Read I gave my heart to you. by Lamisa Anjum in Bengali থ্রিলার | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মন_তোকে_দিলাম - 16

মেহেরুননেসাও আসাদুল সেখ এর  পিছু নিলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকিয়ে মেয়ের গালে হাত বুলিয়ে দিলেন।
"আজ রাতে একা থাকবে না। আমি তোমার রুমেই থাকব।"

"আম্মু, আমি ছোট বাচ্চা না।"

"আমার আর তোমার আব্বুর কাছে তুমি এখনও সেই ছোট্ট আমিরাই।"

সেরাফিনা কিছু বলল না।মায়ের চোখের আতঙ্ক দেখে তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।দুজন চলে যাওয়ার পর করিডোরে আবার নীরবতা নেমে এলো।

সেরাফিনা ধীরে ধীরে নিজের রুমে ফিরে গেল।ভাঙা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল।রাস্তাটা ফাঁকা।কালো গাড়িটাও আর নেই।

কিন্তু তার মনে হচ্ছে কেউ এখনও তাকিয়ে আছে।কোথাও থেকে।অন্ধকারের আড়াল থেকে।হঠাৎ,তার ফোন আবার কেঁপে উঠল।সেই নম্বর থেকে আরেকটা মেসেজ এলো।সেরাফিনা ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনে তাকাল।
"শহরে ফিরে গিয়েও লাভ হবে না।"

মুহূর্তেই তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।কারণ এই তথ্যটা মাত্র কয়েক মিনিট আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বাইরের কারও জানার কথা নয়।
তার মানে,বাড়ির ভেতরের কেউ খবর দিচ্ছে।সেরাফিনার চোখ সরু হয়ে এলো।এবার সে ভয় পেল না।বরং মাথার ভেতর ঠান্ডাভাবে হিসাব কষতে শুরু করল।ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।জেহেফিল।সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কড়া গলা ভেসে এলো,

"তুমি কোথায়?"

"রুমে।"

"দরজা লক করো।"

"করেছি।"

"জানালার কাছে যাবে না।"

"এটাও করে ফেলেছি।"

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর জেহেফিল বলল,
"ভয় পেয়েছো?"

সেরাফিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"একটু আগে কেউ আমার মাথা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। ভয় পাওয়ার সময় পাইনি।"

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
"নোভা..."

প্রথমবারের মতো তার কণ্ঠে ক্লান্তি স্পষ্ট।
"হুম?"

"আমি চাই না তোমার কিছু হোক, নোভা। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি বেঁচে থাকব ঠিকই, কিন্তু আমার পৃথিবীটা শেষ হয়ে যাবে। কারণ আমার পুরো পৃথিবীটাই তুমি। হাই আফসোস, তুমি কোনোদিন বুঝতেও পারবে না তুমি আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।"

সেরাফিনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।অদ্ভুতভাবে তার রাগটা একটু কমে গেল।কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না।বরং বলল,
"আপনি কি সব মেয়েদেরই এমন বলেন?"

জেহেফিল কয়েক সেকেন্ড চুপ।তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
"না।"

"ওহ।"

"কারণ সব মেয়েরা আমাকে এত সমস্যায়ও ফেলে না।"

সেরাফিনা মুখ খুলল।আবার বন্ধ করল।তারপর বিরক্ত স্বরে বলল,
"আপনি অপমান করলেন?"

"না।"

"আমি ফোন রাখছি।"

"রাখবে না।"

"কেন?"

"কারণ আমি বলছি।"

"এই যুক্তিটা আমার পছন্দ না।"

"আমারও তোমার জেদ পছন্দ না।"

"কালকে আমরা শহরে ফিরছি। হোস্টেলের ছুটিও শেষ। গিয়ে সব গুছিয়ে আবার ক্লাস শুরু করব।"

"হুম।"

"তারপর আপনার এই বিরক্তিকর ফোনকলগুলো থেকেও বাঁচব।"

"স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই।"

সেরাফিনা চোখ উল্টাল"মানে?"

"মানে তুমি না ধরলেও আমি ফোন করব।"

"স্টকার।"

"শুধু তোমার জন্য।"

"এটা মোটেও রোমান্টিক শোনায় না।"

"আমি রোমান্টিক হওয়ার চেষ্টা করছি না।"

"তাহলে কী করছেন?"

