Read I gave my heart to you. by Lamisa Anjum in Bengali থ্রিলার | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মন_তোকে_দিলাম - 14

"এই ভাই, শোন না!" সেরাফিনা আগ্রহভরে জেনিফার দিকে তাকিয়ে বলল।

"হুম, বল।" জেনিফা এমন মুখ করে উত্তর দিল যেন সে আগে থেকেই জানে, এবারও কোনো উদ্ভট প্রশ্ন আসছে।

"আচ্ছা, আমি কি এখন থেকে চুড়ি পরে ঘুরব, নাকি সাদা শাড়ি পরে ঘুরবো? মানে... বিধবাদের মতো?"

জেনিফা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
"কেন রে শালী, আমার ভাই কি মারা গেছে যে তুই সাদা শাড়ি পরে ঘুরবি?"

"আরে, একটু আগে তো সাহিদা আন্টি বলল, যে খুন করেছে সে যেন খুব বাজে ভাবে মারা যায়।"

"বলেছে বলে নাকি সব সত্যি হয়ে যাবে? আর তাছাড়া খুন তো ভাইয়াই করেছে।"

"সেটাই তো ভাবছি!" সেরাফিনা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। "শোন, তোর ভাই যদি সত্যিই মারা যায়, তাহলে তোর আব্বু-আম্মু আমাকে আবার একটা বিয়ে দেবে তো নাকি?"

"কি?!"

"আরে, চিন্তা করে দেখ। নাহলে তো আমাকে অনেক বছর একা একা বাঁচতে হবে। একা থাকা কিন্তু খুব কঠিন ব্যাপার! মুসকিল ব্যাপার বুঝলি"

জেনিফা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,
"তুই মানুষের মৃত্যুর আগেই দ্বিতীয় বিয়ের প্ল্যানিং শুরু করে দিয়েছিস?"

"আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়াকে বলে দূরদর্শিতা।"

"না, একে বলে নির্লজ্জতা!"

সেরাফিনা দাঁত বের করে হাসল।
"দুটোই হতে পারে।"

জেনিফা কপালে হাত ঠেকাল।
"আল্লাহ! আমার ভাইটার কপালে কী যে লিখে রেখেছিলে!"

"কেন তোর তোর কপালে ও ভালো কিছু নাই?  আর তাছাড়া আমি তো খুব ভালো মেয়ে।"

"হ্যাঁ, এত ভালো যে স্বামীর জানাজা হওয়ার আগেই পরের বিয়ের হিসাব কষছিস।"

সেরাফিনা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
"ব্যবসায়ীরা যেমন লাভ-ক্ষতির হিসাব আগে করে, আমিও তেমন ভবিষ্যতের হিসাব করছি।"

"তুই মানুষ না, দুর্যোগ।"

"ধন্যবাদ।"

"এটা প্রশংসা ছিল না।"

"আমি প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।"

জেনিফা বিরক্ত হয়ে সোফায় বসে পড়ল।
"একটা কথা বল তো, ভাইয়া যদি এসব কথা শুনে ফেলে?"

সেরাফিনা কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করার ভান করল।

"তাহলে হয়তো আমাকে খুন করে ফেলবে।"

"তারপর?"

"তারপর তো ও-ও খুনি হয়ে যাবে। সাহিদা আন্টির দোয়া অনুযায়ী ওরও খারাপ মৃত্যু হবে।"

জেনিফা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।
"তোর লজিক শুনলে আইনস্টাইনও কাঁদত।"

"কাঁদুক। আমি তো আর ভুল বলছি না।"

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জেহেফিল দু'জনের কথোপকথন শুনে চোখ বন্ধ করল।

তার জীবনে অনেক বিপজ্জনক মানুষ এসেছে, কিন্তু সেরাফিনার মতো বিপজ্জনক যুক্তিবিদ আর একটাও না।

তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে স্থির।

জেনিফা হঠাৎ জেহেফিলকে দেখে চমকে উঠল।
"ভাইয়া!"

সেরাফিনা নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘুরে তাকাল।
"ওহ, আপনি এখানেও চলে এসেছেন? সব জায়গাই থাকেন দেখছি"

জেহেফিল ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলো।
"হ্যাঁ। আর আমি বেশ কিছু মজার কথা শুনলাম।"

সেরাফিনা চোখ পিটপিট করল।
"কোনটা? আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা?"

"আমার মৃত্যুর পর তোমার দ্বিতীয় বিয়ের পরিকল্পনার কথা টা।"

"ওটা তো জরুরি আলোচনা ছিল। দেখুন আমাকে তো মানবতার ক্ষাতিরে বিয়ে করতেই হবে"

জেহেফিল ভ্রু তুলল।
"ওহ,তাই নাকি?"

