দূরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে প্রথম দেখায় পুরোটা বোঝা যায় না, কারণ সে মাইশার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। তবু অদ্ভুতভাবে তার উপস্থিতিটাই চোখে পড়ে যায়।
ছেলেটার গায়ে হালকা রঙের একটা পাঞ্জাবি। খুব চড়া নয়, খুব সাদামাটাও নয়—ঠিক বিকেলের আলো আর বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে যাওয়া একটা রঙ। পাঞ্জাবিটার কাপড়টা নরম, হালকা বাতাসে সামান্য দুলছে। হাত দুটো পাঞ্জাবির পাশে স্বাভাবিকভাবেই ঝুলে আছে, কিন্তু সেই ভঙ্গিতেই একটা আত্মবিশ্বাস লুকিয়ে আছে।
তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি খুব শান্ত। যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। পা দুটো মাটিতে স্থিরভাবে রাখা, কাঁধ দুটো সোজা। দেখে মনে হয়, সে জানে—যাকে সে অপেক্ষা করছে, সে ঠিক আসবেই।
পিছন থেকে দেখা যায় তার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। খুব বেশি স্টাইল করা নয়, আবার একেবারে এলোমেলোও না। ঘাড়ের কাছে চুলগুলো একটু ছোট, পরিষ্কার। ঘাড়টা সোজা, দৃঢ়—যেন দায়িত্ব নিতে জানে এমন একজন মানুষের ঘাড়।
ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পার্কের ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে আছে। পানির ঝিলমিল আলো তার পাঞ্জাবির উপর এসে পড়ছে। সেই আলো-ছায়ার খেলায় তাকে আরও আলাদা করে ফুটে উঠছে। আশপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—তবু তাকে দেখলে মনে হয়, সে নিজের একটা আলাদা জগতে দাঁড়িয়ে আছে।
তার পুরো উপস্থিতিতে কোনো বাড়তি নাটক নেই। তবু পেছন থেকে দেখেই বোঝা যায়—এই ছেলেটার মধ্যে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে। এমন একজন, যে খুব জোরে কথা বলে না, কিন্তু যার নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়।
মাইশার বুকের ভেতরটা অজান্তেই কেঁপে উঠল।
এই পাঞ্জাবি-পরা ছেলেটার পিঠ দেখা মাত্রই তার মনে হলো—এই মানুষটাকে সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।
এখন শুধু বাকি একটাই মুহূর্ত—
সে ঘুরে দাঁড়ালে, চোখে চোখ পড়লে, সব নিশ্চিত হয়ে যাবে।
মাইশা থমকে দাঁড়িয়ে রইল। দূরত্বটা খুব বেশি নয়, তবু সেই কয়েকটা সেকেন্ড তার কাছে অসম্ভব লম্বা মনে হলো। পাঞ্জাবি-পরা ছেলেটা এখনো পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসে তার পাঞ্জাবির নিচের দিকটা একটু নড়ছে, ফোয়ারার পানির শব্দ মিশে যাচ্ছে বিকেলের নরম কোলাহলে।
হঠাৎ যেন কিছু টের পেল সে।
ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথাটা ঘোরাল। তারপর শরীরটা। খুব তাড়াহুড়ো করে না, আবার ইচ্ছা করেও দেরি করছে এমনও নয়। সেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিটা মুহূর্তে মাইশার বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা আরও জোরে হয়ে উঠল।
শেষমেশ সে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল।
মাইশার চোখ প্রথমে পড়ল তার চোখে।
চেনা চোখ। খুব চেনা। এমন চোখ, যেগুলো চার বছর ধরে কখনো অভিমান করেছে, কখনো হাসিতে ভরে উঠেছে, আবার কখনো নীরবে অনেক কথা বলে ফেলেছে। সেই চোখের দিকে তাকিয়েই মাইশা বুঝে গেল—ভুল হয়নি।
ছেলেটার মুখে হালকা একটা হাসি। বড় করে নয়, আবার লুকোনোও নয়। এমন একটা হাসি, যেটা শুধু কাছের মানুষদের জন্য তোলা থাকে। গালের একপাশে হালকা ভাঁজ, চোখের কোণে নরম উষ্ণতা।
পাঞ্জাবিটা সামনে থেকে আরও সুন্দর লাগছে। বোতামগুলো পরিপাটি করে লাগানো, কলারটা ঠিকঠাক। তার পুরো উপস্থিতিতে একটা শান্ত ভরসা আছে—যেন সে ঠিক এখানেই থাকার জন্য এসেছে, ঠিক এই সময়টার জন্যই।
মাইশা নিজের অজান্তেই গোলাপগুলো আরও শক্ত করে ধরে ফেলল। এতক্ষণ যে রাগ বুকের ভেতর জমে ছিল, সেটা মুহূর্তেই গলে গেল। তার জায়গায় এসে বসলো একরাশ আবেগ—অভিমান, ভালোবাসা, অপেক্ষা, সব একসাথে।
ছেলেটা এক পা এগিয়ে এলো।
নরম গলায় বলল,
“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জান, এত রাগ করছ কেন?”
