিক একবার ঐশীর দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ ফেরাচ্ছে আযলানের দিকে—
যেন কিছু একটা বুঝে ফেলেছে, কিন্তু মুখে কিছু বলছে না।
সাদ্দিক পাশে বসে মুচকি মুচকি হাসছে, তার হাসির আড়ালেও কৌতূহল।
আহাদ নিজের মতো করে খাবার তুলে নিচ্ছে, যেন এই নীরব উত্তাপের জগতে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।

ঐশী বুঝতে পারছিল না কী করবে।
রাশিকের স্থির দৃষ্টি তার গাল লাল করে তুলছে, বুক ধড়ফড় করছে।
লজ্জায় সে চোখ নামিয়ে ফেললো,
কিন্তু মনে হলো, এই টেবিলের প্রতিটি চামচের আওয়াজ,
প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি দৃষ্টি যেন তাকে ঘিরে রেখেছে অদ্ভুতভাবে।

টেবিলের ওপাশে বসে আছে আযলান।
তার হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, ঠোঁটে একরাশ শান্ত হাসি—
যেন কিছুই ঘটেনি গত রাতে।
যেন সেই রাতের নিঃশব্দ উত্তাপ,
ঐশীর চোখে ঝলসে ওঠা দ্বিধা, কিছুই তার কাছে অর্থহীন।
কিন্তু ঐশী জানে—
সেই মৃদু হাসির আড়ালে আছে এমন কিছু গল্প,
যা উচ্চারণ করলে পৃথিবীও থেমে যাবে।

এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো।
আযলানের দৃষ্টি গাঢ়, স্থির—
তাতে কোনো প্রশ্ন নেই, তবুও যেন হাজারটা উত্তর লুকিয়ে আছে।
ঐশীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো,
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, যেন বাতাস ঘন হয়ে গেছে।
সে মুখ ফিরিয়ে নিল তাড়াতাড়ি,
কিন্তু সেই দৃষ্টির ছোঁয়া তার ভেতরে রয়ে গেল—
অজানা কোনো টান, অজানা কোনো আগুনের মতো।

“তুমি ঠিক আছো তো, ঐশী?”
আযলানের কণ্ঠ ছিল অবিশ্বাস্য কোমল,
যেন প্রতিটি শব্দে কোনো অনুচ্চারিত যত্ন মিশে আছে।
ঐশী মাথা নাড়লো ধীরে, কিছু বললো না।
চুপচাপ বসে রইলো, অথচ তার বুকের ভেতরে যেন অজানা এক আর্তনাদ বাজছে,
যার শব্দ কেউ শুনতে পায় না।

আযলান টেবিলের নিচে হাত রাখলো নিঃশব্দে—
তার আঙুলগুলো মেলে ধরলো, অজান্তেই ঐশীর হাতের কাছে চলে এলো।
দু’জনের হাত ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য—
এক ঝলক স্পর্শে শরীর জুড়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল।
ঐশী ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিল,
কিন্তু ততক্ষণে হৃদয়ের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।

“কাল রাতে তুমি ঘুমাওনি,”
আযলানের কণ্ঠ নিচু, ধীর, কিন্তু তাতে লুকানো তীক্ষ্ণতা।
“চোখ বলছে সব।”