"তোমাকে বিরক্ত করছি।"

সেরাফিনা না চাইলেও হেসে ফেলল।ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর জেহেফিল বলল"যাই হোক, তুমিও চলে যাবে, আমিও চলে যাব।"

"কোথায়?"

"লন্ডন। অনেক দিন এখানে থাকা হলো।"

সেরাফিনার হাসিটা মিলিয়ে গেল"ওহ।"

"এই 'ওহ'-টার মানে কী?"

"কোনো মানে নেই।"

"মিথ্যা।"

"আপনি সব সময় আমাকে মিথ্যাবাদী বলেন কেন?"

"কারণ তোমার মনে যা থাকে, মুখে তা থাকে না।"

সেরাফিনা বালিশটা টেনে কোলে নিল"আপনি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবেন, তাই না?"

"আমি বুদ্ধিমান না।"

"তাহলে?"

"তোমাকে পড়তে পারি।"

কথাটা শুনে সেরাফিনা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

জেহেফিল আবার বলল"যাই হোক, আমি লন্ডনে গেলেও একটা জিনিস বদলাবে না।"

"কী?"

"তুমি যত ঝামেলায় জড়াবে, তত আমার মাথাব্যথা বাড়বে।"

"আমি ঝামেলায় জড়াই না।"

"আজকে তোমার জানালায় গুলি চলেছে।"

"ওটা আমার দোষ না।"

"তবুও তুমি ঝামেলার চুম্বক।"

"আমি ফোন রাখছি।"

"ঠিক আছে।"
সেরাফিনা অবাক হলো"এত সহজে রাজি?"

"হ্যাঁ।"

"কেন?"

"কারণ আমি জানি ফোন রাখার পরেও তুমি আমার কথাই ভাববে।"

এক সেকেন্ড।দুই সেকেন্ড।তারপর সেরাফিনা দাঁত চেপে বলল"আল্লাহ হাফেজ।"

"এক মিনিট"

"কি হয়েছে"

"তুমি বলেছিলে তুমি লোকটাকে চেনো।"

"চিনি।"

"কে সে?"

সেরাফিনা একটু ইতস্তত করল।

"আমি যখন প্রথম হোস্টেলে যাই, একটা ছেলে আমাকে খুব বিরক্ত করত। সব সময় পেছনে পেছনে ঘুরত। আজকে গাড়িতে বসে থাকা লোকটার মুখ দেখে মনে হলো, সেই ছেলেটাই।"

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

"কী ধরনের বিরক্ত করত?"

"চিঠি দিত, চকলেট দিত, ফুলও দিয়েছিল অনেকবার।"

জেহেফিলের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল"চকলেটও দিত?"

"হুম।"

"আর তুমি নিতে?"

"চকলেটগুলো নিতাম।"

"তুমি ওর দেওয়া চকলেট খেতে?"জেহেফিলের গলাটা অদ্ভুত ঠান্ডা শোনাল।

সেরাফিনা অবাক হয়ে বলল"অবশ্যই খেতাম। ফেলে দেওয়া তো অপচয়।"

"বাহ।"

"কী বাহ?"

"কিছু না। চালিয়ে যাও।"

সেরাফিনা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল"আমি জানি কেউ অনেক কিছু দিলে অন্তত একটা জিনিস নেওয়া উচিত। আর আমি ওর পুরো মনটাও ভাঙতে চাইনি।"

"তাই?"

"হ্যাঁ। পুরো মন ভেঙে দিলে ছেলেটা খুব কষ্ট পেত। তাই চিঠি আর ফুলগুলো ফিরিয়ে দিতাম, শুধু চকলেটগুলো রাখতাম।"

ওপাশে আবার নীরবতা।তারপর জেহেফিল ধীরে ধীরে বলল"নোভা?"

"হুম?"

"আজকে এই সময় আমার মনে হচ্ছে, গুলিটা তোমাকে না, আমাকে করা উচিত ছিল।"

"কেন?"

"কারণ আমি এখন ওর ওপর না, তোমার ওপর রাগ করছি।"

সেরাফিনা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হেসে ফেলল"আপনি হিংসা করছেন নাকি?"

