Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 18

সকালের আলোটা জানালা দিয়ে ঢুকে ঠিক ঐশীর চোখের পাতায় এসে পড়ল।ঘুম ভাঙতেই সে একটু কুঁকড়ে গেল। বাইরে পাখির ডাক, দূরে কোথাও আজানের শেষ সুর ভেসে আসছে। আজ আলাদা দিন। আজ ইংরেজি পরীক্ষা।

ঐশী উঠে বসে ঘড়ির দিকে তাকাল।
সকাল ছয়টা পনেরো।
“ইশ্! দেরি হয়ে গিয়েছে,” ফিসফিস করে বলল সে।

ঘরটা অনেক টা বড় , আবার খুব সন্দুর করে পরিপাটি করা। দেয়ালের একপাশে বইয়ের তাক—সাজানো খাতা, রঙিন স্টিকি নোট, কিছু দোয়ার কাগজ। জানালার পাশে ছোট্ট টেবিলে কাল রাতেই গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা রাখা। পেন, অ্যাডমিট কার্ড, পানির বোতল—সব চেক করা।

বিছানা ছেড়ে নামতেই হঠাৎ বুকের ভেতর হালকা চাপ অনুভব করল ঐশী। অজানা একটা অস্থিরতা। পরীক্ষার ভয় না কি অন্য কিছু—সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না। 

হঠাৎ যেন তার বমি বমি পাচ্ছে, গাল টা যেন টক লাগছে, ওয়াশ রুমে গিয়ে হাতে ব্রাশ নেবে, তার আগেই বমি করে দেয়। খুব দূর্বল লাগছে। আয়নায় চোখ পড়তেই ঐশীর সেই রাতের ঘটনা মনে পড়ে গেল।ঐশী ভাবতে থাকে—বৃষ্টি, আযলানের ছোঁয়া আর তাদের কিস। একি সে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলো না তো। কিন্তু কি ভাবে প্রেগন্যান্ট হবে এমন কিছু কাজ তো করেনি। শুধু একটা কিসের জন্য তো হবে না। আর ও কত হিজিবিজি ভাবতে থাকে। এই সব ভাবার শেষে ঐশী নিজে নিজের মাথায় বাড়ি মারে, ইস কি সব ভাবছে, উপন্যাস পড়ে পড়ে সব নেগেটিভ জিনিস ভাবছে। ছি,,,,,,,,, 

নীলিমা চৌধুরী বাইরে থেকেই ডাকলেন,
“ঐশী, উঠেছিস? রাইশা ফোন দিয়েছে।”
ঐশী দ্রুত ওড়নাটা কাঁধে তুলে বাইরে গেল।
“হ্যাঁ আম্মা, যাচ্ছি।”
ফোনটা হাতে নিয়েই রাইশার উত্তেজিত কণ্ঠ,
“এই এই! সব পাড়বি তো? লাইবা তো সেই ভোর থেকে মেসেজ দিচ্ছে,নৌরিন তো রেগে বোম,কাল কে তোকে কত বার কল করেছে দেখেছিস!”
ঐশীর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
এই তিনজন—তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
“আমি জানি,” ঐশী বলল। “তোরা আই, স্কুলের গেটের সামনে দেখা হবে।”
কল কেটে দিয়ে সে একবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। সাদা সালোয়ার-কামিজ, হালকা নীল ওড়না। চোখের নিচে সামান্য কালি—কাল রাতের জেগে পড়ার চিহ্ন।
নিজেকে দেখে সে খুব নিচু গলায় বলল,
“আজ ভালোই হবে।”

সকাল 9:00 টার একটু পর।
রাস্তায় হালকা কোলাহল। অটো, রিকশা, পরীক্ষার্থীদের ভিড়। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঐশী চারপাশে তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে চিৎকার,
“ঐশীইইই!”

ঘুরতেই রাইশা—হাত নাড়তে নাড়তে দৌড়ে আসছে। চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, ব্যাগে ঝুলছে লাকি কি-চেইন।
“শুন,” রাইশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি স্বপ্ন দেখেছি আজ প্রশ্ন কমন!”