ঐশী ঠোঁট কামড়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
চোখে কোনো কথা নেই, তবুও চোখের কোণ কেঁপে উঠলো।
আযলান সেটাও দেখলো, কিন্তু কিছু বললো না।
নীলিমা চৌধুরী মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
"তো বাবা, কবে দেশে ফিরলে?"আযলান বিনীত হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বলল,
"জ্বী আন্টি, আমি পরশুদিনই দেশে ফিরেছি।"নীলিমা চৌধুরীর চোখে মমতার ছোঁয়া, স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
"অনেক বড় হয়ে গেছো তুমি! মনে আছে, ছোটবেলায় কতো দৌড়ঝাঁপ করতে—
এখন একেবারে পরিপূর্ণ যুবক! পরিবারের সবাই কেমন আছে?"আযলান হালকা মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালো আছেন।""তো ইটালিতে এখন কী করছো, বাবা?""আমার নিজের একটা কোম্পানি আছে, আন্টি।
তাছাড়া এখন আব্বুর কোম্পানিটাও আমি সামলাই।"নীলিমা চৌধুরীর মুখে প্রশান্তি ও গর্বের আলো ঝলমল করে উঠল—
"বাহ, এত অল্প বয়সে এত বড় দায়িত্ব! সুখে থেকো বাবা, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।""জ্বী আন্টি, দোয়া করবেন,"
ভদ্র গলায় উত্তর দিল আযলান।এরপর তিনি পাশে বসা আহাদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন,
"এই ছেলেটাকে তো আগে দেখি নাই, কে ও?"আযলান মুচকি হেসে বলল,
"ও আহাদ— আমার ছোটো পাপার ছেলে।""ওহ, আচ্ছা!"— বলে হাসলেন নীলিমা চৌধুরী।
তার সেই হাসির উষ্ণতায় মুহূর্তেই ঘর ভরে উঠল এক স্নেহময়, পারিবারিক আবহে।
বাইরে তখন সূর্যের আলো পুরো ঘরে ঢুকে পড়েছে।
হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে,
চায়ের কাপের ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে আলোর মধ্যে।
আযলান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো,
চুপচাপ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
একবারও পেছনে না তাকিয়ে দরজায় পৌঁছে থেমে গেল।

পেছন ফিরে তাকালো সে—
চোখে মৃদু হাসি, ঠোঁটে এক চুমুক নীরবতার স্বাদ।
“ঐশী,” সে মৃদুস্বরে বলল,
“আজ রাতে আবার বৃষ্টি হবে।”

শুধু এই একটি বাক্য—
তবুও ঐশীর বুকের ভেতর ঝড় উঠলো।
সে জানে, সেই বৃষ্টি মানেই আবার এক নতুন রাত,
এক নতুন দ্বন্দ্ব,
আর একবার…
আযলান নামের এক রহস্যের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া।আযলান, রাশিক, আহাদ ও সাদ্দিক বাড়ির সবাই কে বিদায় জানিয়ে, নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালো।

