এত কিছুর মাঝেই,আযলান খান ইভান সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছিল।কারণ তার মাথার ওপর থেকে,বাবা নামের হাতটা হঠাৎ করে সরে গিয়েছিল।যে হাতটা সবসময় ছিল—চুপচাপ মাথায় রাখা,কখনো কাঁধে,কখনো পিঠে—সেই হাতটা আর নেই।
আযলান তখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি,মৃত্যু মানে কী,সে শুধু বুঝেছিল—আব্বু আর ফিরবে না।
ঘরের ভেতর বাবার জায়গাটা খালি।কথা বলার মানুষটা নেই।রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে,যে কণ্ঠটা বলত—
“ভয় পেও না, আমি সব সময় তোমার পাশে আছি”—
সেই কণ্ঠটা চুপ হয়ে গেছে চিরতরে।আর তার সাথেই,হঠাৎ করে বদলে গেল আযলানের জীবন।এতদিন সে ছিল শুধু একটা সন্তান।আজ সে হয়ে গেল—একটা পরিবারের ভরসা।পরিবারের দায়িত্বএখন তার কাঁধে।মা আছে,কিন্তু মায়ের চোখে এত কষ্ট যে,সেই কষ্ট আগলে রাখার দায়িত্বও
আযলানের।সে জানে না কী করবে।কীভাবে করবে।কোথা থেকে শুরু করবে।ছোট বয়স,ভেতরে ভাঙাচোরা মন,আর বাইরে শক্ত মুখোশ।সে নিজেই আহত।ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
তবু সে ভাবে—আহাদের এমন কষ্টই হয় হয়তো।আহাদেরও তো বাবা নেই।কত বছর আগে মারা গেছে—সেই কোন যুগে।
আজ তার বাবা কোথায়?
রাজ্য আছে,রানি আছে,রাজপুত্র আছে—কিন্তু রাজা নেই।এই প্রশ্নটা আযলানের বুকের ভেতর,নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়।কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই।কারণ শোকের মাঝেও,সময় থেমে থাকে না।
ইভান’স গ্রুপ—এই বিশাল সাম্রাজ্যের,একমাত্র উত্তরাধিকারী এখন সে-ই।আজ আরস খানের জায়গাটা,শূন্য।আর সেই শূন্য জায়গার দিকে,সব চোখ তাকিয়ে আছে।কেউ সহানুভূতি নিয়ে,কেউ কৌতূহল নিয়ে,আর কেউ—হিংসা নিয়ে।আযলান বুঝে যায়—ভেঙে পড়লে চলবে না।সে নিজের চোখের জল,নিজেই মুছে ফেলে।বাবার শোক বুকের ভেতরে চেপে রেখে,সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ এখন,সে শুধু আর আযলান নয়—সে ইভান’স গ্রুপের উত্তরাধিকারী।ছোট বয়সেই,সে শিখে যায় এক কঠিন সত্য—
কিছু মানুষ কাঁদার সুযোগ পায়,আর কিছু মানুষকে,কাঁদতে কাঁদতেই,দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়।,আরস খানের রাজত্বে,রাজা নেই ঠিকই,কিন্তু রাজপুত্র এখন,সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে।ভাঙা মন নিয়ে,কিন্তু মাথা উঁচু করে।কারণ এই লড়াইয়ে,পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই।
পরিবেশের চাপ, মানুষের লোভ, চারপাশের শকুন-দৃষ্টি—
সব মিলিয়ে আযলান খান এক অসম যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল।একদিকে বাবাহারা হওয়ার ক্ষত,অন্যদিকে ইভান’স গ্রুপের ভার,আর চারপাশে—শত্রু, বিশ্বাসঘাতক, সুযোগসন্ধানী মানুষ।
সে তখন খুব ছোট।কিন্তু পরিস্থিতি তাকে ছোট থাকতে দেয়নি।প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙত নতুন হুমকিতে,নতুন ষড়যন্ত্রে ,নতুন মুখোশে ঢাকা শত্রুতে।কেউ তাকে সহানুভূতি দেখায়নি।
সবাই শুধু দেখতে চেয়েছে—আরস খানের ছেলে ভাঙে কিনা।
আর এই ভাঙার চেষ্টাই,আযলানকে ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছিল।আগের সেই নরম, চুপচাপ ছেলেটা,একদিন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।তার জায়গায় জন্ম নিল,একজন ঠান্ডা চোখের মানুষ—যার চোখে আবেগ নেই,আছে শুধু হিসাব।
সে শিখে নিল—এই দুনিয়ায় ভালো হলে টিকে থাকা যায় না,
ভয়ংকর হতে হয়।প্রথমে সে রক্ষা করতে শিখল।তারপর আঘাত ফিরিয়ে দিতে শিখল।এরপর—আঘাত আগেই করতে শিখল।
রাতের ইতালি তখন তার স্কুল।মিলানের অন্ধকার গলি,নেপলসের বন্দরের ছায়া,রোমের ব্যাকডোর ডিল—সব জায়গায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল একটাই নাম—
Azlan Khan Ivan.