ঐশী হেসে ফেলল।
“তোর স্বপ্নে সবসময়ই কমন আসে।”
ঠিক তখনই লাইবা এসে হাজির। এক হাতে চিপসের প্যাকেট, অন্য হাতে ব্যাগ।
“এক্সাম সেন্টারে ঢোকার আগে খেলে নিলে ব্রেইন অ্যাক্টিভ থাকে,” সে বিজ্ঞের মতো বলল।
নৌরিন সবার শেষে এল। একটু চুপচাপ, চোখে হালকা নার্ভাসনেস।
“আমার পেন ঠিক আছে তো?” সে আবার জিজ্ঞেস করল।
ঐশী তার হাত ধরে বলল,
“আছে। আর না থাকলেও আমরা আছি।”

চারজন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে সেন্টারের দিকে এগোল। চারপাশে শত শত মুখ, কিন্তু তাদের নিজেদের ছোট বৃত্তে যেন আলাদা একটা পৃথিবী।

পরীক্ষা হল।
ঘরের ভেতর গুমোট বাতাস। দেয়ালে বড় ঘড়ি—টিক টিক শব্দে সময় গুনছে। ঐশী বেঞ্চে বসে প্রশ্নপত্র হাতে নিল।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড শ্বাস আটকে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামল লাইনের ওপর।
প্রশ্নগুলো পরিচিত। খুব সহজ না, খুব কঠিনও না।
কলম চালু করল সে।

লেখার ফাঁকে ফাঁকে জানালার বাইরে তাকাল। আকাশটা আজ অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে যেন মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত ছবি ভেসে উঠল—অন্ধ্যকার আকাশ, ঝিড় ঝিয়ে বৃষ্টি, হালকা হাওয়া, রাস্তার ধারে অবস্থিত সোডিয়ামের আলো, কালো স্পোর্টস বাইক, কালো জ্যাকেট পরিহিত সেই যুবক—যা ঐশীর মনে খুব বাজে ভাবে ছাপ ফেলে গিয়েছে, ঐশী চাইতে ও মন থেকে সরাতে পাড়ছে না। ঐশী নিজের ঠোঁট কামরে ধড়ে। সেই কিসের কথা ভাবলেই, মনে হয় যেন মাটি ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে যাওয়ার ইচ্ছা হয়। 

ঐশী এক ঝাঁকুনি দিয়ে আবার খাতায় মন দিল।
“ফোকাস,” নিজেকে বলল সে।

পরীক্ষা শেষ।
বাইরে বেরোতেই চারজনের একসাথে নিঃশ্বাস ছাড়া।
“আলহামদুলিল্লাহ!” লাইবা বলল।

রাইশা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ধরল,
“এই যে ১ নম্বরটা—তুই কী লিখেছিস?”

ঐশী চুপচাপ ছিল। রাইশা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”

ঐশী একটু ইতস্তত করে বলল,
“জানি না কেন… আজ সকাল থেকে মনটা অদ্ভুত লাগছে। বমি ও হয়েছে,কিছু ভালো লাগছে না”
ঐশীর কথা শুনে তৎক্ষনাত লাইবার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। 

"আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আমি বলেছিলাম না, যে তুই আমার আগে মা হবি, দেখ সত্যি হলো তো"
লাইবার কথায় তিন জন এক সাথে লাইবার মাথায় ঠাস করে মাড়ে।

"সালির মেয়ে, আমার বিয়ে হয়েছে বাল, আমি মা হব,মা** ঠিক করে কথা বল"ঐশী রেগে মুখ লাল। ঐশীর অবস্থা দেখে লাইবা, রাইশা আর নৌরিন খুব ভয় পেয়ে যায়, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, কপালে বিন্দু বিন্দু পানির ফোটা দেখা যায়,রাগে কাঁপতে থাকে। 

"ঠিক আছে বাদ দে লাইবা মজা করে বলেছে, তোর শরীর খুব খাড়াপ লাগছে, আচ্ছা চল বাড়ি যায় এতক্ষনে আবদুল চাচা গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে" রাইশার কথা শুনে সবাই স্কুলের গেটের দিকে এগোতে থাকে। 

