Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

অন্ধকারের সংকেত - 6

নিচের দিকে নামার আগে আমরা দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দরজার ওপাশ থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল, তা অদ্ভুতভাবে শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত গলার মধ্যেই এমন এক আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে নিশ্চিত—আমরা তার ফাঁদে পা দেবই।

অরিন্দম আমার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

— রুদ্র, একটা কথা মনে রাখবে। আজ যা-ই দেখো, কোনো সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করে পৌঁছাবে না।

আমি মাথা নাড়লাম।

— তুমি কি মনে করো লোকটা আমাদের ক্ষতি করতে চায়?


— যদি ক্ষতি করতেই চাইত, তাহলে এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে যেত। আমার মনে হচ্ছে, সে চাইছে আমরা ইচ্ছা করেই তার কাছে যাই।

আমরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। পুরোনো কাঠের সিঁড়ি প্রতিটি পদক্ষেপে কঁকিয়ে উঠছিল। চারপাশে এমন নীরবতা যে আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

নিচতলায় পৌঁছে আমরা টর্চের আলো চারদিকে ফেললাম। সেখানে কেউ নেই। যে লোকটা কিছুক্ষণ আগেও কথা বলছিল, সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আমি ফিসফিস করে বললাম,

— সে কোথায় গেল?

অরিন্দম মেঝের দিকে আলো ফেলল। ধুলোর ওপর নতুন জুতোর ছাপ।

— পালায়নি। সে এখানেই কোথাও আছে।

ছাপগুলো সোজা হলঘরের এক কোণের দিকে গেছে, যেখানে একটা বিশাল কাঠের আলমারি দাঁড়িয়ে ছিল। অরিন্দম আলমারিটার চারপাশ ভালো করে পরীক্ষা করল।

হঠাৎ সে হাত দিয়ে আলমারির এক পাশ চাপতেই একটা মৃদু শব্দ হলো।

ঘড়ঘড়...

আমার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। আলমারিটা ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। তার পেছনে দেখা গেল সরু পাথরের সিঁড়ি। সিঁড়িটা সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম -
— এটাই কি সেই গোপন পথ?

অরিন্দম বলল,
— সম্ভবত। আর বৃদ্ধের দেওয়া চাবিটা হয়তো এই পথের জন্যই ছিল।

আমরা সতর্কভাবে নিচে নামতে শুরু করলাম।
যত নিচে নামছিলাম, ততই বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠছিল। দেয়ালে পুরোনো ইট। কোথাও কোথাও জল পড়ছে। মাটির গন্ধে পুরো পথ ভরে গেছে।

হঠাৎ আমার পা একটা শক্ত জিনিসে লাগল।
টর্চের আলো ফেলতেই দেখি একটা মরচে ধরা তলোয়ার। তার পাশে মানুষের হাড়ের মতো কিছু পড়ে আছে।

আমি থেমে গেলাম।

— অরিন্দম...

সে নিচু হয়ে হাড়গুলো পরীক্ষা করল।

— এগুলো বহু পুরোনো।

— মানুষের হাড় তাই না ?

— হ্যাঁ।

আমার শরীর কেঁপে উঠল। তাহলে দুইশো বছর আগে এখানে সত্যিই কেউ মারা গিয়েছিল।আরও কিছুটা এগোতেই একটা লোহার দরজা চোখে পড়ল। দরজার ওপর খোদাই করা—

"সত্যের মূল্য রক্ত।"


সেই দরজায় তালা নেই। অরিন্দম ধীরে ধীরে সেটি ঠেলে খুলল। ভেতরে ঢুকতেই আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেলাম। ঘরটা গোলাকার, চারদিকে কাঠের তাক। তাতে একটা পুরোনো দলিল, নকশা আর চামড়ায় বাঁধানো বই রাখা আছে।

ঘরের মাঝখানে পাথরের একটি টেবিল‌ রাখা আছে। টেবিলের ওপর লাল কাপড়ে মোড়া একটি বাক্স। অরিন্দম ধীরে ধীরে কাপড়টা সরাল। বাক্সটা খুলতেই আমরা দেখতে পেলাম—

একটা কাপড়ে মোড়া মোটা ডায়েরি।

প্রথম পাতায় লেখা—

"রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর ব্যক্তিগত বিবরণ।"

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম,

— তাহলে সব উত্তর এখানেই আছে!