সে আর শুধু একজন ব্যবসায়ীর ছেলে নয়।সে হয়ে উঠল ক্ষমতার প্রতীক।আইনের চোখে সে অদৃশ্য।অন্ধকার জগতের কাছে সে ঈশ্বর।ড্রাগ, অস্ত্র, কালো টাকা—সে নিজে হাতে ছোঁয় না।কিন্তু সবকিছুই তার অনুমতিতে চলে।কারণ আযলান জানত—যে নিজের হাত নোংরা করে,সে বেশি দূর যেতে পারে না।সে মানুষ কিনত না,সে ভয় তৈরি করত।একবার যার উপর তার নজর পড়ে,সে জানত—খেলা শেষ।ধীরে ধীরে,পুরো,ইতালি যেন তার মুঠোয় চলে এলো।পুলিশ চুপ।রাজনীতিবিদ নীরব।
বড় বড় ডনরা মাথা নত করল।কারণ আযলান হিংস্র ছিল না শুধু—সে ছিল বুদ্ধিমান, ধৈর্যশীল, নির্মম।তার শত্রুরা মরত হঠাৎ করে।কেউ জানত না কে মারল,কেন মারল,কিভাবে মারল।শুধু একটা কথা ছড়িয়ে পড়েছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডে—
“যদি বাঁচতে চাও,
আযলান খানের নাম মুখে এনো না।”
একসময়,ইতালির ছায়া-জগতে,তার জন্য একটা নাম তৈরি হলো—
“Mafia King of Italy.”
রাজ্য আছে,অস্ত্র আছে,মানুষ আছে,ক্ষমতা আছে—কিন্তু রাজা?সে একা।এই ক্ষমতার শীর্ষে দাঁড়িয়েও আযলান মাঝরাতে জেগে ওঠে।কারণ চোখ বন্ধ করলেইসে দেখতে পায়—বাবার মুখ।মায়ের কান্না।নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।সে জিতেছে পুরো ইতালি।কিন্তু হারিয়েছে নিজেকে।আর এই গল্প এখানেই শেষ নয়।কারণ— যে মানুষটা ভালো হতে চেয়েছিল,কিন্তু পরিস্থিতি তাকে দানব বানিয়েছে—তার পতন কিংবা মুক্তি—দুটোর যেকোনো একটাইএখন বাকি।আর সেই দিনটা,ভীষণ রক্তাক্ত হবে।
ইতালির বুকে তিনি গড়েছেন এক অভিব্যক্তিময় সাম্রাজ্য—
ইট, বাঁশি, বা সোনার নয়, বরং ভয়ের অদৃশ্য শক্তি, অনন্ত আকাঙ্ক্ষা আর নিষ্ঠুর নিয়ন্ত্রণে গঠিত এক মহাসম্রাজ্য।
এই সাম্রাজ্যের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি বায়ুর ঢেউয়ে, প্রতিটি নিশ্বাসে উচ্চারিত হয় একটি নাম—
আযলান খান ইভান।
তার নিজস্ব দুইটি কোম্পানি কেবল ব্যবসা নয়,
সেগুলো তার রাজনৈতিক শিকড়, তার অর্থের নদী, তার ছায়াময় শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত।
দু’টি প্রাইভেট প্লেন আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে যেন বলছে—
এই আকাশও তার, এই নীল অতলও তার অনুমতিতেই কথা বলে।
আর চারটি হেলিকপ্টার? সেগুলো কেবল চলাচলের হাতিয়ার নয়,
অঘোষিত সংকেত যে রাতের অন্ধকারেও তার নজর সবার ওপর, তার হাতে শক্তি নির্ভর।
রাস্তায় নামলেই কালো ঢেউয়ের মতো ছুটে চলে
৫০০টি ব্ল্যাক মার্সিডিজ;
সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে ২৫০টি বিএমডব্লিউ;
প্রায় ২০০টি রোলস-রয়েস—
প্রতিটা গাড়িই যেন নিজেরাই জানে, তারা কার জন্য, কার নামের জগতে চলছে।
কিন্তু তার সাম্রাজ্য শুধু চার চাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইতালির প্রতিটি শহরে ছড়িয়ে আছে তার বাইকের দখল—
সব রকমের নামি-দামি বাইক:
রেসিং বাইক, ক্রুজার, হেভি বাইক, কাস্টম মার্ডার ভাইরাল বাইক—
যাদের গর্জনে, যাদের থ্রটলের ঘুরে উঠা সুরে মানুষ বুঝে যায়,
এই রাস্তা কার, এই শহর কোন বন্দুকের ছায়ায়?