"না।"

"মিথ্যা।"

"নোভা।"

"হুম?"

"আর কোনো ছেলের দেওয়া চকলেট খেয়েছো?"

সেরাফিনার হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল"এই প্রশ্নের উত্তর দিলে কি আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে?"

"উত্তর দাও, নোভা।"

"হয়তো... দুই-একজনের।"

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা"দুই-একজন?"

"আরে, স্কুল-কলেজে পড়েছি। মানুষ চকলেট দিয়েছে। আমি কি সবার মন ভাঙব?"

"হ্যাঁ।"

"কী?"

"হ্যাঁ, ভাঙবে।"

সেরাফিনা এবার হো হো করে হেসে উঠল"আপনি কী বলছেন এসব?"

"সঠিক কথা বলছি।"

"ওদের কী দোষ ছিল?"

"তারা তোমাকে চকলেট দিয়েছিল।"

"এটা আবার দোষ হলো?"

"আমার কাছে হলো।"

সেরাফিনা হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল"আপনি সত্যিই অসহ্য।"

"আর তুমি সত্যিই বেয়াদপ।"

"ধন্যবাদ।"

"এটা প্রশংসা ছিল না।"

"আমি ইতিবাচক চিন্তাধারায় বিশ্বাস করি।"

জেহেফিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল,তারপর গম্ভীর হয়ে বলল"নোভা, মজা বাদ দাও।"

সেরাফিনার হাসিটাও একটু থেমে গেল"হুম?"

"লোকটা যদি সত্যিই সেই ছেলে হয়, তাহলে বিষয়টা সাধারণ না। বছরের পর বছর পরেও যদি সে তোমাকে অনুসরণ করে থাকে, তাহলে সে বিপজ্জনক।"

সেরাফিনা জানালার দিকে তাকালঅন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।তবুও বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করল।
"আমিও সেটাই ভাবছি।"

"আগামীকাল তোমরা শহরে ফিরছো, তাই না?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে কাল থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না।"

"আবার শুরু হলো।"

"আমি সিরিয়াস।"

"আমি নিজেকে সামলাতে পারি।"

"আজকে তোমার জানালায় গুলি চলেছে। এই যুক্তিটা আর কাজ করবে না।"

সেরাফিনা কোনো উত্তর দিল না।কারণ প্রথমবারের মতো সে নিজেও বুঝতে পারছে, ব্যাপারটা তার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।অদ্ভুত একটা নীরবতা।যেন ঝড়ের মাঝেও কয়েক সেকেন্ডের শান্তি।হঠাৎ জেহেফিলের পাশে কেউ বলল"ভাই! তথ্য পেয়েছি!"

মুহূর্তের মধ্যে জেহেফিলের কণ্ঠ বদলে গেল।আবার সেই ঠান্ডা, নির্মম স্বর।
"আমি পরে কল করছি।"কল কেটে গেল।

সেরাফিনা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্যদিকে

পরিত্যক্ত গুদামঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে জেহেফিল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।তার একজন লোক দ্রুত এগিয়ে এসে একটা ফাইল হাতে দিল।
"ভাই, যে নম্বর থেকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, সেটা ট্রেস করা গেছে।"

"কার?"
লোকটা এক মুহূর্ত ইতস্তত করল।তারপর বলল"নম্বরটা বাইরে থেকে চালানো হয়েছে। কিন্তু তথ্য পাচার হয়েছে বাড়ির ভেতর থেকে।"

জেহেফিলের চোখ বিপজ্জনকভাবে সরু হয়ে গেল"কে?"লোকটা ফাইল খুলে একটা ছবি সামনে ধরল।

ছবিটা দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো গুদামঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কারণ ছবির মানুষটাকে জেহেফিল খুব ভালো করেই চেনে।খুবই ভালো।
আর ঠিক সেই কারণেই তার মুখ থেকে একটাও শব্দ বের হলো না।শুধু চোখের ভেতর ধীরে ধীরে জমে উঠল ভয়ংকর এক ঝড়।

সে নিচু স্বরে বলল"ওনি কি ভাবে কাজ টা করতে পাড়ে..."

Happy Reading ☺
To Be Continue 😅