"অবশ্যই। একজন দায়িত্বশীল স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত।"

জেনিফা মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।

জেহেফিল কয়েক সেকেন্ড সেরাফিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত স্বরে বলল,

"চিন্তা কোরো না। আমি এত সহজে মরব না। আর তার আগে তোমাকে খুন করবো,করে তোমাকে ভালো ভাবে কসিয়ে রান্না করে এক সপ্তাহ ধরে তোমার মাংস খাবো। তার পড়ে মরবো"

সেরাফিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আহ্! তাহলে আবার সব পরিকল্পনা নতুন করে করতে হবে। আর এটাও পরিকল্পনা করতে হবে আপনি কবে খুন করবেন, কি করে খুন করবেন, কি ভাবে রান্না করবেন,আর কি করে খাবেন। আপনি কি আমাকে ভিডিও টা পাঠাবেন দেখতাম কি ভাবে আমাকে খুন করতেন"

"বাহ রে, ভিডিও পাঠানোর কথা বলছো। তখন তুমি উগান্ডায় বসে ঝালমুড়ি খাবে"

"কেন উগান্ডায় কি নেটওয়ার্ক এর সমস্যা, তাহলে যাবো নাহ আমার ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুক ছাড়া চলে নাহ, আর কোথায় নেটওয়ার্ক এর সমস্যা সেখানে যাবো নাহ"

জেনিফা এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠল।

আর জেহেফিল মনে মনে ভাবল।এই মেয়েটাকে সামলানো থেকে, শত্রুদের সামলানোর চেয়েও কঠিন।

সেরাফিনা বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকাল।
"এত হাসছিস কেন? আমি কি কোনো জোক বলেছি?"

"না। তুই নিজেই একটা হাঁটাচলা করা জোক।"

"ধন্যবাদ।"

"আবার ধন্যবাদ!"

"ভালো কথা শুনলে ধন্যবাদ দিতে হয়।আর তাছাড়া আমার পছন্দ নাহ যে কেউ আমার প্রশংসা করুক"

জেহেফিল চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনছিল।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।মুহূর্তের মধ্যে মুখের সব স্বাভাবিকতা উধাও হয়ে গেল।

সে ফোনটা রিসিভ করল।
"বলো।"

ওপাশ থেকে কেউ দ্রুত কিছু বলল।জেহেফিলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
"কোথায়?"

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
"আমি আসছি।"
ফোন কেটে দিয়েই সে ঘুরে দাঁড়াল।

সেরাফিনা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
"কি হয়েছে?"

"কাজ।"

"এটা কোনো উত্তর হলো? কাজ"

"যেটা জানার দরকার, সেটাই উত্তর।"

"ওহ! আজকে কি আবার কাউকে অপহরণ করতে যাচ্ছেন?"

জেহেফিল ধীরে ধীরে সেরাফিনার দিকে তাকাল।
"না।"

"তাহলে?"

"আজকে হয়তো কাউকে বাঁচাতে যেতে হবে।"

সেরাফিনা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
"আপনি মানুষও বাঁচান?"

"তোমার ধারণা কী ছিল?"

"আমি ভাবতাম আপনি শুধু মানুষ মারেন।"

"তোমার ধারণাশক্তি খুব দুর্বল। ভালো ডাক্তার দেখাবে ছয় বছর পড়ে যখন আমাদের বাবু হবে তখন তো বাবু রা আমাকে বলবে আব্বু তুমি কি মেয়ে বিয়ে করেছে"

"জানি। কিন্তু কল্পনাশক্তি খুব শক্তিশালী। আর বাবু এই টা বলবে যে আব্বু তুমি তো সেই লেভেলের মেয়ে কে বিয়ে করেছো, পেলে কোথা থেকে, তোমার সাথে মানাচ্ছে নাহ,তখন কিন্তু মানবতার ক্ষাতিরে আর ও একটা বিয়ে দিতে পাড়েন মাইন্ড করবো নাহ"

জেহেফিল আর কোনো উত্তর দিল না।সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু দুই কদম যেতেই পিছন থেকে সেরাফিনার গলা শোনা গেল।

"এই যে!"

জেহেফিল থামল।
"কি?"

"আপনি যদি মারা যান, আগে থেকে একটা উইল লিখে যাবেন।"

জেহেফিল দু চোখ বন্ধ করল।জেনিফা আবার প্রশ্ন শুরু করল।
"তুই আবার শুরু করলি!"

সেরাফিনা গম্ভীর মুখে বলল,
"আমি সিরিয়াস। মানুষ কখন কোথায় মরবে কেউ জানে না।"

"উইলে কি লিখতে বলবি?" জেনিফা জানতে চাইল।

সেরাফিনা এক সেকেন্ডও দেরি না করে বলল,
"আমার জন্য অন্তত পাঁছশো কোটি টাকা রেখে যেতে হবে। আর তো এখন অনেক দিন বাঁচবো আর আমাদের এখন বাবু ও হয়ে গেল দেখবে কে? "

"পাঁছশো কোটি?!"