এই বাইকগুলো শুধু স্তুতি কিংবা শখের চিহ্ন নয়;
তারা তার গতির প্রতীক, তার প্রতিশোধের ফাঁদ,
যেখানে থ্রটল ঘুরলেই পেছনে পড়ে যায় নীরব আইন, নিয়ম, এ পরীক্ষা—
এই সাম্রাজ্যের ব্যস্ত রক্তে স্রোত বহমান।
আর এই সবকিছুর প্রদর্শনী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে নামি-দামী শোরুমের চিত্র—
ইতালির অভিজাত মহল্লায় ঝকঝকে কাঁচের দেয়াল,
নিখুঁত আলো, সূক্ষ্ম সুর, মুক্তো-সদৃশ চামড়া আর মেটাল;
একই ছাদে সাজানো সব থেকে দামি বাইক, সব থেকে ব্যাপক গাড়ি,
সেগুলো যেন নীরবে বলছে—
কার হাতের স্পর্শে এই শিল্প, এই শক্তি, এই বিলাসিতা।
এই সাম্রাজ্যের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে দু’টি অমর ঠিকানা—
একটি রহস্য আর অন্ধকারে মোড়া—
The Black Rose Mansion,
বেলাশেষ রাতের ঘুম কেটে যায়, কিংবা কখনো এক মুহূর্তের অস্থিরতা আর ব্লাড-রঙা চাঁদের লজ্জা;
আরেকটি নীরব ভালোবাসার প্রতীক—
Aishi Amore Mio,
যেখানে এই শক্তিশালী রাজাও মাঝে মাঝে নিঃশব্দ হয়ে যায়,
যেখানে তার হৃদয়কে স্পর্শ করে একটি মৃদু শব্দ, একটি অমনি ভাস্বর ভালোবাসা।
এই নামের শেষে যে শব্দটি—Amore Mio—
ইতালিয়ান ভাষায় সরাসরি My love বা আমার ভালোবাসা বোঝায়; বিশেষ করে এটি সবচেয়ে সরল ও গভীর ভালবাসার ভাষা হিসেবে চালু।
এখানে নামের সাথে জড়িয়ে গেছে প্রেমের সেই গভীর স্তর,
যা তার দখলকৃত সাম্রাজ্যের কঠোর বডি, কঠোর শক্তি, কঠোর নিয়মের মাঝেও নরম হয়ে উঠতে পারে—
একই প্রেম, একই ছোঁয়া, একই ভালোবাসা, যাকে সে নিজের ভাস্বর শ্বাসে বলে— Ayshi Amore Mio।
Rosetta Stone
এই দুই প্রাসাদের, এই আকাশ-পথ-রাস্ত-শোরুম-সাম্রাজ্যের
একমাত্র উত্তরাধিকার—
যার দিকে তাকালে শত্রুরা চোখ নামিয়ে নেয়,
আর বন্ধুরা নিশ্বাস শিথিল করে, মনে করে—
এই যে মানুষ, সে আর কেউ নয়,
ইতালির অঘোষিত রাজা,
আযলান খান ইভান।
Happy Reading☺
To Be Continue😅