নৌরিন হতাশার শ্বাস ফেলে বলে উঠলো—
"আজ কোনো আড্ডা না, আমার তোদের সাথে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে, তোরা তো একসাথে থাকিস, আর আমি একা"  নৌরিন কথাটা এমন করে বল্লো মনে হলো যেন এখোনিই কান্না করে দেবে। 

নৌরিনের মন খারাপ হতে দেখে ঐশী নৌরিন কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধড়ে। " আরে ভাই শরীর খাড়াপ বলে তো আর তোদের ছাড়া যাবে না, চল আজ দেড়ি করে ঘড়ে যাবো, আজ আমি তোদের আইস ক্রিম খাওয়াবো"

আইস ক্রিম এর কথা শুনে তিন জনার চোখ চক চক করে উঠে। আইস ক্রিম বলে চার জন এক সাথে দোকানের উদ্দেশ্যে দৌড়র দেয়। 

বিকেলের সময় চারদিকে হালকা রোদ, হালকা বাতাস। স্কুলের সামনের আইসক্রিম দোকানের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছে ঐশী, লাইবা, রাইশা আর নৌরিন। সবার চোখ চকচক করছে—কারণ সামনে চারটা বড় বড় আইসক্রিম।

ঐশীর হাতে ডাবল চকলেট। সে খুব সিরিয়াস মুখ করে আইসক্রিমটা দেখছে, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিচ্ছে।্

লাইবা জিজ্ঞেস করল,
—“কি রে, তাকিয়ে আছিস কেন? খা না!”

ঐশী গম্ভীর গলায় বলল,
—“চকলেট আইসক্রিম সম্মান দিয়ে খেতে হয়। এটা আবেগ।”

রাইশা হেসে বলল,
—“তাহলে আবেগটা তোর হাত বেয়ে নিচে নামছে কেন?”
সবাই তাকিয়ে দেখে—চকলেট আইসক্রিম গলে গলে ঐশীর হাতে নামছে। ঐশী চমকে উঠে বলল,
—“ও মা! এটা তো দৌড়াচ্ছে!”

নৌরিন শান্ত স্বরে বলল,
—“আইসক্রিম না, তোর ভাগ্য গলছে।”
এইদিকে লাইবার স্ট্রবেরি আইসক্রিম। গোলাপি রঙ দেখে সে নিজেই খুশি।
—“এই আইসক্রিমটা আমার মতোই সুন্দর,” সে বলল।
ঠিক তখনই লাইবা হাঁচি দিল—হাঁচু!
স্ট্রবেরির ছোট্ট দাগ এসে পড়ল তার নাকের উপর।
রাইশা হেসে বলল,

—“এই দেখ! আইসক্রিম তোর মেকআপ করে দিল!”
লাইবা চোখ কুঁচকে বলল,
—“ফ্যাশন ট্রেন্ড, বুঝলি?”
রাইশা নিজের ভ্যানিলা আইসক্রিম খুব সাবধানে খাচ্ছিল। হঠাৎ বলল,

—“আমি খুব স্মার্ট। আমার আইসক্রিম একদম পড়বে না।”
এই কথা শেষ হওয়ার আগেই—প্লপ!
আইসক্রিম সোজা মাটিতে।

নৌরিন মাথা নেড়ে বলল,
—“আইসক্রিমের সাথেও বেশি বড় বড় কথা বলা ঠিক না।”
সবাই এত হাসল যে আশপাশের লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু চার জনার তাতে কোনো ইন্টারেস্ট নেই তারা তাদের খাওয়া এবং মজা তে ব্যাস্ত। যেন পৃথিবী তে তাড়া তিন জন বেঁচে আছে। 

দোকানদার কাকু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
—“আরেকটা নেবে?”

চারজন একসাথে চিৎকার করে বলল,
—“নেবো!”
শেষে চারটা আইসক্রিম শেষ, হাত-মুখে দাগ, ইউনিফর্মে চকলেটের ছাপ—কিন্তু হাসিটা কারো মুখ থেকে আর গেল না।

ঐশী বলল,
—“আজ বুঝলাম, আইসক্রিম শুধু ঠান্ডা না—এটা আনন্দও।”
চারজন আবার হেসে উঠল।

To Be Continued😅
Happy reading ☺