এই একটা প্রশ্নেই মাইশার চোখ ভিজে উঠল। এতক্ষণ সে যা বলতে চেয়েছিল, যা মনে মনে প্রস্তুত করেছিল—সব কথা হঠাৎ হারিয়ে গেল।
সে শুধু বলল,
“এক ঘণ্টা দেরি করেছ।”
ছেলেটা হালকা হেসে মাথা নুইয়ে বলল,
“তাই তো… একটা ঘণ্টা আর চার বছরের অপেক্ষা—এই দুটো মেলাতেই দেরি হয়ে গেল।”
পার্কের বিকেলের হাওয়া তখনও বইছে। ফোয়ারার পানি আগের মতোই ঝিলমিল করছে। বাচ্চাদের হাসি, পাখির ডাক—সবকিছু আগের মতোই আছে। শুধু বদলে গেছে মাইশার ভেতরের পৃথিবীটা।
সে জানত, এই ঘুরে দাঁড়ানোটা শুধু শরীরের নয়—
এটা চার বছরের সম্পর্কের একটা নতুন শুরু।
ছেলেটা ধীরে ধীরে মাইশার সামনে এসে দাঁড়াল। দু’জনের মাঝখানে অল্প দূরত্ব, তবু সেই দূরত্বে লুকিয়ে আছে চার বছরের না বলা কথা। পার্কের হালকা হাওয়া মাইশার হিজাবের কোণটা আলতো করে নাড়িয়ে দিল।
ছেলেটা নরম গলায় বলল,
—“তুমি রেগে আছো জানতাম… তাই সামনে আসতে একটু ভয় লাগছিল।”
মাইশা চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁট কামড়ে বলল,
—“ভয়? চার বছর পরে তোমার ভয় হয়?”
ছেলেটা হালকা হেসে বলল,
—“চার বছর পরে ভয়টা আরও বেড়েছে। কারণ এখন হারানোর মতো কাউকে পেয়েছি।”
মাইশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ছেলেটা আবার বলে উঠল—
—“জানো, দেরি করেছি ঠিকই… কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলে যাইনি তোমাকে।”
মাইশা ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
—“তাহলে আমাকে এক ঘণ্টা বসিয়ে রাখলে কেন?”
ছেলেটা সামনে এগিয়ে এসে খুব আস্তে বলল,
—“কারণ চাইছিলাম, তুমি বুঝো—অপেক্ষার মাঝেও ভালোবাসা থাকে। আর তুমি যে অপেক্ষা করেছো, সেটাই প্রমাণ করে তুমি আমাকে এখনো নিজের মানুষ ভাবো।”
মাইশার চোখ ভিজে গেল।
—“আমি রাগ করেছিলাম… কারণ তুমি না থাকলে এই পার্কটা ফাঁকা লাগে।”
ছেলেটা নরম হাসিতে বলল,
—“আর আমি না থাকলে তুমি যে সুন্দর করে রাগ করো—সেটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।”
মাইশা হেসে ফেলল, চোখের কোণে জল জমে।
—“সবাইকে দিয়ে গোলাপ পাঠালে কেন?”