অরিন্দম ডায়েরির প্রথম পাতা খুলল। তাতে লেখা ছিল—

"যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তবে জেনে রাখো, ইতিহাস তোমাকে মিথ্যে বলেছে..."

আমার বুক ধক করে উঠল। অরিন্দম আরও পড়তে যাচ্ছিল, এমন সময়...

ঠাস!

ঘরের দরজা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আমি ছুটে গিয়ে দরজা টানলাম। কোনো লাভ হলো না। বাইর থেকে কেউ বন্ধ করে দিয়েছে। ঠিক তখনই অন্ধকারে একটা হাসির শব্দ ভেসে এল।

— অবশেষে তোমরা ডায়েরিটা পেয়েছ।

অরিন্দম স্থির গলায় বলল,

— সামনে এসো।

অন্ধকার থেকে একজন বেরিয়ে এল। গায়ে কালো পোশাক, তার মুখ ঢাকা, শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। আমি চিনে ফেললাম। একই প্রতীক, একই কালো পোশাক।

— তুমি ছায়ার লোক?

লোকটা মৃদু হেসে বলল,

— লোক না।

— তাহলে?

— আমি রক্ষক।

— কীসের রক্ষক?

— এমন এক সত্যের, যা প্রকাশ পেলে বহু সম্মানিত মানুষের বংশধারা ভেঙে পড়বে।

অরিন্দম বলল,

— দুইশো বছর ধরে?

— হ্যাঁ।

— কেন?

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

— কারণ ১৮২৩ সালে যে মানুষটাকে সবাই ভুক্তভোগী ভেবেছিল...

সে আসলে ভুক্তভোগী ছিল না।

আমি হতবাক হয়ে গেলাম। অরিন্দমের চোখ সরু হয়ে এল।

— তাহলে?

লোকটা ধীরে ধীরে উত্তর দিল—

— সে ছিল আসল অপরাধী।

কথাটা শুনে আমার মাথা যেন ঝাঁকুনি খেল।

কে রাজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী? একজন খুনি?
অসম্ভব!

অরিন্দম শান্তভাবে বলল,

— প্রমাণ?

লোকটা ডায়েরির দিকে আঙুল দেখাল।

— সব লেখা আছে তাতে।


— তাহলে আমাদের পড়তে বাধা দিচ্ছ কেন?

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— কারণ সব সত্য মানুষের জানার জন্য তৈরি হয় না।

হঠাৎ পুরো ঘরের আলো নিভে গেল। আমি টর্চ জ্বালাতে গিয়েও পারলাম না। অন্ধকারের মধ্যে একাধিক পায়ের শব্দ আসছে। একজন নয, দুজন নয়, অনেকজনের। তারপর সেই একই কণ্ঠস্বর—

— ওদের ধরে ফেলো।

পরের মুহূর্তেই কেউ আমার কাঁধ চেপে ধরল।
আমি ঝটকা মেরে সরে গেলাম। অরিন্দম চিৎকার করে উঠল—

— রুদ্র! ডায়েরিটা নিয়ে দৌড়াও!

আমি ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরলাম। ঠিক তখনই একটা ভারী আঘাত আমার পিঠে এসে লাগল।
আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। ডায়েরিটা হাত থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। টর্চের ক্ষীণ আলোয় আমি দেখলাম—

একজোড়া কালো দস্তানা পরা হাত ধীরে ধীরে ডায়েরিটা তুলে নিচ্ছে।

লোকটা আমাদের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলল—

— অনেক দেরি করে ফেলেছ, অরিন্দম সেন।

তারপর সে ডায়েরিটা নিয়ে গোপন দরজার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। আর আমরা বুঝতে পারলাম—

দুইশো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আবারও আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল।




চলবে...