"আমি তো তার বৈধ স্ত্রী। ডিসকাউন্টে নেব নাকি?"

জেহেফিল এবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠেছে।
"তুমি নিশ্চিত?"

"অবশ্যই।"

"ঠিক আছে।"

"সত্যি?"

"হ্যাঁ।"

সেরাফিনার চোখ চকচক করে উঠল।
"তাহলে আজই উইল লিখে ফেলুন।"

সেরাফিনা এমন ভাব করে বলল যেন পাঁচশো কোটি টাকা দাবি করা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়।

জেনিফা পাশ থেকে বলল,
"তুই কি সত্যিই সিরিয়াস?"

"অবশ্যই। ভবিষ্যতের কথা ভেবে চলতে হয়।"

জেহেফিল ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।মেয়েটার মুখে এতটুকু লজ্জা নেই।বরং মনে হচ্ছে, সে খুব যুক্তিসঙ্গত একটা দাবি করেছে।
"ঠিক আছে।"

সেরাফিনার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"সত্যি?"

"হ্যাঁ।"

"পাঁচশো কোটি?"

"হ্যাঁ।"

"সব তোমার?"

"হ্যাঁ।"

সেরাফিনা আনন্দে হাততালি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল।

জেনিফা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
"ভাইয়া, তুমি কি সত্যিই রাজি হয়ে গেলে?"

জেহেফিল শান্ত গলায় বলল,
"আমি এখনো শেষ করিনি।"

সেরাফিনার হাসি একটু থেমে গেল।
"মানে?"

"একটা শর্ত আছে।"

"আচ্ছা, বলেন।"

জেহেফিল দু'হাত পকেটে ঢুকিয়ে বলল,

"আমি যদি আগে মারা যাই, তুমি আমার সব সম্পত্তি পাবে।"

"বাহ এটা তো খুব ভালো কথা।একটা আর্দশবান স্বামীর মতোন কথা আপনার ভালো লাগলো"

"কিন্তু তুমি যদি আমার আগে মারা যাও..."

"হুম?"

"তাহলে আমি কী পাব?"

সেরাফিনা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।প্রশ্নটা যেন তার প্রস্তুতির বাইরে ছিল।
"আপনি... কী পাবেন মানে?"

"তুমি তো আমার সবকিছু পাবে। আমি তোমার কাছ থেকে কী পাব?"

সেরাফিনা ভ্রু কুঁচকে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল।জেনিফা ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।

প্রায় এক মিনিট ভেবে সেরাফিনা গম্ভীর মুখে বলল,
"দেখুন, ব্যাপারটা হলো..."

"হুম?"

"আমার দেওয়ার মতো কিছু নেই।"
এক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর জেনিফা হো হো করে হেসে উঠল।
"অবশেষে সত্য কথা বললি!"

"চুপ কর। আমিও এখনো শেষ করিনি।"
সেরাফিনা আবার ভাবার ভান করল।তারপর হঠাৎ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"পেয়ে গেছি!"

"কী?"

"আমি মারা গেলে আমার সব দোয়া আপনার জন্য রেখে যাব।"

জেহেফিল ভ্রু তুলল।

"দোয়া?"

"হ্যাঁ।"
"পাঁচশো কোটির বদলে দোয়া?আজ কে সারা রাত ধড়ে দোয়া করবো"
"দেখুন, টাকা-পয়সা তো ক্ষণস্থায়ী। দোয়া অমূল্য।"

জেনিফা এবার সোফার ওপর মাথা ঠুকল।
"তুই একটা প্রতারক।"

"না।"

"তাহলে?"

"আমি আধ্যাত্মিক বিনিয়োগকারী।"

জেহেফিল ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
"তাহলে আমার পাঁচশো কোটি টাকার দাম তোমার কাছে শুধু কয়েকটা দোয়া?"

সেরাফিনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"না না।"

"তাহলে?"

"অনেকগুলো দোয়া।"

জেনিফা আবার হেসে উঠল।আর জেহেফিল কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ সেরাফিনার দিকে তাকিয়ে রইল।তার জীবনে অনেক চালাক মানুষ এসেছে।অনেক ধূর্ত মানুষও এসেছে।
কিন্তু এমন মানুষ সে কখনো দেখেনি, যার নিজের নামে একটা টাকাও নেই, অথচ পাঁচশো কোটি টাকার উত্তরাধিকার দাবি করার সময় তার বিবেক একটুও নড়ে না।

মেয়েটা ভয়ংকর।তবে বিপজ্জনকভাবে মজার।আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—

সে যখন এসব কথা বলে, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীর সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত কথাগুলোই বলছে।

Happy Reading ☺
To Be Continue 😅