ছেলেটা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কারণ আমি চাইনি, তুমি একা বসে থাকো। আর তুমি রাগ করেছিলে … তাই ভাঙানোর চেষ্টা করছিলাম।”
মাইশা ফিসফিস করে বলল,
—“তুমি জানো, তোমার এই কথাগুলো আমাকে দুর্বল করে দেয়?”
ছেলেটা খুব ধীরে, খুব নিশ্চিত গলায় বলল,
—“দুর্বল না… তুমি আমার সামনে শক্ত থাকার দরকার বোধ করো না—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
পার্কের ফোয়ারার শব্দটা তখন আরও স্পষ্ট মনে হচ্ছিল। বিকেলের আলো দু’জনের উপর এসে পড়েছে।
মাইশা আস্তে করে বলল,
—“চার বছর কেটে গেল…”
ছেলেটা মুচকি হেসে জবাব দিল,
—“চার বছর শুধু সময় না, মাইশা… চার বছর মানে তুমি আমার জীবনের অভ্যাস হয়ে গেছো।”
মাইশা গোলাপগুলো বুকে জড়িয়ে ধরল।
—“আজকে যদি তুমি না আসতে?”
ছেলেটা চোখে চোখ রেখে বলল,
—“তাহলে এই পার্কের প্রতিটা বেঞ্চ আমাকে দোষ দিত। কারণ আমি আসার জায়গাটা এখন তুমি।”
বিকেলের হাওয়া তখন আরও নরম।
মাইশা জানত—এই ডায়লগগুলো শুধু কথা নয়, এগুলো ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি।
মাইশার কথা শেষ হতেই দু’জনের মাঝে আবার নীরবতা নেমে এলো। এই নীরবতা অস্বস্তির না—বরং ভরা, গভীর।
ছেলেটা ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। খুব সাবধানে, যেন অনুমতি চাইছে।
মাইশা কিছু বলল না। শুধু আঙুলগুলো একটু এগিয়ে দিল।
দু’জনের হাত একসাথে জড়িয়ে গেল।
কোনো নাটকীয়তা নেই। কোনো শক্ত করে ধরা নেই।
শুধু একটা নিশ্চিন্ত স্পর্শ—“আমি আছি” বলা একটা স্পর্শ।
মাইশার চোখ ভিজে উঠল।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না।
চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, আর সেই সাথে ঠোঁটে একটা ছোট্ট হাসি।
—“কাঁদছো?” ছেলেটা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
মাইশা মাথা নাড়ল। —“না… একটু হালকা হচ্ছি।”
ছেলেটা কিছু বলল না।
শুধু তার বুড়ো আঙুলটা মাইশার হাতের পিঠে খুব ধীরে বুলিয়ে দিল—
যেন বলছে, কাঁদলেও সমস্যা নেই।
মাইশা হেসে ফেলল, চোখ ভেজা অবস্থাতেই। —“এত বছর পরেও তুমি এমন করো কেন?”
ছেলেটা ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল— —“কারণ তুমি যখন হাসো আর কাঁদো একসাথে… তখন বুঝি, তুমি এখনো আমাকে বিশ্বাস করো।”
মাইশা আর নিজেকে আটকাতে পারল না।
এক ফোঁটা জল তার হাতের উপর পড়ল।
ছেলেটা সেটা টের পেল, কিন্তু কিছু বলল না।
এই নীরব সম্মানটাই ছিল ভালোবাসা।
বিকেলের আলো একটু একটু করে নরম হয়ে আসছিল।
পার্কে মানুষজন ছিল, তবু এই বেঞ্চে—
দু’জনের জন্য একটা আলাদা পৃথিবী তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মাইশা হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরল।
এইবার সে নিজেই।
আর ছেলেটা বুঝে গেল—
চার বছর অপেক্ষা বৃথা যায়নি।
To Be Continue 😅
Happy reading☺