ঐশী একা বসে আছে ঘরের কোণে। জানলার পর্দা অর্ধেক টানা, বাইরে বিকালের আলো মিশছে নরম অন্ধকারে।
সারা দিন তার ভেতরে চলেছে এক নিঃশব্দ লড়াই —
আযলানের সেই শেষ বাক্যটা যেন মন্ত্র হয়ে রয়ে গেছে কানে, “আজ রাতে আবার বৃষ্টি হবে।”সত্যিই, বাইরে এখন বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
মেঘগুলো ঘন হচ্ছে ধীরে ধীরে, আর ঐশীর বুকের ভেতর সেই গন্ধে মিশে উঠছে এক অদ্ভুত কাঁপুনি।সে উঠে দাঁড়ালো। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ —
চোখে ক্লান্তি, কিন্তু গভীর কোথাও একটি আলো জ্বলছে, যা হয়তো আশা নয়, আবার পুরো অন্ধকারও নয়।ঠিক তখন দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
ঐশী চমকে উঠল।
ভেতরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, তারপর আবার সেই টোকা — এবার একটু জোরে।ঐশী দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল।
হাত উঠিয়ে দরজার কাঁটা ছোঁয়াতে গিয়েও তার গলা শুকিয়ে গেল।
মস্তিষ্কে শুধু একটিই ভাবনা ঘুরছে — সে? নাকি অন্য কেউ?“ঐশী…”
একটা নিম্ন, শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠস্বর।
তারপর নিঃশব্দ বিরতি।
ঐশীর বুকের ভেতর ঢেউ খেলল — সেই কণ্ঠস্বর সে চেনে, খুব ভালো করেই চেনে।
দরজা খুলে গেল ধীরে। লাইবা আর রাইশা দাঁড়িয়ে আছে। "ওই শালীর মে  দরজা খুলতে এতো সময় লাগে, কখন থেকে ডাকছি, দরজা খুলিস নাই কেন,কি করছিলিস,ঘড়ে কেউ আছে নিঃচয়"লাইবা কথা গুলো বলে রুম চেক করতে থাকে। ঐশী আর রাইশা অবাক দৃষ্টি তে তাকিয়ে থাকে লাইবার দিকে।
ঐশী রেগে যায়—"হ্যাঁ রে ভাই, রুমে তোর দুলাভাই আছে কেন এলি এই সময়, বাসর করছিলাম তো দুর হ তোরা দুজন"
"আমাদের ছাড়া বাসর করবি না.... মানে  আমরা ও একটু দেখি আগে বলতে পাড়তিস  ক্যামেরা আনতাম"লাইবার কথা শুনে ঐশীর মেজাজ সপ্তম আসমানে উঠে যায়। লাইবা নিম্ন কন্ঠে বলে উঠে—
" আমরা যেটা করি একসাথে করি, বা.. সর টা না হয় এক সাথেই করলাম"
"এই বাল যাবি,নাকি মাড় খাবি"ঐশী আর লাইবার কথার মাঝে রাইশা ধমকের সুরে বলে উঠলো—
"এই তোরা থামবি, মুখে যে টা আসছে বলে দিচ্ছিস, অসভ্র মেয়ে দুটো, কোনো ম্যানার্স নেই মেয়ে দুটোর মাঝে"
রাইশার কথা শুনে ঐশী আর লাইবা হু... হা করে হেসে উঠলো। রাইশা  ভ্রু  উচু করে তাদের দুজন কে দেখতে থাকে। ঐশী পেটে হাত দিয়ে মেঝে বসে পড়ে। লাইবা হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ে। দু জনার নাজেহাল অবস্থা দেখে রাইশা বিরক্ত প্রকাশ করে। ঐশী উঠতে উঠতে বলে—
"রাশিক ভাইয়া বাড়িতে নেই, তো এতো নাটক করার কিছু নেই" ঐশীর কথা শুনে রাইশার মুখ কালো হয়ে যায়। 
কিছুক্ষণ চল্লো তিন বলদের মধ্যে কথাগপন। 
"ভাই, জানিস কী হয়েছে?" — লাইবার কথায় ঐশী আর রাইশা দু’জনেই থমকে তাকাল ওর দিকে।
লাইবার মুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য, যেন কোনো বড় খবর লুকিয়ে আছে ওর চোখে।

"আরে আমি মজা করছি না ভাই!" — ওর গলায় উদ্বেগ মিশে গেল,
"কাল যে ছেলেটা ঐশীকে সেই চিঠিটা দিয়েছিল… ওর অবস্থা খুব খারাপ!"

ঐশী আর রাইশা বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
"কি বলছিস তুই, লাইবা! কী হয়েছে ওর?" — কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল রাইশা।

লাইবা ধীরে ধীরে বলল,
" গতরাতে ওর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে"
রাইশা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল,
"অ্যাকসিডেন্ট! কিন্তু কিভাবে?"
লাইবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল,
"বলে না ভাই, ভাগ্য কখন কার খেলা দেখায়... , ওকে নাকি ইচ্ছা কৃত ভাবে মাড়া  হয়েছে, কয় একজন গার্ড এসে খুব মেড়েছে, বেচারার হাত-পা ভেঙে দিয়েছে কি নিষ্ঠুর মানুষে রা কারো সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল সেদিন রাতে"
"তুই কি করে যানলি—
"আমি কাল কে তো হাসপাতালে গিয়েছিলাম, আমার মাথার সিটি স্ক্যান করার জন্য। 
"আর যাই হক সব যেন ঠিক হয়ে যায়, সবাই যেন ভালো থাকে" ঐশীর কথায় লাইবা আর রাইশা আমিন বলে উঠে। 

To be continue😅
Happy reading☺